রাশিয়ার বৃহৎ সামরিক মহড়ায় ড্রোন রোবট ক্ষেপণাস্ত্রে শক্তির মহড়া দেখল বিশ্ব
রাশিয়ার কেন্দ্র-২০২৬ মহড়ায় হাজারো সেনার সঙ্গে ড্রোন রোবট ও আধুনিক অস্ত্রের সমন্বিত যুদ্ধপ্রস্তুতি প্রদর্শন করা হয়েছে
রাশিয়ার বৃহৎ সামরিক মহড়ায় ড্রোন রোবট ক্ষেপণাস্ত্রে শক্তির মহড়া দেখল বিশ্ব
রাশিয়ায় চলমান ‘কেন্দ্র-২০২৬’ সামরিক মহড়াকে ঘিরে দেশটির সেনাবাহিনীর যুদ্ধপ্রস্তুতি, ড্রোননির্ভর অভিযান এবং স্থলযুদ্ধে রোবোটিক প্রযুক্তির ব্যবহার নতুন করে আন্তর্জাতিক মনোযোগ পেয়েছে। ২ অক্টোবর রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন চেলিয়াবিনস্ক অঞ্চলের চেবারকুল সামরিক প্রশিক্ষণ এলাকায় মহড়ার সক্রিয় পর্যায় পরিদর্শন করেন। রুশ ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, মহড়ায় ৪৭ হাজারের বেশি সেনাসদস্য অংশ নিচ্ছেন। কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে ১১টি সামরিক প্রশিক্ষণ এলাকায় এবং ক্যাস্পিয়ান সাগরেও এর অংশ রয়েছে।
তথ্য যাচাই করে দেখা গেছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া মূল দাবিটির বড় অংশ সত্য। বিশেষ করে ৪৭ হাজারের বেশি সেনা, ১১টি প্রশিক্ষণ এলাকা এবং ড্রোন ও রোবোটিক ব্যবস্থার ব্যবহার সম্পর্কে একাধিক সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে একই তথ্য পাওয়া গেছে। তবে বিভিন্ন প্রতিবেদনে ব্যবহৃত সংখ্যা এক নয়। চেবারকুল এলাকায় প্রায় ৬ হাজার সেনার পাশাপাশি প্রায় ৭০০ সামরিক সরঞ্জাম, ৬০০-এর বেশি চালকবিহীন উড়োজাহাজ এবং ৬০টির বেশি রোবোটিক ব্যবস্থা ব্যবহারের তথ্য রুশ সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। ফলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যবহৃত নির্দিষ্ট সংখ্যাগুলোকে চূড়ান্ত মোট সংখ্যা হিসেবে না দেখে সংশ্লিষ্ট পর্যায়ের হিসাব হিসেবে দেখা বেশি নির্ভুল।
কেন্দ্র-২০২৬ মহড়া শুরু হয়েছে ২৮ সেপ্টেম্বর এবং নির্ধারিত কর্মসূচি অনুযায়ী ৩ অক্টোবর পর্যন্ত চলার কথা। এটি রাশিয়ার সামরিক প্রশিক্ষণ পরিকল্পনার অংশ এবং একই সময়ে যৌথ নিরাপত্তা চুক্তি সংস্থার ‘ইন্টারঅ্যাকশন-২০২৬’ কমান্ড ও স্টাফ মহড়ার সঙ্গেও সমন্বিতভাবে পরিচালিত হচ্ছে। চেবারকুল এলাকায় রাশিয়ার পাশাপাশি কয়েকটি অংশীদার দেশের সামরিক সদস্যদেরও অংশগ্রহণের কথা জানানো হয়েছে।
মহড়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো চালকবিহীন প্রযুক্তির ব্যাপক ব্যবহার। সাম্প্রতিক যুদ্ধক্ষেত্রে বিশেষ করে ইউক্রেন যুদ্ধের অভিজ্ঞতায় ছোট আকারের নজরদারি ও আক্রমণাত্মক চালকবিহীন উড়োজাহাজের গুরুত্ব ব্যাপকভাবে বেড়েছে। কেন্দ্র-২০২৬-এ রাশিয়া সেই অভিজ্ঞতাকে বৃহৎ সামরিক প্রশিক্ষণের সঙ্গে যুক্ত করছে। আকাশপথের চালকবিহীন ব্যবস্থা ব্যবহার করে নজরদারি, লক্ষ্য শনাক্তকরণ এবং স্থলবাহিনীর কার্যক্রমে সহায়তার পাশাপাশি স্থলভিত্তিক রোবোটিক প্ল্যাটফর্মও প্রদর্শন করা হয়েছে। রুশ সামরিক কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এসব রোবোটিক প্ল্যাটফর্ম ব্যবহারের কৌশল ইতোমধ্যে বাহিনীর মধ্যে তৈরি হয়েছে।
