বিমানঘাঁটি ঘিরে সন্ত্রাস তদন্ত, ব্রিটিশ-ইরানি নাগরিক গ্রেপ্তারে নতুন মোড়

ইংল্যান্ডের বিমানঘাঁটির কাছে সন্দেহজনক ঘটনার তদন্তে ব্রিটিশ-ইরানি নাগরিক গ্রেপ্তার, সম্ভাব্য বিদেশি রাষ্ট্রের সম্পৃক্ততাও খতিয়ে দেখছে পুলিশ

বিমানঘাঁটি ঘিরে সন্ত্রাস তদন্ত, ব্রিটিশ-ইরানি নাগরিক গ্রেপ্তারে নতুন মোড়

বিমানঘাঁটি ঘিরে সন্ত্রাস তদন্ত, ব্রিটিশ-ইরানি নাগরিক গ্রেপ্তারে নতুন মোড়


ব্রিটেনে একটি সামরিক বিমানঘাঁটির কাছে সন্দেহজনক কর্মকাণ্ডকে কেন্দ্র করে চলমান সন্ত্রাসবিরোধী তদন্তে নতুন করে এক ব্রিটিশ-ইরানি দ্বৈত নাগরিককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ঘটনাটি ঘটেছে ইংল্যান্ডের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের গ্লস্টারশায়ারের রয়্যাল এয়ার ফোর্স ফেয়ারফোর্ড বিমানঘাঁটির কাছে। ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২৭ বছর বয়সী ওই ব্যক্তিকে বৃহস্পতিবার লন্ডনের ওয়েস্টমিনস্টার এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। তার বিরুদ্ধে এখনো কোনো অপরাধ প্রমাণিত হয়নি এবং তাকে আদালতে দোষী সাব্যস্তও করা হয়নি। তিনি সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের প্রস্তুতির সন্দেহে পুলিশের হেফাজতে রয়েছেন। 

ব্রিটিশ সন্ত্রাসবিরোধী পুলিশ জানিয়েছে, গ্লস্টারশায়ারে গত রোববার ঘটে যাওয়া ঘটনাকে কেন্দ্র করে তদন্ত অত্যন্ত জটিল হয়ে উঠেছে। তদন্তকারীরা একাধিক সম্ভাবনা সামনে রেখে কাজ করছেন। এর মধ্যে কোনো বিদেশি রাষ্ট্রের সম্ভাব্য সম্পৃক্ততাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তবে পুলিশ এখনো প্রকাশ্যে নিশ্চিত করে বলেনি যে ঘটনাটির সঙ্গে ইরান সরকার সরাসরি জড়িত। 

এই নতুন গ্রেপ্তারের আগে গত রোববার ফেয়ারফোর্ড বিমানঘাঁটির কাছে পাঁচ ব্রিটিশ নাগরিককে আটক করা হয়েছিল। তাদের বয়স ছিল বিশের কোঠায় এবং তারা লন্ডনের বাসিন্দা। সন্দেহজনক তিনটি গাড়ি বিমানঘাঁটির দিকে যাওয়ার খবর পাওয়ার পর সশস্ত্র পুলিশ সেখানে অভিযান চালায়। প্রথমে তাদের বিস্ফোরকসংক্রান্ত আইনের অধীনে অপরাধের সন্দেহে আটক করা হয়। পরে তাদের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের প্রস্তুতির সন্দেহও যুক্ত করা হয়। 

ঘটনাটির সূত্রপাত হয় স্থানীয় একজন বাসিন্দার সতর্কবার্তা থেকে। তিনি রাতে বিমানঘাঁটির আশপাশে কয়েকটি সন্দেহজনক গাড়ি দেখতে পান। পরে বিষয়টি পুলিশকে জানানো হলে বিপুলসংখ্যক সশস্ত্র পুলিশ সদস্য এলাকায় পৌঁছান। তিনটি গাড়িকে ঘিরে তল্লাশি শুরু হয় এবং বিস্ফোরক নিষ্ক্রিয়কারী দলের সদস্যদেরও ঘটনাস্থলে পাঠানো হয়। নিরাপত্তার স্বার্থে কাছাকাছি এলাকার প্রায় ৮৫টি বাড়ির বাসিন্দাকে সাময়িকভাবে সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল। বিমানঘাঁটির আশপাশে প্রায় ৪০০ মিটার এলাকাজুড়ে নিরাপত্তা বেষ্টনীও তৈরি করা হয়। 

তল্লাশির সময় সন্দেহভাজনদের ব্যবহৃত গাড়িগুলো থেকে পেট্রল পাওয়া যায়। কিন্তু পুলিশ জানিয়েছে, সেখানে কোনো তৈরি বিস্ফোরক বা বিস্ফোরক যন্ত্র পাওয়া যায়নি। এই তথ্যটি তদন্তের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ শুরুতে ঘটনাটি বড় ধরনের হামলার আশঙ্কা তৈরি করেছিল। পাঁচজনকে পরে জামিনে মুক্তি দেওয়া হলেও তারা তদন্তের বাইরে চলে যাননি। তাদের চলাফেরা ও যোগাযোগের ওপর কঠোর শর্ত আরোপ করা হয়েছে এবং তদন্ত অব্যাহত রয়েছে। 

বৃহস্পতিবারের নতুন গ্রেপ্তারকে তদন্তের ষষ্ঠ গ্রেপ্তার হিসেবে দেখা হচ্ছে। ব্রিটিশ পুলিশের সর্বশেষ বিবৃতি অনুযায়ী, ২৭ বছর বয়সী ব্রিটিশ-ইরানি নাগরিককে সন্ত্রাসবাদ আইনের পঞ্চম ধারার অধীনে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের প্রস্তুতির সন্দেহে আটক করা হয়েছে। একই সঙ্গে লন্ডনের ওয়েস্টমিনস্টার এলাকায় দুটি স্থানে তল্লাশি চালানো হয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, তদন্তের প্রয়োজনে এসব তল্লাশি চালানো হয়েছে। 

