ট্রাম্পের ভাষ্যে প্লাম্বারের হস্তক্ষেপে আকাশপথে ভয়াবহ বিপদ থেকে রক্ষা পেল ১৭৪ যাত্রী
আকাশে হঠাৎ বিপদ, ককপিটে হামলা, বিমান নিচে নামছে, তখনই যাত্রীর সাহসী হস্তক্ষেপে দুর্ঘটনা এড়ানো সম্ভব হয় অবশেষে সবাই নিরাপদে ফেরেন।
ট্রাম্পের ভাষ্যে প্লাম্বারের হস্তক্ষেপে আকাশপথে ভয়াবহ বিপদ থেকে রক্ষা পেল ১৭৪ যাত্রী
ঘটনাটি ঘটে ফ্লাইদুবাইয়ের ১০৭৩ নম্বর ফ্লাইটে। বিমানটি সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাই থেকে ইসরায়েলের তেল আবিবের দিকে যাচ্ছিল। এতে মোট ১৭৪ জন ছিলেন বলে বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে। যাত্রীদের বড় অংশ ছিলেন ইসরায়েলি নাগরিক। উড্ডয়নের প্রায় আড়াই ঘণ্টা পর বিমানের ভেতরে পরিস্থিতি হঠাৎ ভয়াবহ হয়ে ওঠে।
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর কার্যালয়ের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সহকারী পাইলট মূল পাইলটকে ছুরিকাঘাত করেন। এরপর বিমানের নিয়ন্ত্রণে অস্বাভাবিক পরিস্থিতি তৈরি হয় এবং বিমানটি দ্রুত নিচে নামতে শুরু করে। উড়োজাহাজের গতিপথ পর্যবেক্ষণকারী তথ্য অনুযায়ী, বিমানটি অল্প সময়ের মধ্যে প্রায় ১৪ হাজার ফুট নিচে নেমে যায়। অন্য একটি বিশ্লেষণে আরও বড় উচ্চতা পতনের কথাও উঠে এসেছে।
এই সময় বিমানে থাকা যাত্রীদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। অনেকে চিৎকার করতে থাকেন। বিমানের ভেতরে থাকা কয়েকজন বুঝতে পারেন, পরিস্থিতি স্বাভাবিক নয় এবং দ্রুত কোনো ব্যবস্থা না নিলে ভয়াবহ দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।
এই অবস্থায় কয়েকজন যাত্রী ও ক্রু সদস্য ককপিটের দিকে এগিয়ে যান। যাত্রী ইয়ানিভ হায়ুন পরে ঘটনাটি সম্পর্কে বিস্তারিত বর্ণনা দেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, আহত মূল পাইলট ককপিটের দরজা খোলার সুযোগ তৈরি করে দেন। এরপর যাত্রীরা ভেতরে ঢুকে হামলাকারীকে নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করেন।
হায়ুনের বক্তব্য অনুযায়ী, ককপিটে ঢোকার পর তিনি দেখেন আহত পাইলট মাটিতে পড়ে আছেন এবং অন্য ব্যক্তি বিমানের নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার কাছে অবস্থান করছেন। যাত্রীরা মিলে ওই ব্যক্তিকে আটক করার চেষ্টা করেন। একপর্যায়ে হায়ুন নিজেও বিমানের নিয়ন্ত্রণ ধরেন এবং দ্রুত নিচে নামতে থাকা বিমানটিকে স্থিতিশীল করার চেষ্টা করেন। পরে দায়িত্ব নেওয়া অন্য পাইলট বিমানটির নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করেন।
এখানেই প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের বর্ণনার সঙ্গে ঘটনাটির সবচেয়ে আলোচিত অংশটি সামনে আসে। হোয়াইট হাউসে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় ট্রাম্প বলেন, তিনি নেতানিয়াহুর সঙ্গে এ ঘটনা নিয়ে দীর্ঘ সময় কথা বলেছেন। নেতানিয়াহুর কাছ থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ট্রাম্প বলেন, বিমানে থাকা একজন ইসরায়েলি প্লাম্বার জরুরি পরিস্থিতিতে বিমানটি স্থিতিশীল করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।
