পুতিনের বার্তা, ইউরোপের কোনো দেশেই হামলার পরিকল্পনা নেই ২০৩০ বা ২০৫০

পুতিন বলেছেন রাশিয়া ইউরোপের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চায় না, তবে হামলা হলে কঠোর জবাবের কথাও আজকের বক্তব্যে পুনর্ব্যক্ত করেছেন তিনি স্পষ্টভাবে।

পুতিনের বার্তা, ইউরোপের কোনো দেশেই হামলার পরিকল্পনা নেই ২০৩০ বা ২০৫০

পুতিনের বার্তা, ইউরোপের কোনো দেশেই হামলার পরিকল্পনা নেই ২০৩০ বা ২০৫০


রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ইউরোপের সঙ্গে সম্ভাব্য সামরিক সংঘাত নিয়ে নতুন করে অবস্থান স্পষ্ট করেছেন। ১ অক্টোবর মস্কো অঞ্চলে অনুষ্ঠিত ভালদাই আন্তর্জাতিক আলোচনা ক্লাবের বার্ষিক সভায় তিনি বলেন, রাশিয়া অন্য কোনো দেশের বিরুদ্ধে হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছে না। তাঁর বক্তব্যে ২০২৯, ২০৩০ এবং ২০৫০ সাল এই তিনটি সময়ের কথাও উঠে আসে। 


পুতিনের এই মন্তব্য এমন এক সময়ে এসেছে, যখন রাশিয়া ও ইউরোপের মধ্যে সামরিক উত্তেজনা, ইউক্রেন যুদ্ধ এবং ভবিষ্যতে উত্তর আটলান্টিক জোটের কোনো সদস্যদেশের সঙ্গে সংঘাতের আশঙ্কা নিয়ে আলোচনা তীব্র হয়েছে। রাশিয়ার পক্ষ থেকে দীর্ঘদিন ধরেই বলা হচ্ছে, ইউরোপের সঙ্গে সরাসরি যুদ্ধ শুরু করার কোনো আগ্রহ মস্কোর নেই। গত ২৫ সেপ্টেম্বরও পুতিন বলেছিলেন, ইউরোপের বিরুদ্ধে কোনো সামরিক অভিযান পরিচালনার পরিকল্পনা রাশিয়ার নেই এবং এমন সংঘাত শুরু করার বাস্তব কারণও তিনি দেখেন না। 


১ অক্টোবরের বক্তব্যে পুতিন আরও বলেন, রাশিয়া কাউকে হুমকি দিচ্ছে না এবং ইউরোপের সঙ্গে উত্তেজনা বাড়াতে চায় না। তবে রাশিয়ার ভূখণ্ডে হামলা হলে মস্কো পাল্টা ব্যবস্থা নিতে বাধ্য হবে এমন অবস্থানও তিনি পুনর্ব্যক্ত করেন। রাশিয়ার সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে তাঁর বক্তব্যের এই দুই দিকই উঠে এসেছে। 


এখানেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া দাবিটির গুরুত্বপূর্ণ প্রেক্ষাপট রয়েছে। শুধু ‘রাশিয়া ইউরোপে হামলা করবে না’ এই অংশটি তুলে ধরলে পুতিনের বক্তব্যের একটি অংশ প্রকাশ পায়, কিন্তু পুরো বক্তব্যের রাজনৈতিক ও সামরিক প্রেক্ষাপট বোঝা যায় না। তিনি একই সঙ্গে বলেছেন, রাশিয়ার বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপ নেওয়া হলে তার জবাব দেওয়া হবে।


পুতিনের বক্তব্যের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, তিনি ইউরোপের কয়েকটি দেশের রাশিয়াকে ঘিরে নিরাপত্তা উদ্বেগকে রাজনৈতিক উত্তেজনা বাড়ানোর প্রচেষ্টা হিসেবে দেখেছেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, ইউরোপের কিছু মহলে রাশিয়ার সম্ভাব্য হামলার আশঙ্কা তুলে ধরে সামরিক প্রস্তুতি জোরদার করা হচ্ছে। এর বিপরীতে মস্কো দাবি করছে, ইউরোপের সঙ্গে সরাসরি সংঘাত রাশিয়ার স্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। 


