জাপান সাগরের দিকে উত্তর কোরিয়ার ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ, বাড়ল কোরীয় উত্তেজনা
উত্তর কোরিয়ার ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণে কোরীয় উপদ্বীপে নতুন উত্তেজনা, সতর্ক অবস্থানে দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপান।
জাপান সাগরের দিকে উত্তর কোরিয়ার ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ, বাড়ল কোরীয় উত্তেজনা
উত্তর কোরিয়া শনিবার পূর্ব উপকূল থেকে জাপান সাগরের দিকে একটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে। দক্ষিণ কোরিয়ার সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, স্থানীয় সময় সকাল সাড়ে ছয়টার দিকে পূর্ব উপকূলের ওনসান এলাকা থেকে ক্ষেপণাস্ত্রটি উৎক্ষেপণ করা হয়। পরে জাপানের প্রতিরক্ষা কর্তৃপক্ষও উৎক্ষেপণের বিষয়টি শনাক্ত করে। প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, ক্ষেপণাস্ত্রটি ৭০০ কিলোমিটারের বেশি পথ অতিক্রম করে সাগরে পড়েছে।
জাপানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, ক্ষেপণাস্ত্রটি প্রায় ৬৮০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে সর্বোচ্চ প্রায় ৯০ কিলোমিটার উচ্চতায় উঠেছিল। এটি জাপানের একচেটিয়া অর্থনৈতিক অঞ্চলের বাইরে সাগরে পতিত হয়েছে বলে জাপানি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। ফলে সরাসরি জাপানের ভূখণ্ডে আঘাতের কোনো আশঙ্কা তৈরি হয়নি। তবে এ ধরনের নিক্ষেপকে আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্য গুরুতর উদ্বেগ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
দক্ষিণ কোরিয়ার যৌথ বাহিনী জানিয়েছে, ক্ষেপণাস্ত্রটির সুনির্দিষ্ট ধরন ও প্রযুক্তিগত বৈশিষ্ট্য নির্ধারণে দক্ষিণ কোরিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক কর্মকর্তারা বিশ্লেষণ চালাচ্ছেন। উৎক্ষেপণের পর দক্ষিণ কোরিয়া সম্ভাব্য আরও নিক্ষেপের আশঙ্কায় নজরদারি ও সামরিক প্রস্তুতি বাড়িয়েছে। পাশাপাশি দক্ষিণ কোরিয়া, যুক্তরাষ্ট্র ও জাপান নিজেদের মধ্যে সংশ্লিষ্ট তথ্য বিনিময় করছে।
ঘটনাটি এমন এক সময়ে ঘটল, যখন দুই কোরিয়ার মধ্যে উত্তেজনা দ্রুত বাড়ছে। গত মাসে আন্তঃকোরীয় সীমান্ত এলাকায় স্থলমাইন বিস্ফোরণে দক্ষিণ কোরিয়ার কয়েকজন সেনা আহত হন। দক্ষিণ কোরিয়া এবং জাতিসংঘের নেতৃত্বাধীন কমান্ড ওই বিস্ফোরণের জন্য উত্তর কোরিয়ার পুঁতে রাখা মাইনকে দায়ী করেছে। তবে পিয়ংইয়ং এ অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
এর এক দিন আগে উত্তর কোরিয়ার গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তা কিম ইয়ো জং দক্ষিণ কোরিয়ার ক্ষমা চাওয়ার দাবিকে প্রত্যাখ্যান করেন। তিনি সীমান্ত এলাকায় মাইন স্থাপনের অভিযোগকে ভিত্তিহীন বলে দাবি করেন এবং দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে যোগাযোগের সম্ভাবনাও নাকচ করেন। উত্তর কোরিয়ার এই অবস্থান দুই দেশের মধ্যে রাজনৈতিক ও সামরিক উত্তেজনা আরও বাড়িয়েছে।