ট্রাম্প আরও বলেন, ওই ব্যক্তি আগে কখনো বিমান চালাননি। কিন্তু ককপিট থেকে চিৎকার শুনে তিনি সেখানে ছুটে যান এবং বিমান নিচে নেমে যাওয়ার সময় নিয়ন্ত্রণ ধরে সেটিকে স্থিতিশীল করার চেষ্টা করেন। ট্রাম্পের ভাষ্য অনুযায়ী, ওই যাত্রী কীভাবে বিমান নিয়ন্ত্রণের বিষয়ে কিছুটা ধারণা পেয়েছিলেন, তার উত্তর ছিল টেলিভিশনে বিমান দুর্ঘটনা নিয়ে অনুষ্ঠান দেখার অভিজ্ঞতা।
তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হলো, ট্রাম্প নিজেই তাঁর বর্ণনার বিষয়ে সতর্কতা দিয়েছেন। তিনি সাংবাদিকদের বলেছেন, এটি তাঁর শোনা ঘটনা এবং তিনি নিজে ঘটনাটি প্রত্যক্ষ করেননি। অর্থাৎ প্লাম্বারটির ভূমিকা সম্পর্কে ট্রাম্পের বর্ণনা সরাসরি স্বাধীন তদন্তের ফল নয়; এটি নেতানিয়াহু ও অন্যদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে তাঁর দেওয়া বিবরণ।
অন্যদিকে, বার্তা সংস্থা রয়টার্স, অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস এবং অন্যান্য প্রতিবেদনে যাত্রী ও ক্রু সদস্যদের হস্তক্ষেপের বিষয়টি নিশ্চিত হয়েছে। রয়টার্স জানিয়েছে, যাত্রী ও ক্রু সদস্যরা ককপিটে ঢুকে সহকারী পাইলটকে নিয়ন্ত্রণে আনেন। এরপর বিমানে থাকা আরও দুইজন ফ্লাইদুবাই পাইলট দায়িত্ব নিয়ে বিমানটি সৌদি আরবের তাবুক বিমানবন্দরে নিরাপদে অবতরণ করান।
অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের প্রতিবেদনে ইয়ানিভ হায়ুনের ভূমিকার কথাও উঠে এসেছে। তাঁকে আহত অবস্থায় রক্তমাখা পোশাকে হামলাকারীর সঙ্গে লড়াই করতে দেখা যায়। তিনি ও অন্যরা ককপিটে ঢুকে হামলাকারীকে দমন করেন। ঘটনাটির পর নেতানিয়াহু হায়ুনের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন এবং তাঁর সাহসিকতার প্রশংসা করেন।
বিমানটি তখন ভয়াবহ অবস্থার মধ্যে ছিল। উড়োজাহাজের গতিপথের তথ্য থেকে দেখা যায়, এটি দ্রুত নিচে নেমে যাওয়ার পর আবার উচ্চতা পরিবর্তন করে এবং কয়েক দফা অস্বাভাবিক ওঠানামা করে। একপর্যায়ে জরুরি সংকেতও পাঠানো হয়। প্রথমে সাধারণ জরুরি সংকেত দেওয়া হয়। পরে অবৈধ হস্তক্ষেপের সংকেত পাঠানো হয়। এতে বিমানটি ছিনতাইয়ের শিকার হয়েছে কি না, তা নিয়ে আশপাশের দেশগুলোর মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়।
ইসরায়েলও পরিস্থিতিকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে নেয়। সম্ভাব্য ছিনতাইয়ের আশঙ্কায় ইসরায়েলি যুদ্ধবিমান প্রস্তুত করা হয়েছিল বলে একাধিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে পরে বিমানটি সৌদি আরবের তাবুকে নিরাপদে অবতরণ করে।
অবতরণের পর বিমানের আহত পাইলট ও সহকারী পাইলটকে চিকিৎসার জন্য নেওয়া হয়। মূল পাইলটের পরিচয় ভারতীয় নাগরিক স্মিত মাচ্ছার হিসেবে প্রকাশ করা হয়েছে। ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় জানিয়েছে, গুরুতর আহত হওয়ার পরও তিনি ককপিটের দরজা খোলার সুযোগ তৈরি করেছিলেন, যা যাত্রী ও ক্রু সদস্যদের ভেতরে ঢোকার সুযোগ করে দেয়।
