তিন বছর দেরিতে তাইওয়ানে পৌঁছাল নতুন যুদ্ধবিমান, বাড়ল চীনের সঙ্গে আকাশ প্রতিরক্ষা উত্তেজনা

তিন বছর বিলম্বের পর তাইওয়ানে পৌঁছেছে দুটি নতুন যুদ্ধবিমান, চীনের চাপের মধ্যে আকাশ প্রতিরক্ষা জোরদারের নতুন বার্তা দিল তাইপে আজ।

তিন বছর দেরিতে তাইওয়ানে পৌঁছাল নতুন যুদ্ধবিমান, বাড়ল চীনের সঙ্গে আকাশ প্রতিরক্ষা উত্তেজনা

তিন বছর দেরিতে তাইওয়ানে পৌঁছাল নতুন যুদ্ধবিমান, বাড়ল চীনের সঙ্গে আকাশ প্রতিরক্ষা উত্তেজনা


যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তাইওয়ানের দীর্ঘদিনের প্রতিরক্ষা সহযোগিতায় এই সরবরাহকে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে দেখা হচ্ছে। ২০১৯ সালের আগস্টে যুক্তরাষ্ট্র প্রায় ৮০০ কোটি মার্কিন ডলার মূল্যের চুক্তির অনুমোদন দেয়। এর আওতায় ৬৬টি নতুন এফ-১৬ভি ব্লক ৭০ যুদ্ধবিমান এবং সংশ্লিষ্ট সরঞ্জাম দেওয়ার কথা। প্রাথমিক পরিকল্পনা অনুযায়ী ২০২৩ সাল থেকে সরবরাহ শুরু হয়ে ২০২৬ সালের মধ্যে শেষ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু উৎপাদন ব্যবস্থা পরিবর্তন, সরবরাহব্যবস্থার বিঘ্ন এবং বিভিন্ন কারিগরি সমস্যার কারণে নির্ধারিত সময়সূচি পিছিয়ে যায়। 

প্রথম দুটি যুদ্ধবিমান যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ ক্যারোলিনার উৎপাদনকেন্দ্র থেকে আগস্টের মাঝামাঝি যাত্রা শুরু করে হাওয়াই পৌঁছায়। এরপর দীর্ঘ সময় হাওয়াইয়ে অবস্থান করার পর সেগুলো গুয়াম হয়ে তাইওয়ানে যায়। ২ অক্টোবর দুপুরের দিকে ৬৭২৭ ও ৬৭২৮ নম্বর বিমান দুটি তাইতুংয়ের চিহাং বিমানঘাঁটিতে অবতরণ করে। তাইওয়ানের সরকারি বিমানবাহিনী জানিয়েছে, অবশিষ্ট ৬৩টি বিমান যুক্তরাষ্ট্রে উৎপাদন পর্যায়ে রয়েছে এবং কয়েকটি ইতোমধ্যে হস্তান্তরের জন্য প্রস্তুত হয়েছে। 

তাইওয়ানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী কু লি-শিয়ং জানিয়েছেন, চলতি বছর শুধু দুটি বিমান সরবরাহ করেই কার্যক্রম থেমে থাকবে না। আরও বিমান এ বছরই পৌঁছানোর কথা রয়েছে। তবে পরবর্তী বিমানগুলো ঠিক কোন তারিখে আসবে, তা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সমন্বয় করে নির্ধারণ করা হবে। তাইওয়ানের বিমানবাহিনী নতুন বিমানগুলোর জন্য পাইলট ও রক্ষণাবেক্ষণ কর্মীদের প্রশিক্ষণও চালাচ্ছে। নতুন বিমানগুলোকে ধীরে ধীরে কার্যকর সামরিক সক্ষমতার মধ্যে যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। 

এই নতুন যুদ্ধবিমানগুলো তাইওয়ানের বিদ্যমান এফ-১৬ বহরের ওপরও বড় প্রভাব ফেলবে। তাইওয়ানের কাছে আগে থেকেই ১৩৯টি পুরোনো এফ-১৬ যুদ্ধবিমান আধুনিকায়ন করে উন্নত মানে নেওয়া হয়েছে। নতুন ৬৬টি বিমান যুক্ত হলে মোট বহরের সংখ্যা ২০০ ছাড়িয়ে প্রায় ২০৫টিতে পৌঁছাবে। ফলে তাইওয়ান বিশ্বের অন্যতম বড় এফ-১৬ভি বহরের অধিকারী হবে। 

