চীনের জ্বালানি রপ্তানি বন্ধ, বিশ্ববাজারে সরবরাহ সংকট আরও তীব্র হওয়ার শঙ্কা

অভ্যন্তরীণ মজুত রক্ষায় চীন অক্টোবরজুড়ে হংকং ও ম্যাকাও ছাড়া অন্যত্র পরিশোধিত জ্বালানি রপ্তানি স্থগিত করেছে, বাড়ছে বৈশ্বিক সরবরাহ উদ্বেগ।

চীনের জ্বালানি রপ্তানি বন্ধ, বিশ্ববাজারে সরবরাহ সংকট আরও তীব্র হওয়ার শঙ্কা

চীনের জ্বালানি রপ্তানি বন্ধ, বিশ্ববাজারে সরবরাহ সংকট আরও তীব্র হওয়ার শঙ্কা


চীনের এই সিদ্ধান্ত আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ পরিশোধন সক্ষমতার অধিকারী দেশটি অক্টোবর মাসে হংকং ও ম্যাকাও ছাড়া অন্যান্য বাজারে পরিশোধিত জ্বালানি পাঠানো কার্যত বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সংশ্লিষ্ট চারটি সূত্র রয়টার্সকে জানিয়েছে, বেইজিংয়ের কাছ থেকে নতুন অনুমতি না পাওয়া পর্যন্ত এই স্থগিতাদেশ বহাল থাকবে। একই সময়ে চীনের অভ্যন্তরীণ জ্বালানি মজুত নিরাপদ পর্যায়ে রাখাই কর্তৃপক্ষের প্রধান লক্ষ্য বলে মনে করা হচ্ছে। 


চীনের রাষ্ট্রীয় জ্বালানি প্রতিষ্ঠান পেট্রোচায়না এরই মধ্যে অক্টোবর মাসের জন্য নির্ধারিত কয়েকটি পেট্রল ও উড়োজাহাজের জ্বালানি পরিবহন বাতিল করেছে। তিনটি সূত্র জানিয়েছে, বাতিল হওয়া বেশির ভাগ চালানের চুক্তি গত দুই সপ্তাহের মধ্যেই করা হয়েছিল। আরেকটি বড় পরিশোধনকারী প্রতিষ্ঠান ঝেজিয়াং পেট্রোকেমিক্যালও জাতীয় ছুটির সপ্তাহে কোনো জ্বালানি চালান নির্ধারণ করেনি। 


চীনের সিদ্ধান্তের সময়টিও বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। ১ অক্টোবর থেকে দেশটিতে শুরু হয়েছে দীর্ঘ জাতীয় ছুটি, যা ৭ অক্টোবর পর্যন্ত চলবে। এই সময়ে দেশীয় ভ্রমণ ও পরিবহন কার্যক্রম বাড়ায় জ্বালানির অভ্যন্তরীণ চাহিদা বৃদ্ধির সম্ভাবনা থাকে। একই সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্য ও রাশিয়া থেকে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি সরবরাহ ইতিমধ্যে বিভিন্ন কারণে চাপে রয়েছে। ফলে চীনের রপ্তানি কমে গেলে আন্তর্জাতিক বাজারে অতিরিক্ত সরবরাহের ঘাটতি তৈরি হতে পারে। 


রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, চীন চলতি বছরের মার্চ থেকেই পরিশোধিত জ্বালানি রপ্তানিতে বিধিনিষেধ আরোপ করেছিল। পরে জুলাই থেকে সেপ্টেম্বরের মধ্যে কিছুটা শিথিলতা আনা হয়। কিন্তু অভ্যন্তরীণ মজুত ও বৈশ্বিক সরবরাহ পরিস্থিতি বিবেচনায় অক্টোবরের শুরুতে আবারও রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ কঠোর করা হয়েছে। অর্থাৎ এটি সম্পূর্ণ নতুন কোনো নীতি নয়; বরং কয়েক মাস ধরে চলা সরবরাহ-নিরাপত্তা নীতির আরও কঠোর রূপ। 


চীনের অভ্যন্তরীণ জ্বালানি মজুত নিয়ে বাজারে বিশেষ উদ্বেগ রয়েছে। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাণিজ্যিক গ্যাসতেল ও ডিজেলের মজুত বেইজিংয়ের রপ্তানি অনুমোদনের জন্য নির্ধারিত সীমার তুলনায় প্রায় দুই কোটি ব্যারেল কম এবং পেট্রলের মজুত প্রায় ৯০ লাখ ব্যারেল কম। ফলে চীনা কর্তৃপক্ষ আপাতত বিদেশে জ্বালানি বিক্রির চেয়ে দেশের অভ্যন্তরীণ সরবরাহ নিশ্চিত করাকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। 


