জর্জিয়ার ভোটার তালিকা মামলায় ট্রাম্প সরকারের আবেদন খারিজ, বিচারকের রায়ে নতুন বিতর্ক

জর্জিয়ার গোপনীয় ভোটার তথ্য চেয়ে করা মামলায় আদালতের রায়ের পর নির্বাচন নিরাপত্তা ও ব্যক্তিগত গোপনীয়তা নিয়ে নতুন বিতর্ক শুরু হয়েছে।

জর্জিয়ার ভোটার তালিকা মামলায় ট্রাম্প সরকারের আবেদন খারিজ, বিচারকের রায়ে নতুন বিতর্ক

জর্জিয়ার ভোটার তালিকা মামলায় ট্রাম্প সরকারের আবেদন খারিজ, বিচারকের রায়ে নতুন বিতর্ক


যুক্তরাষ্ট্রের জর্জিয়া অঙ্গরাজ্যের ভোটার তালিকা নিয়ে ট্রাম্প প্রশাসন ও অঙ্গরাজ্য সরকারের দীর্ঘ আইনি বিরোধে নতুন মোড় এসেছে। বুধবার, ৩০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সালে ফেডারেল বিচারক ভিক্টোরিয়া মেরি ক্যালভার্ট মার্কিন বিচার বিভাগের করা মামলাটি খারিজ করে দিয়েছেন। মামলাটির মাধ্যমে জর্জিয়ার সম্পূর্ণ ও অপ্রকাশিত ভোটার তালিকা সরকারের কাছে হস্তান্তরের নির্দেশ চাওয়া হয়েছিল। 

তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া দাবির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ এখানে স্পষ্ট করা দরকার। মামলাটি খারিজ হয়েছে ঠিকই, কিন্তু আদালত এমন কোনো সিদ্ধান্ত দেয়নি যে জর্জিয়ায় অনিবন্ধিত বিদেশি নাগরিক বা অযোগ্য ভোটার নেই। আবার মামলাটি খারিজ হওয়ার অর্থও এই নয় যে জর্জিয়া ভোটার তালিকা যাচাই করছে না। বরং আদালতের মূল প্রশ্ন ছিল, কেন্দ্রীয় সরকার অঙ্গরাজ্যের গোপনীয় ব্যক্তিগত তথ্য চাওয়ার জন্য যে আইনগুলোর ওপর নির্ভর করেছে, সেগুলো সত্যিই এমন তথ্য হস্তান্তর বাধ্যতামূলক করে কি না। 

মামলায় মার্কিন বিচার বিভাগ জর্জিয়ার সম্পূর্ণ ভোটার নিবন্ধন তালিকা চেয়েছিল। এতে ভোটারদের নামের পাশাপাশি জন্মতারিখ, আবাসিক ঠিকানা, চালকের লাইসেন্সের নম্বর এবং সামাজিক নিরাপত্তা নম্বরের শেষ কয়েকটি সংখ্যা থাকার কথা ছিল। জর্জিয়ার পররাষ্ট্রসচিব ব্র্যাড রাফেন্সপারগার এসব তথ্য দেওয়ার বিরোধিতা করেন। তাঁর বক্তব্য ছিল, অঙ্গরাজ্যের আইন অনুযায়ী ভোটারদের কিছু ব্যক্তিগত তথ্য গোপনীয় এবং সেই তথ্য প্রকাশ করা আইনবিরুদ্ধ হতে পারে। 

মার্কিন বিচার বিভাগ অবশ্য ভিন্ন অবস্থান নিয়েছিল। তাদের যুক্তি ছিল, ভোটার তালিকা সংরক্ষণ ও যাচাইয়ের ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় নির্বাচনী আইন অঙ্গরাজ্যগুলোকে নির্দিষ্ট নথি সংরক্ষণ ও পরিদর্শনের সুযোগ দিতে বাধ্য করে। সরকার বলেছিল, এই তথ্যের মাধ্যমে ভোটার তালিকা সঠিকভাবে রক্ষণাবেক্ষণ হচ্ছে কি না এবং যোগ্যতার বাইরে থাকা ব্যক্তিরা তালিকায় রয়েছেন কি না, তা যাচাই করা সম্ভব হবে। 