নতুন এফ-১৬ভি ব্লক ৭০ বিমানগুলো শুধু পুরোনো বিমানের পুনর্নির্মাণ নয়; এগুলো নতুন করে তৈরি যুদ্ধবিমান। এতে উন্নত রাডার, বৈদ্যুতিন যুদ্ধব্যবস্থা, আধুনিক যোগাযোগ ও লক্ষ্য শনাক্তকরণ প্রযুক্তি রয়েছে। এসব ব্যবস্থা দূরপাল্লায় একাধিক লক্ষ্য শনাক্ত ও মোকাবিলায় তাইওয়ানের সক্ষমতা বাড়াতে পারে। বিশেষ করে চীনের আধুনিক যুদ্ধবিমান ও উন্নত বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার বিরুদ্ধে তাইওয়ানের প্রতিরোধক্ষমতা বাড়ানোর লক্ষ্যেই নতুন বিমানগুলো গুরুত্বপূর্ণ বলে সামরিক বিশ্লেষকেরা মনে করছেন। 

নতুন বিমানগুলো তাইতুংয়ের চিহাং ঘাঁটিতে মোতায়েন করার পরিকল্পনা রয়েছে। তাইওয়ানের সামরিক কৌশলে দ্বীপটির পূর্বাঞ্চল গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এই অঞ্চল মূল ভূখণ্ড থেকে অপেক্ষাকৃত দূরে এবং সংঘাতের পরিস্থিতিতে বিমান ও অন্যান্য সামরিক শক্তি সংরক্ষণে তুলনামূলক সুবিধা দিতে পারে। প্রতিরক্ষামন্ত্রীও বলেছেন, পূর্ব তাইওয়ান যুদ্ধক্ষমতা সংরক্ষণের গুরুত্বপূর্ণ ঘাঁটি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। 

এই সরবরাহের সময়টিও রাজনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। প্রথম দুটি বিমান তাইওয়ানে পৌঁছেছে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের বৈঠকের প্রায় এক সপ্তাহ পর। বৈঠকের আগে ও পরে তাইওয়ানের কাছে মার্কিন অস্ত্র সরবরাহের ভবিষ্যৎ নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠেছিল। তাইওয়ানের কর্মকর্তারা অবশ্য জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রের তাইওয়ান নীতিতে পরিবর্তনের কোনো আনুষ্ঠানিক বার্তা তারা পাননি। 

চীন দীর্ঘদিন ধরেই তাইওয়ানের কাছে মার্কিন অস্ত্র বিক্রির বিরোধিতা করে আসছে। বেইজিং তাইওয়ানকে নিজেদের ভূখণ্ডের অংশ বলে দাবি করে এবং যুক্তরাষ্ট্রকে অস্ত্র সরবরাহ বন্ধ করার আহ্বান জানিয়ে আসছে। অন্যদিকে তাইওয়ান নিজেদের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা জোরদার করাকে সম্ভাব্য সামরিক চাপ মোকাবিলার প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ হিসেবে দেখছে। যুক্তরাষ্ট্রও তাইওয়ানের আত্মরক্ষার সক্ষমতা বজায় রাখতে সহায়তার নীতি অনুসরণ করে আসছে। 

তবে দুটি নতুন যুদ্ধবিমান একাই তাইওয়ান-চীন সামরিক ভারসাম্যে বড় পরিবর্তন আনবে এমন দাবি অতিরঞ্জিত হবে। প্রকৃত গুরুত্ব রয়েছে পুরো ৬৬টি বিমান সময়মতো সরবরাহ, প্রশিক্ষণ সম্পন্ন এবং সেগুলোকে কার্যকর যুদ্ধক্ষমতার সঙ্গে যুক্ত করার মধ্যে। একই সঙ্গে তাইওয়ানের পুরোনো বিমান আধুনিকায়ন, নিজস্ব অস্ত্র উৎপাদন এবং অন্যান্য প্রতিরক্ষা কর্মসূচির সঙ্গে নতুন বিমানগুলো কীভাবে সমন্বিত হয়, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।

সুতরাং মূল দাবিটি সত্য তাইওয়ান সত্যিই ৬৬টির মধ্যে প্রথম দুটি নতুন এফ-১৬ভি ব্লক ৭০ পেয়েছে এবং সরবরাহে দীর্ঘ বিলম্ব হয়েছে। তবে দুটি বিমান পৌঁছানোকে সরাসরি সামরিক ভারসাম্যের নাটকীয় পরিবর্তন হিসেবে দেখার চেয়ে এটিকে তাইওয়ানের দীর্ঘমেয়াদি বিমান প্রতিরক্ষা আধুনিকায়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হিসেবে দেখা বেশি যুক্তিসঙ্গত। 


সিএসবি নিউজ-এর আরও খবর