ঘটনাটিকে ঘিরে ইরানের সম্ভাব্য সম্পৃক্ততার বিষয়টি বিশেষভাবে আলোচনায় এসেছে। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহ্যাম বুধবার জানিয়েছিলেন, ঘটনাটিতে ইরানের ভূমিকা থাকার বিষয়ে যুক্তরাজ্যের কাছে শক্তিশালী ইঙ্গিত রয়েছে। তবে তিনি প্রকাশ্যে এমন কোনো বিস্তারিত প্রমাণ দেননি যার ভিত্তিতে ঘটনাটিকে সরাসরি ইরানি সরকারের পরিকল্পনা হিসেবে চূড়ান্তভাবে ঘোষণা করা যায়। ব্রিটিশ তদন্তকারীরাও এখন পর্যন্ত বিদেশি রাষ্ট্রের সম্পৃক্ততার বিষয়টি সম্ভাবনা হিসেবে তদন্ত করছেন। 

ইরান অবশ্য এই অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে। লন্ডনে অবস্থিত ইরানি দূতাবাস ফেয়ারফোর্ডের ঘটনাকে ইরানের সঙ্গে যুক্ত করার প্রচেষ্টাকে ভিত্তিহীন বলে প্রত্যাখ্যান করেছে। ইরানের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, এমন অভিযোগের পক্ষে প্রকাশ্য প্রমাণ নেই। বৃহস্পতিবার ইরান ব্রিটিশ রাষ্ট্রদূতকেও তলব করেছে বলে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে। ফলে ঘটনাটি এখন শুধু ব্রিটেনের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা তদন্তে সীমাবদ্ধ নেই, বরং দুই দেশের মধ্যকার কূটনৈতিক উত্তেজনার সঙ্গেও যুক্ত হয়েছে। 

ফেয়ারফোর্ড বিমানঘাঁটিটি এই ঘটনার কারণে বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। এটি ব্রিটিশ সামরিক স্থাপনা হলেও সেখানে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর কার্যক্রম রয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযানের ক্ষেত্রেও ঘাঁটিটি ব্যবহৃত হয়েছে। এ কারণে ইরান-সংক্রান্ত সংঘাতের প্রেক্ষাপটে বিমানঘাঁটিটির নিরাপত্তা নিয়ে আগে থেকেই উদ্বেগ ছিল। ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষও জানিয়েছে, বিদেশি রাষ্ট্রের হয়ে সরাসরি অথবা পরোক্ষভাবে কাজ করা ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর সম্ভাব্য ভূমিকা তদন্তের আওতায় রয়েছে। 

ঘটনার পর যুক্তরাজ্যের অন্যান্য মার্কিন ব্যবহৃত সামরিক ঘাঁটির নিরাপত্তাও বাড়ানো হয়েছিল। তবে ফেয়ারফোর্ডের ঘটনায় কোনো বিস্ফোরণ ঘটেনি এবং এখন পর্যন্ত কোনো হামলা সফলভাবে সংঘটিত হয়েছে এমন তথ্যও প্রকাশ করা হয়নি। পাঁচজনের কাছ থেকে পাওয়া গাড়িতে পেট্রল থাকার বিষয়টি তদন্তকারীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হলেও এর অর্থ কী, তা এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়নি। 

এদিকে নতুন করে ব্রিটিশ-ইরানি নাগরিক গ্রেপ্তারের পর তদন্ত আরও বিস্তৃত হওয়ার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। ব্রিটিশ সন্ত্রাসবিরোধী পুলিশের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা ভিকি ইভান্স বলেছেন, তদন্তকারীরা একাধিক দিক খতিয়ে দেখছেন এবং কোনো সম্ভাবনাকেই এখনো বাদ দেওয়া হচ্ছে না। বিশেষ করে বিদেশি রাষ্ট্রের সম্ভাব্য সম্পৃক্ততা তদন্তের একটি অংশ। 

তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, গ্রেপ্তার মানেই অপরাধ প্রমাণিত হওয়া নয়। নতুন করে আটক ব্যক্তির বিরুদ্ধে এখনো আদালতে অভিযোগ প্রমাণ হয়নি। একইভাবে আগে আটক পাঁচ ব্যক্তির বিরুদ্ধেও কোনো অপরাধ আদালতে প্রমাণিত হয়নি এবং তারা জামিনে মুক্ত আছেন। ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত ঘটনাটির প্রকৃত উদ্দেশ্য, সম্ভাব্য পরিকল্পনা এবং কারা এর পেছনে ছিল সে বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেয়নি।

বয়স নিয়েও সংবাদ প্রতিবেদনে বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে। বৃহস্পতিবার প্রকাশিত ব্রিটিশ সন্ত্রাসবিরোধী পুলিশের সর্বশেষ সরকারি বিবৃতিতে ব্যক্তিটির বয়স ২৭ বছর বলা হয়েছে। অন্যদিকে রয়টার্স তাদের প্রতিবেদনে পরে বয়স ২৫ বছর হিসেবে সংশোধন করেছে। ফলে প্রকাশিত তথ্যের মধ্যে এই পার্থক্য রয়েছে। সরকারি পুলিশের সর্বশেষ বিবৃতিকে প্রাথমিক তথ্যের ক্ষেত্রে বেশি গুরুত্ব দিয়ে এই প্রতিবেদনে ২৭ বছর বয়স ব্যবহার করা হয়েছে। 


সিএসবি নিউজ-এর আরও খবর