কিন্তু বিচারক ক্যালভার্টের ৩০ সেপ্টেম্বরের রায়ে বলা হয়েছে, যেসব কেন্দ্রীয় আইনের ওপর বিচার বিভাগ নির্ভর করেছে, সেগুলো জর্জিয়াকে ভোটারদের সংবেদনশীল ও গোপনীয় তথ্য হস্তান্তর করতে বাধ্য করে না। আদালত আরও বলেছে, সংশ্লিষ্ট কেন্দ্রীয় আইন জর্জিয়ার ভোটার তথ্যের গোপনীয়তা রক্ষার আইনকে বাতিল করে না। আদালতের মতে, জর্জিয়া গোপনীয় ব্যক্তিগত তথ্য প্রকাশ না করেও কেন্দ্রীয় ভোটার তালিকা রক্ষণাবেক্ষণের আইন মেনে চলতে পারে। 

এখানে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের আরেকটি দাবিও যাচাই করা জরুরি। প্রচারিত বক্তব্যে বলা হয়েছে, মামলাটি একজন ‘বাইডেনের বিচারক’ খারিজ করেছেন। বিচারক ভিক্টোরিয়া মেরি ক্যালভার্ট সত্যিই সাবেক প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের মনোনীত বিচারক। ফেডারেল বিচারকেন্দ্রের সরকারি তথ্য অনুযায়ী, বাইডেন ২০২২ সালের জানুয়ারিতে তাঁকে মনোনীত করেন এবং একই বছরের ২২ মার্চ মার্কিন সিনেট তাঁর নিয়োগ অনুমোদন করে। 

তবে শুধু কোনো প্রেসিডেন্টের মনোনীত বিচারক হওয়া থেকে রায়ের কারণ বা বিচারকের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য সম্পর্কে সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না। প্রকাশিত রায়ের ভিত্তিতে মামলাটি খারিজের কারণ ছিল আইনি এখতিয়ার, অঙ্গরাজ্যের গোপনীয়তা আইন এবং কেন্দ্রীয় আইন ওই তথ্য প্রকাশের জন্য যথেষ্ট কি না—এসব প্রশ্ন। তাই ‘বাইডেনের বিচারক বলেই মামলা খারিজ করেছেন’—এমন কোনো প্রমাণিত তথ্য পাওয়া যায়নি। 

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই মামলাটি শুরু থেকেই সরাসরি ভোটকেন্দ্রে অবৈধভাবে ভোট দেওয়া ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কোনো ফৌজদারি মামলা ছিল না। এটি ছিল ভোটার নিবন্ধনের তথ্য কেন্দ্রীয় সরকারের হাতে দেওয়া হবে কি না, সেই আইনি বিরোধ। ফলে মামলা খারিজের অর্থ এই নয় যে অযোগ্য ভোটারদের যাচাই বন্ধ হয়ে গেছে বা বিদেশি নাগরিকদের ভোট দেওয়ার অধিকার দেওয়া হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের আইন অনুযায়ী ফেডারেল নির্বাচনে ভোট দেওয়ার অধিকার নাগরিকদের জন্য নির্ধারিত। 

জর্জিয়ায় নাগরিকত্ব যাচাইয়ের ব্যবস্থাও ইতোমধ্যে রয়েছে। অঙ্গরাজ্যের নির্বাচনী নিয়ম অনুযায়ী ভোটার নিবন্ধনের সময় মার্কিন নাগরিকত্ব যাচাইয়ের ব্যবস্থা রয়েছে। চালকের লাইসেন্স বা পরিচয়পত্রের তথ্যের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সরকারি তথ্য মিলিয়ে দেখা হয় এবং প্রয়োজন হলে কেন্দ্রীয় অভিবাসন তথ্যভাণ্ডারের সাহায্য নেওয়া হয়। 

