পুতিনের নজরে রাশিয়ার বিশাল সামরিক মহড়া, ৪৭ হাজার সেনায় বাড়ছে যুদ্ধপ্রস্তুতির বার্তা

চেলিয়াবিনস্কে পুতিনের তত্ত্বাবধানে ৪৭ হাজারের বেশি সেনার মহড়া, ১১ প্রশিক্ষণক্ষেত্র ও কাস্পিয়ান সাগরে চলছে সমন্বিত সামরিক প্রস্তুতি।

পুতিনের নজরে রাশিয়ার বিশাল সামরিক মহড়া, ৪৭ হাজার সেনায় বাড়ছে যুদ্ধপ্রস্তুতির বার্তা

পুতিনের নজরে রাশিয়ার বিশাল সামরিক মহড়া, ৪৭ হাজার সেনায় বাড়ছে যুদ্ধপ্রস্তুতির বার্তা


রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন দেশটির বৃহৎ সামরিক মহড়া ‘কেন্দ্র–২০২৬’-এর চূড়ান্ত পর্যায় সরাসরি পর্যবেক্ষণ করেছেন। ২ অক্টোবর চেলিয়াবিনস্ক অঞ্চলের চেবারকুল সামরিক প্রশিক্ষণক্ষেত্রে গিয়ে তিনি সেনাদের কার্যক্রম দেখেন এবং মহড়ায় ব্যবহৃত বিভিন্ন সামরিক সরঞ্জাম ও যুদ্ধকৌশল সম্পর্কে অবহিত হন। রুশ কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এবারের মহড়ায় ৪৭ হাজারের বেশি সেনা অংশ নিচ্ছেন। বিভিন্ন প্রশিক্ষণক্ষেত্রের পাশাপাশি কাস্পিয়ান সাগরেও সামরিক কর্মকাণ্ড পরিচালিত হচ্ছে। 

রুশ প্রেসিডেন্টের ভাষ্য অনুযায়ী, মহড়ার অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হলো বাহিনীর বিভিন্ন স্তরের কমান্ড ও সদর দপ্তরের নেতৃত্বকে বহিরাগত আক্রমণ মোকাবিলায় আরও দক্ষ করে তোলা। একই সঙ্গে নতুন অস্ত্র ও সামরিক প্রযুক্তির ব্যবহারিক প্রয়োগ এবং সাম্প্রতিক যুদ্ধের অভিজ্ঞতা কাজে লাগানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। 

রুশ প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, চেবারকুল প্রশিক্ষণক্ষেত্রে মহড়ার সক্রিয় পর্যায়ে প্রায় ৬ হাজার সেনা অংশ নেয়। সেখানে প্রায় ৭০০ সামরিক যান, ৬০০টির বেশি বিভিন্ন ধরনের চালকবিহীন আকাশযান এবং ৬০টির বেশি রোবোটিক ব্যবস্থা ব্যবহারের কথা জানানো হয়েছে। এসব তথ্য থেকে বোঝা যায়, মহড়ায় শুধু প্রচলিত স্থলবাহিনীর যুদ্ধকৌশল নয়, আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর যুদ্ধব্যবস্থাকেও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। 

‘কেন্দ্র–২০২৬’ মহড়ার সঙ্গে একই সময়ে যৌথ নিরাপত্তা চুক্তি সংস্থার ‘পারস্পরিক সহযোগিতা–২০২৬’ মহড়াও পরিচালিত হচ্ছে। এর ফলে রাশিয়ার নিজস্ব সামরিক প্রস্তুতির পাশাপাশি মিত্রদেশগুলোর সঙ্গে সমন্বিতভাবে সামরিক কার্যক্রম পরিচালনার সক্ষমতাও পরীক্ষা করা হচ্ছে। সংস্থাটির কাঠামোর আওতায় রাশিয়া, বেলারুশ, কাজাখস্তান, কিরগিজস্তান ও তাজিকিস্তানের বাহিনী বিভিন্ন পর্যায়ে অংশ নিচ্ছে। আর্মেনিয়া সংস্থাটির আনুষ্ঠানিক সদস্য থাকলেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এর কার্যক্রম থেকে নিজেদের অংশগ্রহণ স্থগিত রেখেছে। 

মহড়ায় বিদেশি অংশগ্রহণও উল্লেখযোগ্য। রুশ কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, কয়েকটি দেশ নিজেদের সেনা দল পাঠিয়েছে। এর মধ্যে বেলারুশ, চীন, কিরগিজস্তান, মঙ্গোলিয়া, পাকিস্তান ও তাজিকিস্তানের সেনারা রয়েছে। কঙ্গো একটি কার্যকরী প্রতিনিধিদল পাঠিয়েছে বলেও রুশ পক্ষ জানিয়েছে। এ ছাড়া বহু দেশ পর্যবেক্ষক হিসেবে প্রতিনিধিদল পাঠিয়েছে। পুতিনের বক্তব্য অনুযায়ী, ৫৫টি দেশের প্রতিনিধিদল মহড়াটি পর্যবেক্ষণ করেছে। রুশ প্রতিরক্ষামন্ত্রী আন্দ্রেই বেলোসভ অবশ্য অংশগ্রহণকারী দেশ ও প্রতিনিধিদলের সংখ্যা নিয়ে আরও বিস্তৃত হিসাব দিয়েছেন। 