তবে ইউরোপীয় দেশগুলোর উদ্বেগ পুরোপুরি অমূলক এমন সিদ্ধান্তেও পৌঁছানো যায় না। গত ৩০ সেপ্টেম্বর উত্তর আটলান্টিক জোটের মহাসচিব মার্ক রুটে বলেন, রাশিয়ার পক্ষ থেকে জোটের ভূখণ্ডে তাৎক্ষণিক হামলার কোনো আশঙ্কা বর্তমানে নেই। একই সঙ্গে তিনি বলেন, রাশিয়া যদি ফিনল্যান্ড, পোল্যান্ড কিংবা বাল্টিক অঞ্চলের কোনো জোটভুক্ত দেশে সামরিক পদক্ষেপ নিতে চায়, তার আগে উল্লেখযোগ্য সামরিক প্রস্তুতি দেখা যাওয়ার কথা। 


এর আগে ডেনমার্কের সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা আরও সতর্ক অবস্থান প্রকাশ করেছিল। সেপ্টেম্বরের শেষ সপ্তাহে প্রকাশিত এক মূল্যায়নে তারা বলেছিল, আগামী কয়েক মাসে রাশিয়ার পক্ষ থেকে জোটভুক্ত কোনো দেশের বিরুদ্ধে সীমিত সামরিক পদক্ষেপের ঝুঁকি কম হলেও বাড়ছে। একই প্রতিবেদনে অবশ্য পূর্ণমাত্রার আক্রমণের সম্ভাবনাকে খুব কম বলা হয়েছিল এবং এমন পরিস্থিতি নিশ্চিত নয় বলেও উল্লেখ করা হয়। 


ফলে পুতিনের সাম্প্রতিক বক্তব্য এবং ইউরোপীয় নিরাপত্তা মূল্যায়নের মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্য রয়েছে। মস্কো বলছে, ইউরোপের বিরুদ্ধে যুদ্ধের কোনো পরিকল্পনা নেই। অন্যদিকে ইউরোপের কিছু নিরাপত্তা সংস্থা সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ ঝুঁকি বিবেচনা করে সামরিক প্রস্তুতি বাড়ানোর পক্ষে অবস্থান নিচ্ছে। দুই পক্ষের বক্তব্যের এই পার্থক্যই বর্তমান ইউরোপীয় নিরাপত্তা পরিস্থিতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য।


এদিকে ১ অক্টোবরের ভালদাই সভায় পুতিন শুধু ইউরোপ নয়, বৃহত্তর আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি নিয়েও মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, বিশ্বের মৌলিক পরিবর্তনের কারণে আগামী বছরগুলোতে আন্তর্জাতিক সংঘাত অব্যাহত থাকার আশঙ্কা রয়েছে। একই সঙ্গে তিনি বিপর্যয়কর পরিস্থিতি এড়ানোর প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্ব দেন। 


অর্থাৎ, পুতিনের বক্তব্যকে ইউরোপের সঙ্গে উত্তেজনা কমানোর একটি রাজনৈতিক বার্তা হিসেবে দেখা যেতে পারে, কিন্তু এটিকে ভবিষ্যতে কোনো সংঘাতের নিশ্চয়তামূলক পূর্বাভাস হিসেবে দেখা যায় না। ২০৩০ বা ২০৫০ সাল সম্পর্কে তাঁর বক্তব্য মূলত রাশিয়ার বর্তমান সরকারি অবস্থান তুলে ধরে মস্কো ইউরোপীয় দেশগুলোর বিরুদ্ধে আগ্রাসী যুদ্ধের পরিকল্পনা করছে না। তবে ভবিষ্যৎ আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি পরিবর্তিত হলে কী হবে, সে বিষয়ে কোনো নেতা কয়েক দশক আগাম নিশ্চয়তা দিতে পারেন না।


সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া দাবিটি ভিত্তিহীন নয়; পুতিন সত্যিই সাম্প্রতিক বক্তব্যে ইউরোপের বিরুদ্ধে রাশিয়ার হামলার পরিকল্পনা নেই বলে জানিয়েছেন এবং ২০৩০ ও ২০৫০ সালের কথাও উল্লেখ করেছেন। তবে এটিকে ‘ইউরোপে কখনোই কোনো যুদ্ধ হবে না’ এমন নিশ্চয়তা হিসেবে ব্যাখ্যা করা সঠিক হবে না। একই বক্তব্যে রাশিয়ার ওপর হামলা হলে পাল্টা জবাব দেওয়ার অবস্থানও স্পষ্ট করা হয়েছে।

সিএসবি নিউজ-এর আরও খবর