হরমুজ প্রণালি এড়িয়ে তেল পরিবহনের নতুন প্রস্তাব, বাস্তবসম্মত নাকি কল্পনার ফসল
হরমুজ প্রণালি এড়িয়ে ওমানের স্থলপথে তেল পরিবহনের প্রস্তাব সামাজিক মাধ্যমে আলোড়ন তুললেও বাস্তবায়নে রয়েছে বিশাল ব্যয় ও অবকাঠামোগত বাধা।
হরমুজ প্রণালি এড়িয়ে তেল পরিবহনের নতুন প্রস্তাব, বাস্তবসম্মত নাকি কল্পনার ফসল
হরমুজ প্রণালি ঘিরে চলমান উত্তেজনার মধ্যে সামাজিকমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি বিকল্প পরিবহন-প্রস্তাব আবারও আলোচনার কেন্দ্রে এসেছে। প্রস্তাবটির মূল ধারণা খুব সরল পারস্য উপসাগরের দিক থেকে তেলবাহী জাহাজে থাকা অপরিশোধিত তেল হরমুজ প্রণালিতে ঢোকার আগেই নামিয়ে ফেলতে হবে। এরপর সেই তেল সড়কপথে ওমানের ভেতর দিয়ে আরব সাগরের উপকূলে নিয়ে গিয়ে অন্য জাহাজে তুলে আবার সমুদ্রপথে পাঠানো হবে। প্রস্তাবটি প্রথম প্রকাশ করেন ভারতীয় শিল্পপতি হর্ষ গোয়েঙ্কা। তিনি সামাজিকমাধ্যমে নকশাটি দিয়ে প্রশ্ন করেছিলেন, এটি সমাধান হতে পারে কি না।
প্রস্তাবটি কেন এত দ্রুত আলোচনায় এসেছে, তার পেছনে রয়েছে হরমুজ প্রণালির কৌশলগত গুরুত্ব। মধ্যপ্রাচ্যের তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস পরিবহনের অন্যতম প্রধান পথ এই সরু জলপথ। যুদ্ধের আগে বিশ্বে সমুদ্রপথে পরিবহন হওয়া তেলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই পথ দিয়ে যেত। ফলে প্রণালিতে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হলে শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়, এশিয়া, ইউরোপসহ বিশ্বের বহু দেশের জ্বালানি বাজারে তার প্রভাব পড়ে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে বিষয়টি আরও স্পর্শকাতর। ১ অক্টোবর প্রকাশিত প্রতিবেদনে দেখা গেছে, হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল আবারও উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। সাম্প্রতিক এক সপ্তাহান্তে মাত্র পাঁচটি বাণিজ্যিক জাহাজ প্রণালিটি অতিক্রম করেছিল, আর পরের দিন কোনো জাহাজের চলাচল নিবন্ধিত হয়নি। এর আগের একই সময়ে ৩১টি জাহাজ চলাচল করেছিল। তেলবাহী জাহাজে হামলার পর নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ায় এই ধীরগতি তৈরি হয়েছে।
এর মধ্যেই মঙ্গলবার হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী তিনটি লাইবেরিয়ার পতাকাবাহী তেলবাহী জাহাজ অজ্ঞাত উৎসের গোলার আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে সামুদ্রিক গোয়েন্দা সংস্থার তথ্য উঠে এসেছে। হামলার উৎস ও ব্যবহৃত অস্ত্র সম্পর্কে তখনও নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি। ঘটনাটি বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে।
এই বাস্তবতায় সামাজিকমাধ্যমের স্থলপথে তেল পরিবহনের ধারণাটি প্রথম দেখায় আকর্ষণীয় মনে হতে পারে। কিন্তু বড় প্রশ্ন হলো এটি কি বাস্তবে বিপুল পরিমাণ তেল পরিবহনের সক্ষমতা রাখে?