চলতি বছর জর্জিয়ার ভোটার তালিকা নিয়েও বিভিন্ন সরকারি যাচাই হয়েছে। অঙ্গরাজ্যের নির্বাচনী বোর্ডের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত কেন্দ্রীয় নাগরিকত্ব যাচাই ব্যবস্থার মাধ্যমে ৪২ হাজার ৭৭৬ জন মৃত নিবন্ধিত ব্যক্তি এবং ২ হাজার ৫৪৯ জন অ-নাগরিক নিবন্ধিত ব্যক্তিকে শনাক্ত করার তথ্য প্রকাশ করা হয়েছিল। তবে এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য হলো, কোনো ব্যক্তির নাম ভোটার তালিকায় থাকা এবং সেই ব্যক্তি বাস্তবে অবৈধভাবে ভোট দিয়েছেন—দুটি এক বিষয় নয়। 

জর্জিয়ার সরকারি তথ্য অনুযায়ী, সেপ্টেম্বরের শুরুতে প্রকাশিত একটি স্বাধীন পর্যালোচনায় অঙ্গরাজ্যের ভোটার তালিকা ব্যবস্থাকে ৯৯ দশমিক ৯ শতাংশ নির্ভুল হিসেবে উল্লেখ করা হয়। ওই পর্যালোচনায় পরিচয়, ঠিকানা, মৃত্যুর তথ্য, অপরাধজনিত অযোগ্যতা এবং অন্যান্য যোগ্যতার পরিবর্তন শনাক্ত করার বিভিন্ন প্রক্রিয়া পরীক্ষা করা হয়েছিল। 

এদিকে সেপ্টেম্বরেই জর্জিয়ায় তিন বিদেশি নাগরিকের বিরুদ্ধে ফেডারেল নির্বাচনে অবৈধভাবে ভোট দেওয়ার অভিযোগে মামলা হয়েছে বলে মার্কিন বিচার বিভাগ জানিয়েছে। অভিযোগগুলো এখনো আদালতে বিচারাধীন এবং অভিযুক্ত ব্যক্তিরা আইনগতভাবে দোষী সাব্যস্ত না হওয়া পর্যন্ত নির্দোষ হিসেবে বিবেচিত হবেন। এই ঘটনাগুলো দেখায় যে অবৈধ ভোটের অভিযোগ তদন্ত করা হচ্ছে, কিন্তু কয়েকটি নির্দিষ্ট মামলাকে কেন্দ্র করে পুরো ভোটার ব্যবস্থায় ব্যাপক অবৈধ ভোট হচ্ছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না। 

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রশ্ন তোলা হয়েছে, ‘জর্জিয়া কী লুকাচ্ছে?’ আদালতের রায় থেকে এমন কোনো তথ্য পাওয়া যায় না যে অঙ্গরাজ্য সরকার কোনো অবৈধ ভোটার তালিকা লুকিয়ে রাখছে। বরং প্রকাশিত নথি অনুযায়ী, রাফেন্সপারগারের দপ্তর কেন্দ্রীয় সরকারকে ভোটার তালিকার প্রকাশযোগ্য তথ্য দিয়েছে এবং গোপনীয় ব্যক্তিগত তথ্য প্রকাশে আপত্তি জানিয়েছে। আদালতও বলেছে, গোপনীয় তথ্য না দিয়েও কেন্দ্রীয় আইনের তালিকা রক্ষণাবেক্ষণের শর্ত পূরণ করা সম্ভব। 

ফ্লোরিডার বিষয়টিও আলাদা করে যাচাই করা হয়েছে। ফ্লোরিডা সত্যিই কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে ভোটার সংক্রান্ত নথি নিয়ে সহযোগিতা করেছে। মার্কিন বিচার বিভাগের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে ফ্লোরিডা কেন্দ্রীয় সরকারের চাওয়া নির্বাচনী নথি পরিদর্শনে সহযোগিতা করে। পাশাপাশি ফ্লোরিডা নিজস্ব আইনের অধীনে ভোটার নিবন্ধন ও ভোটদানের ইতিহাসের নির্দিষ্ট তথ্য জনসাধারণের জন্যও সরবরাহ করে। 

