ক্ষমা চাওয়ার পরই উত্তর কোরিয়ার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ, কোরীয় উপদ্বীপে বাড়ল উত্তেজনা
সীমান্তে মাইন বিস্ফোরণ নিয়ে ক্ষমা চাওয়ার দাবি প্রত্যাখ্যানের পর পূর্ব সাগরে ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়ল উত্তর কোরিয়া, বাড়ল সামরিক উত্তেজনা
ক্ষমা চাওয়ার পরই উত্তর কোরিয়ার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ, কোরীয় উপদ্বীপে বাড়ল উত্তেজনা
দক্ষিণ কোরিয়ার পক্ষ থেকে সীমান্ত এলাকায় মাইন বিস্ফোরণের ঘটনায় ক্ষমা চাওয়া এবং দায় স্বীকারের দাবি জানানোর কয়েক দিনের মধ্যেই পূর্ব সাগরের দিকে একটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে উত্তর কোরিয়া। শনিবার স্থানীয় সময় সকাল সাড়ে ছয়টার দিকে উত্তর কোরিয়ার পূর্ব উপকূলীয় ওয়নসান এলাকা থেকে ক্ষেপণাস্ত্রটি উৎক্ষেপণ করা হয় বলে জানিয়েছে দক্ষিণ কোরিয়ার সামরিক কর্তৃপক্ষ।
দক্ষিণ কোরিয়ার সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, ক্ষেপণাস্ত্রটি সাতশ কিলোমিটারের বেশি পথ পাড়ি দিয়ে সাগরে পড়েছে। তবে এটি ঠিক কোন ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র এবং এর নির্দিষ্ট গতিপথ কী ছিল, তা এখনো বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। দক্ষিণ কোরিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো উৎক্ষেপণের প্রাথমিক পর্যায় থেকেই এর গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করেছে এবং তথ্য বিনিময় করেছে।
দক্ষিণ কোরিয়ার সামরিক বাহিনী বলেছে, সম্ভাব্য আরও উৎক্ষেপণের আশঙ্কায় নজরদারি ও সতর্কতা বাড়ানো হয়েছে। একই সঙ্গে দক্ষিণ কোরিয়া, যুক্তরাষ্ট্র ও জাপান ক্ষেপণাস্ত্র-সংক্রান্ত তথ্য বিনিময় করছে এবং প্রতিক্রিয়া জানানোর জন্য প্রস্তুত রয়েছে। দক্ষিণ কোরিয়ার জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদও উৎক্ষেপণের পর জরুরি বৈঠকে বসে পরিস্থিতি পর্যালোচনা করেছে।
এই উৎক্ষেপণের সময়টি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ গত ২১ সেপ্টেম্বর দুই কোরিয়ার মধ্যবর্তী অসামরিকীকৃত অঞ্চলে মাইন বিস্ফোরণে দক্ষিণ কোরিয়ার তিন সেনা আহত হন। তাদের মধ্যে দুজন গুরুতর আহত হয়েছেন। দক্ষিণ কোরিয়ার সামরিক বাহিনী তদন্তের পর জানিয়েছে, উত্তর কোরিয়ার তৈরি মাইন বিস্ফোরণের কারণ হওয়ার সম্ভাবনা অত্যন্ত বেশি। বিস্ফোরণের কাছাকাছি এলাকায় উত্তর কোরিয়ার একটি সক্রিয় মাইনও পাওয়া গেছে।
জাতিসংঘের কমান্ডও ওই ঘটনায় যুদ্ধবিরতি চুক্তি লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটেছে বলে জানিয়েছে। এরপর দক্ষিণ কোরিয়া উত্তর কোরিয়ার কাছে আনুষ্ঠানিক ক্ষমা চাওয়া, দায় স্বীকার এবং সীমান্তে উত্তেজনা বাড়ায় এমন কর্মকাণ্ড বন্ধের দাবি জানায়। দক্ষিণ কোরিয়ার সামরিক কর্তৃপক্ষ সতর্ক করে দেয়, ভবিষ্যতে এ ধরনের কর্মকাণ্ডের পরিণতির দায় উত্তর কোরিয়াকেই নিতে হবে।
তবে পিয়ংইয়ং অভিযোগটি সম্পূর্ণ প্রত্যাখ্যান করেছে। উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উনের প্রভাবশালী বোন কিম ইয়ো জং দক্ষিণ কোরিয়ার তদন্তের ফলকে ভিত্তিহীন বলে অভিহিত করেন। তিনি মাইন বিস্ফোরণের জন্য উত্তর কোরিয়াকে দায়ী করার প্রচেষ্টাকে প্রত্যাখ্যান করে দক্ষিণ কোরিয়ার ক্ষমা চাওয়ার দাবিরও তীব্র সমালোচনা করেন।