এই সিদ্ধান্তের প্রভাব এশিয়ার বাজারে দ্রুত দেখা যেতে শুরু করেছে। বিশেষ করে ডিজেল, পেট্রল এবং উড়োজাহাজের জ্বালানির বাজারে চীনের সরবরাহ গুরুত্বপূর্ণ। একটি বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ডিজেলের বাজার ইতিমধ্যেই তুলনামূলকভাবে সংকুচিত; ফলে চীনের রপ্তানি কমে গেলে সরবরাহের ওপর আরও চাপ তৈরি হতে পারে। 


বাজারের প্রতিক্রিয়াও তাৎক্ষণিক হয়েছে। ১ অক্টোবর এশিয়ার ডিজেল পরিশোধন মুনাফা এক সপ্তাহের সর্বোচ্চ পর্যায়ে উঠে প্রায় ৭৫ ডলারে পৌঁছায়। অক্টোবর ও নভেম্বরের দামের ব্যবধানও দুই সপ্তাহের সর্বোচ্চ পর্যায়ে ওঠে। এর অর্থ হলো ব্যবসায়ীরা নিকট ভবিষ্যতে জ্বালানি সরবরাহ আরও সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা করছেন। 


অপরিশোধিত তেলের বাজারেও এর প্রভাব পড়েছে। রয়টার্স জানিয়েছে, চীনের রপ্তানি স্থগিতের খবরের পর আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম প্রায় ৩ শতাংশ বেড়ে প্রতি ব্যারেল ১০১ ডলারের ওপরে উঠেছিল। যুক্তরাষ্ট্রের তেলের দামও ৯২ ডলারের ওপরে ওঠে। অর্থাৎ চীনের সিদ্ধান্ত সরাসরি শুধু পরিশোধিত জ্বালানির বাজারেই নয়, অপরিশোধিত তেলের মূল্যবাজারেও নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে। 


এর পেছনে আরেকটি বড় কারণ হলো বিশ্বজুড়ে পরিশোধন সক্ষমতার ওপর চাপ। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত এবং রাশিয়ার বিভিন্ন পরিশোধনাগারে হামলার কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত হয়েছে। একই সময়ে বিভিন্ন দেশে ডিজেলের ঘাটতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। ফলে চীনের মতো বড় সরবরাহকারী যদি নিজেদের বাজারের জন্য অতিরিক্ত জ্বালানি ধরে রাখে, তাহলে অন্য দেশগুলোকে বিকল্প উৎস খুঁজতে হবে। 


এশিয়ার দেশগুলোর জন্য পরিস্থিতি আরও গুরুত্বপূর্ণ। চীন এ অঞ্চলের অন্যতম বড় পরিশোধিত জ্বালানি সরবরাহকারী। এর আগে চীনের রপ্তানি কমার ফলে অস্ট্রেলিয়া, বাংলাদেশ ও ফিলিপাইনের মতো দেশগুলোকে বিকল্প উৎস থেকে জ্বালানি সংগ্রহের প্রয়োজন দেখা দিয়েছিল। মার্চে চীনের রপ্তানি নিষেধাজ্ঞা নিয়ে রয়টার্সের বিশ্লেষণেও এসব দেশের ওপর সম্ভাব্য প্রভাবের কথা উল্লেখ করা হয়েছিল।


তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো চীন সব ধরনের জ্বালানি রপ্তানি চিরতরে বন্ধ করে দিয়েছে, এমন তথ্য এখনো নেই। বর্তমান তথ্য অনুযায়ী, অক্টোবরের জন্য হংকং ও ম্যাকাও ছাড়া অন্য গন্তব্যে রপ্তানি স্থগিত রাখা হয়েছে। ৭ অক্টোবর জাতীয় ছুটি শেষ হওয়ার পর অভ্যন্তরীণ মজুত, পরিশোধনাগারের উৎপাদন এবং বাজার পরিস্থিতি বিবেচনা করে বেইজিং নতুন সিদ্ধান্ত নিতে পারে। 


এ কারণে বর্তমান ঘটনাকে স্থায়ী রপ্তানি নিষেধাজ্ঞার পরিবর্তে অভ্যন্তরীণ জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সাময়িক ও কঠোর রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ হিসেবে দেখা বেশি সঠিক। তবে এই নিয়ন্ত্রণ কত দিন চলবে, সেটিই এখন আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।


সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া দাবিটির মূল বক্তব্য সঠিক হলেও ‘অক্টোবরের জন্য স্থায়ীভাবে সব রপ্তানি বন্ধ’ বলা অতিরঞ্জিত হবে। নির্ভরযোগ্য সূত্র অনুযায়ী, চীন অক্টোবর মাসে হংকং ও ম্যাকাও ছাড়া অন্যান্য গন্তব্যে পরিশোধিত জ্বালানি রপ্তানি স্থগিত করেছে এবং পেট্রোচায়না কয়েকটি পেট্রল ও উড়োজাহাজের জ্বালানি চালান বাতিল করেছে। এর ফলে ইতিমধ্যে চাপে থাকা আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে সরবরাহ সংকট ও মূল্যবৃদ্ধির ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে।

সিএসবি নিউজ-এর আরও খবর