উত্তরটি হলো, সীমিত পরিমাণে কোনো জরুরি পরিবহন হিসেবে ধারণাটি কল্পনা করা গেলেও বিশ্ববাজারের স্বাভাবিক তেল প্রবাহের বিকল্প হিসেবে এটি বাস্তবসম্মত নয়। একটি বড় অপরিশোধিত তেলবাহী জাহাজে প্রায় ২০ লাখ ব্যারেল পর্যন্ত তেল থাকতে পারে। এমন একটি জাহাজের পুরো তেল ট্রাকে করে পরিবহন করতে হলে হাজার হাজার তেলবাহী ট্রাক প্রয়োজন হবে।
আর হরমুজ প্রণালির স্বাভাবিক তেল পরিবহনের পরিমাণ এর চেয়ে বহু গুণ বেশি। তাই একটি বা কয়েকটি জাহাজের তেল স্থলপথে সরিয়ে নেওয়া সম্ভব হলেও প্রতিদিন কোটি কোটি ব্যারেল তেলের সমপরিমাণ প্রবাহ ট্রাকের মাধ্যমে ওমানের মরুভূমি পেরিয়ে নেওয়া প্রায় অসম্ভব। এর জন্য বিপুলসংখ্যক ট্রাক, চালক, জ্বালানি, মহাসড়ক, সংরক্ষণাগার, পাম্পিং ব্যবস্থা, নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং সীমান্ত ও বন্দর অবকাঠামো প্রয়োজন হবে।
আরেকটি বড় সমস্যা হলো তেল একবার জাহাজ থেকে নামিয়ে আবার অন্য জাহাজে তোলার প্রক্রিয়া। এতে অতিরিক্ত সময়, শ্রম, সংরক্ষণব্যবস্থা ও পরিবহন ব্যয় যুক্ত হবে। প্রতিটি ধাপে তেল ছড়িয়ে পড়া, অগ্নিকাণ্ড বা দুর্ঘটনার ঝুঁকিও থাকবে। দীর্ঘমেয়াদি বাণিজ্যিক পরিবহনের ক্ষেত্রে এই অতিরিক্ত খরচ তেলের চূড়ান্ত মূল্য বাড়িয়ে দিতে পারে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ওমানের ভেতর দিয়ে বিপুল পরিমাণ তেল স্থলপথে নেওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো বর্তমানে এমন মাত্রায় প্রস্তুত নয় যে হরমুজ প্রণালির স্বাভাবিক প্রবাহের বিকল্প হিসেবে তাৎক্ষণিকভাবে ব্যবহার করা যাবে। ফলে সামাজিকমাধ্যমের নকশাটি মূলত একটি ধারণাগত বিকল্প, পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নযোগ্য পরিকল্পনা নয়।
তবে এর অর্থ এই নয় যে হরমুজ প্রণালি এড়িয়ে তেল পরিবহনের কোনো বাস্তব বিকল্প নেই। সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত ইতিমধ্যে এমন পাইপলাইন ব্যবস্থা গড়ে তুলেছে, যার মাধ্যমে হরমুজ প্রণালি এড়িয়ে কিছু তেল সরাসরি অন্য বন্দর দিয়ে রপ্তানি করা যায়। এসব ব্যবস্থা তুলনামূলকভাবে কার্যকর হলেও এগুলোর ধারণক্ষমতাও হরমুজ প্রণালির পুরো প্রবাহের বিকল্প হওয়ার মতো নয়।
সাম্প্রতিক সময়ে আরেকটি পদ্ধতিও ব্যবহার করা হচ্ছে। হরমুজ প্রণালির বাইরে, ওমান উপসাগরে এক জাহাজ থেকে অন্য জাহাজে তেল স্থানান্তর করা হচ্ছে। সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে এই ধরনের জাহাজ-থেকে-জাহাজ স্থানান্তর ব্যবস্থা উল্লেখযোগ্য মাত্রায় ব্যবহৃত হলেও রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী এর সক্ষমতারও সীমা দেখা দিয়েছে।
অর্থাৎ বাস্তব পরিস্থিতি দেখাচ্ছে, বিশ্ববাজার হরমুজ প্রণালির ওপর নির্ভরতা কিছুটা কমাতে পারলেও পুরোপুরি বিকল্প তৈরি করা এখনো সম্ভব হয়নি। সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের পাইপলাইন, ওমান উপসাগরে জাহাজ বদল, আফ্রিকা বা অন্যান্য অঞ্চল থেকে বিকল্প উৎস এবং দীর্ঘ সমুদ্রপথ সবগুলো একসঙ্গে ব্যবহার করে সংকটের প্রভাব কমানোর চেষ্টা চলছে। সেপ্টেম্বর মাসে হরমুজ দিয়ে অপরিশোধিত তেলের রপ্তানি দৈনিক প্রায় ১ কোটি ৬৫ লাখ ব্যারেলে ফিরে এলেও পরিশোধিত জ্বালানি পরিবহন এখনো যুদ্ধ-পূর্ব সময়ের তুলনায় অনেক কম ছিল।
বর্তমান পরিস্থিতিতে আরও একটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। হরমুজ প্রণালির সংকট শুধু জ্বালানি সরবরাহের সমস্যা নয়; এর সঙ্গে জড়িত জাহাজভাড়া, বিমা, বন্দর ব্যবস্থাপনা, নিরাপত্তা এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের খরচ। সেপ্টেম্বরেই বড় তেলবাহী জাহাজের ভাড়া রেকর্ড পর্যায়ে উঠেছিল। যুদ্ধ ও হামলার কারণে জাহাজ মালিকেরা দীর্ঘ সমুদ্রপথ বেছে নেওয়ায় পরিবহন ব্যয় আরও বেড়েছে।
তাই সামাজিকমাধ্যমে আলোচিত প্রস্তাবটি পুরোপুরি হাস্যকরও নয়। জরুরি পরিস্থিতিতে সীমিত পরিমাণ পণ্য স্থলপথে সরিয়ে নেওয়ার ধারণা বাস্তব পরিকল্পনার একটি অংশ হতে পারে। কিন্তু হরমুজ প্রণালির বিপুল দৈনিক তেল পরিবহনের বিকল্প হিসেবে শুধু ট্রাক ব্যবহার করা বাস্তবসম্মত নয়।