মহড়ার ভৌগোলিক বিস্তৃতিও বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। রাশিয়ার মধ্যাঞ্চল ও উরাল অঞ্চলের বিভিন্ন সামরিক প্রশিক্ষণক্ষেত্রের পাশাপাশি কাস্পিয়ান সাগরের জলসীমায় সামরিক কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। এর মাধ্যমে স্থল, আকাশ ও সমুদ্রভিত্তিক বাহিনীর মধ্যে সমন্বিত কমান্ড ও পরিচালন সক্ষমতা যাচাইয়ের সুযোগ তৈরি হয়েছে। 

রুশ কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, মহড়ায় সাম্প্রতিক সংঘাত থেকে অর্জিত অভিজ্ঞতাও বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে। বিশেষ করে চালকবিহীন আকাশযান, রোবোটিক ব্যবস্থা এবং নতুন ধরনের সামরিক সরঞ্জামের ব্যবহারকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। পুতিন মহড়া পর্যবেক্ষণের সময় রুশ বাহিনীর ব্যবহৃত নতুন ধরনের চালকবিহীন আকাশযান সম্পর্কেও অবহিত হন। 

তবে এবারের মহড়ার সামরিক গুরুত্বকে আগের কয়েকটি ‘কেন্দ্র’ মহড়ার সঙ্গে তুলনা করলে একটি বিষয় স্পষ্ট। ২০১৯ সালের ‘কেন্দ্র’ মহড়ায় প্রায় ১ লাখ ২৮ হাজার সেনা অংশ নিয়েছিল বলে সে সময় জানানো হয়েছিল। এবারের অংশগ্রহণকারী সংখ্যা ৪৭ হাজারের কিছু বেশি। অর্থাৎ সংখ্যার দিক থেকে এটি আগের সবচেয়ে বড় আয়োজনগুলোর তুলনায় ছোট। কিন্তু প্রযুক্তিনির্ভর যুদ্ধব্যবস্থা, চালকবিহীন আকাশযান ও রোবোটিক ব্যবস্থার ওপর জোর দেওয়ায় মহড়াটির চরিত্র আগের তুলনায় আরও প্রযুক্তিনির্ভর হয়েছে বলে রুশ কর্মকর্তাদের তথ্য থেকে ধারণা পাওয়া যায়। 

আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের জন্য মহড়াটির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো এর সময়কাল। ইউক্রেন যুদ্ধ চলমান থাকা এবং রাশিয়া ও পশ্চিমা সামরিক জোটের মধ্যে উত্তেজনা অব্যাহত থাকার সময়েই এই মহড়া অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এর একদিন আগে পুতিন ইউরোপ ও রাশিয়ার মধ্যকার উত্তেজনা নিয়ে সতর্কবার্তা দিয়েছিলেন এবং রাশিয়ার ভূখণ্ড আক্রান্ত হলে সব ধরনের অস্ত্র ব্যবহারের কথা পুনর্ব্যক্ত করেছিলেন। ফলে সামরিক মহড়াটি সরাসরি কোনো নির্দিষ্ট দেশের বিরুদ্ধে অভিযান শুরুর ঘোষণা না হলেও এর কৌশলগত ও রাজনৈতিক তাৎপর্য রয়েছে। 

‘কেন্দ্র- ২০২৬’ মহড়া রাশিয়ার সামরিক বাহিনীর বড় পরিসরের প্রস্তুতি যাচাইয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ আয়োজন। ৪৭ হাজারের বেশি সেনা, ১১টি প্রশিক্ষণক্ষেত্র, কাস্পিয়ান সাগর এবং একাধিক দেশের সামরিক অংশগ্রহণের মাধ্যমে মস্কো একই সঙ্গে যুদ্ধ পরিচালনা, প্রযুক্তি ব্যবহার এবং মিত্রদের সঙ্গে সমন্বয়ের সক্ষমতা প্রদর্শন করছে। তবে মহড়াটিকে কোনো নতুন যুদ্ধ শুরুর সরাসরি প্রমাণ হিসেবে দেখার মতো তথ্য এখন পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। বিদ্যমান তথ্য অনুযায়ী এটি মূলত পরিকল্পিত সামরিক প্রস্তুতি ও যৌথ সক্ষমতা যাচাইয়ের মহড়া। 


সিএসবি নিউজ-এর আরও খবর