তাই ‘ফ্লোরিডা সহযোগিতা করেছে, ফলে প্রত্যেক অঙ্গরাজ্যকেও একইভাবে করতে হবে’—এটি একটি রাজনৈতিক মতামত বা দাবি; আদালতের প্রতিষ্ঠিত সিদ্ধান্ত নয়। বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে ভোটার তথ্যের গোপনীয়তা, প্রকাশের নিয়ম এবং কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে তথ্য বিনিময়ের আইনি কাঠামো এক নয়।

আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, জর্জিয়ায় এর আগেও একই তথ্য চেয়ে মামলা করা হয়েছিল। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরের সেই প্রথম মামলাটি ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে একজন ফেডারেল বিচারক খারিজ করেন, কারণ মামলাটি ভুল বিচারিক অঞ্চলে করা হয়েছিল। এরপর বিচার বিভাগ নতুন করে আটলান্টাভিত্তিক ফেডারেল আদালতে মামলা করে। এবার বিচারক ক্যালভার্ট মামলার মূল আইনি প্রশ্নে গিয়ে বিচার বিভাগের দাবি প্রত্যাখ্যান করেছেন। 

মামলাটির আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো, এর মধ্যে বিচারক পরিবর্তনও হয়েছিল। বিচারক এলিনর রসকে নিয়ে বিচার বিভাগের আপত্তির পর তিনি জুন মাসে মামলা থেকে সরে দাঁড়ান। এরপর মামলাটি বিচারক ভিক্টোরিয়া ক্যালভার্টের কাছে যায় এবং শেষ পর্যন্ত তিনিই ৩০ সেপ্টেম্বরের রায় দেন। 

সব মিলিয়ে প্রচারিত দাবিটির মূল ঘটনা সত্য, কিন্তু এর সঙ্গে যুক্ত কিছু ব্যাখ্যা বিভ্রান্তিকর। সত্য হলো, ৩০ সেপ্টেম্বর জর্জিয়ার ভোটার তালিকার সংবেদনশীল তথ্য চেয়ে করা ট্রাম্প প্রশাসনের মামলাটি খারিজ হয়েছে। সত্য হলো, রায় দিয়েছেন বাইডেন মনোনীত বিচারক ভিক্টোরিয়া ক্যালভার্ট। সত্য হলো, ফ্লোরিডা কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে ভোটার নথি নিয়ে সহযোগিতা করেছে। কিন্তু ‘মামলা খারিজ হওয়ায় জর্জিয়া অবৈধ ভোটারদের লুকাচ্ছে’—এমন সিদ্ধান্তের পক্ষে আদালতের রায়ে কোনো প্রমাণ নেই।

বরং আদালতের সিদ্ধান্তের কেন্দ্রে ছিল ব্যক্তিগত তথ্যের গোপনীয়তা এবং কেন্দ্রীয় আইন অঙ্গরাজ্যকে কতটা তথ্য প্রকাশে বাধ্য করতে পারে, সেই প্রশ্ন। একই সঙ্গে জর্জিয়ায় নাগরিকত্ব যাচাই ও ভোটার তালিকা সংশোধনের কার্যক্রম চলমান রয়েছে। ফলে ঘটনাটিকে শুধু ‘ভোটার তালিকা লুকানো’ হিসেবে উপস্থাপন করা তথ্যভিত্তিক হবে না; এটি মূলত কেন্দ্রীয় সরকার ও অঙ্গরাজ্যের মধ্যে নির্বাচনী তথ্যের অধিকার, গোপনীয়তা এবং আইনি ক্ষমতার সীমা নিয়ে চলমান বিরোধ। 


সিএসবি নিউজ-এর আরও খবর