সাম্প্রতিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপটি উত্তর কোরিয়ার ধারাবাহিক সামরিক তৎপরতার অংশ হিসেবেও দেখা হচ্ছে। এর আগে ২০ সেপ্টেম্বর ওনসান এলাকা থেকে দুটি স্বল্পপাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করা হয়েছিল। উত্তর কোরিয়া একই সময় নতুন ধরনের অস্ত্র এবং শব্দের চেয়ে দ্রুতগতির ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তি পরীক্ষার দাবিও করেছে।
বিশ্লেষকদের কাছে ওনসান এলাকা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। উত্তর কোরিয়া এর আগেও এই অঞ্চলকে বিভিন্ন ক্ষেপণাস্ত্র ও অস্ত্র পরীক্ষার জন্য ব্যবহার করেছে। ফলে সাম্প্রতিক উৎক্ষেপণকে শুধু বিচ্ছিন্ন সামরিক পরীক্ষা হিসেবে না দেখে উত্তর কোরিয়ার বৃহত্তর অস্ত্র উন্নয়ন কর্মসূচির অংশ হিসেবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।
জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের বিভিন্ন নিষেধাজ্ঞায় উত্তর কোরিয়ার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তির ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হয়েছে। দক্ষিণ কোরিয়া এই নতুন উৎক্ষেপণকে সেই নিষেধাজ্ঞার লঙ্ঘন হিসেবে দেখছে। সিউলের জাতীয় নিরাপত্তা কর্তৃপক্ষও উত্তর কোরিয়াকে এ ধরনের উৎক্ষেপণ বন্ধ করার আহ্বান জানিয়েছে এবং বলেছে, এ ধরনের কর্মকাণ্ড বর্তমান উত্তেজনা নিয়ন্ত্রণে কোনো সহায়তা করছে না।
অন্যদিকে উত্তর কোরিয়া দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্র ও দক্ষিণ কোরিয়ার যৌথ সামরিক কর্মকাণ্ডকে নিজেদের নিরাপত্তার জন্য হুমকি হিসেবে তুলে ধরে আসছে। পিয়ংইয়ংয়ের দাবি, নিজেদের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়ানোর জন্যই তারা ক্ষেপণাস্ত্র ও অন্যান্য অস্ত্রের পরীক্ষা চালায়। তবে যুক্তরাষ্ট্র, দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপান মনে করে, এসব পরীক্ষার মাধ্যমে উত্তর কোরিয়া তার পারমাণবিক ও ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা আরও উন্নত করছে।
সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহে কোরীয় উপদ্বীপের সামরিক পরিস্থিতি তাই আবারও স্পর্শকাতর হয়ে উঠেছে। একদিকে সীমান্তে সামরিক অবকাঠামো জোরদার করছে উত্তর কোরিয়া, অন্যদিকে ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা অব্যাহত রেখেছে। দক্ষিণ কোরিয়া পাল্টা নজরদারি ও প্রস্তুতি বাড়াচ্ছে। জাপানও উত্তর কোরিয়ার ক্ষেপণাস্ত্র কার্যক্রম ঘনিষ্ঠভাবে পর্যবেক্ষণ করছে।
তবে সর্বশেষ উৎক্ষেপণের উদ্দেশ্য কী ছিল, তা এখনো নিশ্চিতভাবে জানা যায়নি। এটি নিয়মিত অস্ত্র পরীক্ষা, সামরিক সক্ষমতা প্রদর্শন, নাকি সাম্প্রতিক সীমান্ত উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে রাজনৈতিক বার্তা এ বিষয়ে কোনো নির্ভরযোগ্য সরকারি ব্যাখ্যা এখনো পাওয়া যায়নি। তাই উৎক্ষেপণকে সরাসরি কোনো নির্দিষ্ট সামরিক পদক্ষেপের পূর্বাভাস হিসেবে দেখার আগে আরও তথ্যের জন্য অপেক্ষা করাই যুক্তিসংগত।