মহড়ায় শুধু প্রচলিত সাঁজোয়া যান বা কামান ব্যবস্থার ওপর নির্ভর না করে মানুষ ও যন্ত্রের সমন্বিত যুদ্ধপদ্ধতির দিকটিও গুরুত্ব পেয়েছে। মাঠপর্যায়ে সেনাদের সঙ্গে রোবোটিক ব্যবস্থা পরিচালনা, আকাশ থেকে চালকবিহীন উড়োজাহাজের সহায়তা এবং দূরনিয়ন্ত্রিত সরঞ্জাম ব্যবহারের মাধ্যমে ভবিষ্যৎ যুদ্ধের একটি প্রযুক্তিনির্ভর কাঠামো তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে।
রুশ প্রেসিডেন্টের পরিদর্শনের সময় বিভিন্ন ধরনের অস্ত্র ও সামরিক সরঞ্জাম প্রদর্শন করা হয়। এর মধ্যে নতুন ধরনের চালকবিহীন উড়োজাহাজও ছিল। আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা সহযোগী সূত্রের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পুতিনকে রাশিয়ার সাম্প্রতিক যুদ্ধ-অভিজ্ঞতা থেকে তৈরি করা বিভিন্ন সামরিক সক্ষমতা সম্পর্কে অবহিত করা হয়। মহড়ার উদ্দেশ্য হিসেবে বহিরাগত আক্রমণ প্রতিহত করার সময় বিভিন্ন স্তরের কমান্ডারদের বাহিনী পরিচালনার দক্ষতা বাড়ানোর কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
রাশিয়ার জন্য এই মহড়ার রাজনৈতিক গুরুত্বও রয়েছে। ইউক্রেন যুদ্ধের পঞ্চম বছরে প্রবেশের প্রেক্ষাপটে মস্কো একদিকে নিজেদের সামরিক সক্ষমতা প্রদর্শন করছে, অন্যদিকে মিত্র ও অংশীদার দেশগুলোর সঙ্গে সমন্বিত সামরিক কর্মকাণ্ডের সক্ষমতাও তুলে ধরছে। চীন, পাকিস্তান, মঙ্গোলিয়া এবং যৌথ নিরাপত্তা চুক্তি সংস্থার কয়েকটি দেশের সদস্যদের অংশগ্রহণের খবর পাওয়া গেছে। এ ছাড়া ৫৫টি দেশের প্রতিনিধিদল পর্যবেক্ষক হিসেবে উপস্থিত ছিল বলে বার্তা সংস্থা সহযোগী প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।
মহড়ার ভৌগোলিক বিস্তারও উল্লেখযোগ্য। শুধু একটি প্রশিক্ষণ এলাকায় সীমাবদ্ধ না থেকে রাশিয়ার বিস্তৃত সামরিক পরিসরে এর কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। ১১টি প্রশিক্ষণ এলাকা ও ক্যাস্পিয়ান সাগরকে যুক্ত করার ফলে স্থল, আকাশ ও সমুদ্রভিত্তিক সামরিক সক্ষমতার মধ্যে সমন্বয় পরীক্ষা করার সুযোগ তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে বিভিন্ন অঞ্চলে বাহিনী দ্রুত পরিচালনা এবং কমান্ড কাঠামোর কার্যকারিতা যাচাই করাও এর গুরুত্বপূর্ণ উদ্দেশ্য।
তবে মহড়ায় প্রদর্শিত সামরিক সক্ষমতাকে সরাসরি বাস্তব যুদ্ধক্ষেত্রে সমান কার্যকারিতার প্রমাণ হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। সামরিক মহড়া মূলত পরিকল্পনা, সমন্বয়, প্রশিক্ষণ ও প্রস্তুতি যাচাইয়ের একটি নিয়ন্ত্রিত প্রক্রিয়া। বাস্তব যুদ্ধে প্রতিপক্ষের পাল্টা আক্রমণ, বৈদ্যুতিন যুদ্ধ, সরবরাহব্যবস্থা, আবহাওয়া এবং গোয়েন্দা তথ্যের মতো বহু অনিশ্চয়তা থাকে। তাই মহড়ার দৃশ্য বা ভিডিও দেখে কোনো অস্ত্রের প্রকৃত যুদ্ধক্ষমতা সম্পর্কে অতিরঞ্জিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সতর্কতার দাবি রাখে।
কেন্দ্র-২০২৬ মহড়ার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা হলো রাশিয়ার সামরিক ব্যবস্থায় চালকবিহীন প্রযুক্তি ও রোবোটিক ব্যবস্থার গুরুত্ব দ্রুত বাড়ছে। ইউক্রেন যুদ্ধের অভিজ্ঞতা যে রুশ সামরিক কৌশল ও প্রশিক্ষণে প্রভাব ফেলছে, মহড়ার প্রযুক্তিনির্ভর আয়োজন তারই একটি দৃশ্যমান উদাহরণ। একই সঙ্গে বিপুলসংখ্যক সেনা, বহু প্রশিক্ষণ এলাকা এবং বিভিন্ন দেশের অংশগ্রহণের মাধ্যমে রাশিয়া তার বৃহৎ পরিসরের সামরিক সমন্বয় ও প্রস্তুতির সক্ষমতাও তুলে ধরছে।