ঘটনার পর হামলাকারী সহকারী পাইলটকে সৌদি কর্তৃপক্ষ আটক করে। তাঁর উদ্দেশ্য কী ছিল, সেটি এখনো তদন্তাধীন। ইসরায়েলি কর্মকর্তাদের একজন তাঁকে ওমানের নাগরিক হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তবে তাঁর পরিচয় ও উদ্দেশ্য সম্পর্কে তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে না যাওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। ফ্লাইদুবাইও জানিয়েছে, ককপিটে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছিল, কিন্তু এর পেছনের কারণ তখনো জানা যায়নি এবং আগাম কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানো উচিত নয়।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ঘটনাটিকে অত্যন্ত গুরুতর বলে উল্লেখ করলেও হামলাকারী সন্ত্রাসী ছিলেন কি না, সে বিষয়ে তিনি নিশ্চিত কোনো তথ্য দেননি। তিনিও বলেছেন, তিনি যে বিবরণ দিয়েছেন সেটি তাঁর কাছে পৌঁছানো তথ্যের ভিত্তিতে। ফলে এই মুহূর্তে হামলার উদ্দেশ্যকে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড হিসেবে চূড়ান্তভাবে ঘোষণা করার মতো তদন্ত-সমর্থিত তথ্য প্রকাশ্যে আসেনি।
ঘটনার পর ইসরায়েল বিমান চলাচলের নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও কঠোর করার উদ্যোগ নিয়েছে। ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে ইসরায়েলগামী উড়োজাহাজে কর্মরত পাইলটদের নিরাপত্তা যাচাই বাড়ানোর নির্দেশ দিয়েছেন বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। বিশেষ করে বিদেশি বিমান সংস্থার পাইলটদের যাচাই প্রক্রিয়া নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
সব যাত্রী শেষ পর্যন্ত নিরাপদে ইসরায়েলে পৌঁছেছেন। সৌদি আরবের তাবুক থেকে তাঁদের জন্য আরেকটি বিমান পাঠানো হয় এবং পরে তাঁরা তেল আবিবের বেন গুরিয়ন বিমানবন্দরে পৌঁছান। বিমানবন্দরে ফিরে আসার পর অনেক যাত্রী আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন এবং তাঁদের জীবন রক্ষায় যারা ককপিটে ঢুকে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করেছিলেন, তাঁদের প্রশংসা করেন।
সব মিলিয়ে তথ্য যাচাইয়ের ভিত্তিতে বলা যায়, ট্রাম্পের বক্তব্যের মূল ঘটনা—ইসরায়েলগামী বিমানে ককপিটে সহিংসতা, বিমানটির দ্রুত নিচে নেমে যাওয়া এবং যাত্রী ও ক্রু সদস্যদের হস্তক্ষেপে বিপর্যয় এড়ানো—একাধিক নির্ভরযোগ্য প্রতিবেদনে সমর্থিত। তবে একজন প্লাম্বার ঠিক কতটা সময় বিমানটির নিয়ন্ত্রণে ছিলেন এবং তাঁর একক ভূমিকা কতটা ছিল, সে বিষয়ে ট্রাম্পের বর্ণনার সব অংশ এখনো স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হয়নি। তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত ঘটনাটির এই অংশকে নিশ্চিত তথ্যের বদলে প্রত্যক্ষ বর্ণনা হিসেবে দেখা হচ্ছে।