কিম ইয়ো জং আরও ইঙ্গিত দিয়েছেন, দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার উদ্যোগের বিষয়ে উত্তর কোরিয়ার অবস্থান অত্যন্ত কঠোর। দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট লি জে মিয়ং সামরিক উত্তেজনা কমানো এবং দুই দেশের মধ্যে যোগাযোগ বাড়ানোর পক্ষে অবস্থান নিলেও পিয়ংইয়ংয়ের সাম্প্রতিক বক্তব্যে সেই উদ্যোগের প্রতি আগ্রহের কোনো স্পষ্ট লক্ষণ দেখা যায়নি।
সর্বশেষ ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণকে তাই সীমান্তের মাইন বিস্ফোরণ নিয়ে চলমান বিরোধের নতুন সামরিক অধ্যায় হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, উত্তর কোরিয়া সরাসরি ঘোষণা করেনি যে দক্ষিণ কোরিয়ার ক্ষমা চাওয়ার দাবির জবাব হিসেবেই ক্ষেপণাস্ত্রটি ছোড়া হয়েছে। দুটি ঘটনা সময়ের দিক থেকে কাছাকাছি হলেও উৎক্ষেপণের সঙ্গে মাইন বিস্ফোরণ নিয়ে বিরোধের সরাসরি কারণগত সম্পর্ক এখনো নিশ্চিত নয়। এটি তথ্য যাচাইয়ের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য।
সাম্প্রতিক উৎক্ষেপণটি উত্তর কোরিয়ার ধারাবাহিক ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষার অংশও হতে পারে। দক্ষিণ কোরিয়ার গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরে এটি উত্তর কোরিয়ার পনেরোতম ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ। এর মাত্র তেরো দিন আগে ওয়নসান এলাকা থেকে পূর্ব সাগরের দিকে দুটি স্বল্পপাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া হয়েছিল।
এর আগে সেপ্টেম্বরের শেষ সপ্তাহেও উত্তর কোরিয়া নতুন ধরনের অস্ত্র পরীক্ষা, সামরিক মহড়া এবং সীমান্ত এলাকায় প্রতিরক্ষা অবকাঠামো জোরদারের মতো বিভিন্ন কর্মকাণ্ড চালিয়েছে। ফলে মাইন বিস্ফোরণ, পাল্টাপাল্টি অভিযোগ এবং সর্বশেষ ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ মিলিয়ে কোরীয় উপদ্বীপে সামরিক উত্তেজনা আরও বেড়েছে।
জাপানের পক্ষ থেকেও উৎক্ষেপণটি পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে। ক্ষেপণাস্ত্রটি জাপানের বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলের বাইরে সাগরে পড়েছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। ফলে সরাসরি জাপানের ভূখণ্ডে আঘাতের ঘটনা ঘটেনি। তবে আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্য ঘটনাটি উদ্বেগজনক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের জন্য সবচেয়ে বড় উদ্বেগ হলো, দুই কোরিয়ার মধ্যে সরাসরি যোগাযোগের সুযোগ সীমিত থাকা অবস্থায় সামরিক কর্মকাণ্ড দ্রুত পাল্টাপাল্টি প্রতিক্রিয়ার দিকে যেতে পারে। সীমান্তে মাইন, সামরিক স্থাপনা নির্মাণ এবং ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষার মতো ঘটনাগুলো ভুল হিসাব বা ভুল বোঝাবুঝির ঝুঁকি বাড়ায়। দক্ষিণ কোরিয়া এরই মধ্যে নজরদারি জোরদার করেছে এবং যুক্তরাষ্ট্র ও জাপানের সঙ্গে তথ্য বিনিময় অব্যাহত রেখেছে।
দক্ষিণ কোরিয়ার ক্ষমা চাওয়ার দাবি এবং উত্তর কোরিয়ার তা প্রত্যাখ্যানের পর নতুন ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ দুই দেশের সম্পর্কের অবনতির ইঙ্গিত দিচ্ছে। তবে উৎক্ষেপণটিকে সরাসরি ক্ষমা চাওয়ার দাবির প্রতিশোধ হিসেবে চিহ্নিত করার মতো নিশ্চিত প্রমাণ এখনো নেই। নিশ্চিত তথ্য হলো—উত্তর কোরিয়া ওয়নসান এলাকা থেকে একটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে, সেটি সাতশ কিলোমিটারের বেশি উড়েছে এবং দক্ষিণ কোরিয়া পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে।