যুক্তরাষ্ট্রে ৩.২ বিলিয়ন ডলারের জাহাজ নির্মাণ প্রকল্পে ১০ হাজার কর্মসংস্থানের নতুন আশা
টেক্সাসের ব্রাউনসভিলে ৩.২ বিলিয়ন ডলারের জাহাজ নির্মাণ প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন, ১০ হাজার চাকরি সৃষ্টির প্রত্যাশায় যুক্তরাষ্ট্রের সামুদ্রিক শিল্পে বিনিয়োগের সূচনা।
যুক্তরাষ্ট্রে ৩.২ বিলিয়ন ডলারের জাহাজ নির্মাণ প্রকল্পে ১০ হাজার কর্মসংস্থানের নতুন আশা
যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস অঙ্গরাজ্যের ব্রাউনসভিলে ৩ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলারের বিশাল জাহাজ নির্মাণ প্রকল্পের আনুষ্ঠানিক নির্মাণকাজ শুরু হয়েছে। স্থানীয় সময় বুধবার, ৩০ সেপ্টেম্বর, সারোনিক টেকনোলজিসের প্রস্তাবিত পোর্ট আলফা প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়। অনুষ্ঠানে যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স, টেক্সাসের গভর্নর গ্রেগ অ্যাবট এবং সারোনিকের শীর্ষ কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
তথ্য যাচাই করে দেখা গেছে, প্রকল্পটির বিনিয়োগের পরিমাণ বিভিন্ন সরকারি ও স্থানীয় নথিতে ৩ দশমিক ২ বিলিয়ন থেকে ৩ দশমিক ২৪৮ বিলিয়ন ডলার হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। টেক্সাস গভর্নরের কার্যালয় নির্দিষ্ট অঙ্ক হিসেবে ৩ দশমিক ২৪৮ বিলিয়ন ডলার উল্লেখ করেছে। ফলে শুধু ৩ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলার বলা ভুল নয়, তবে আরও নির্ভুলভাবে বললে প্রকল্পটির ঘোষিত মূলধনী বিনিয়োগ ৩ দশমিক ২৪৮ বিলিয়ন ডলার।
প্রকল্পটির নাম পোর্ট আলফা। এটি টেক্সাসের ব্রাউনসভিল বন্দরে নির্মিত হবে এবং প্রথম পর্যায়ে প্রায় ৮৩৫ একর জায়গাজুড়ে এর অবকাঠামো গড়ে তোলা হবে। ভবিষ্যতে প্রকল্পটি প্রায় ৪ হাজার ৪০০ একর পর্যন্ত সম্প্রসারণের সুযোগ রাখছে। প্রাথমিক পর্যায়ের স্থাপনা থেকে সর্বোচ্চ প্রায় ৮৫০ ফুট দীর্ঘ জাহাজ নির্মাণ করা সম্ভব হবে বলে প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে। ভবিষ্যতে সম্প্রসারণ হলে ১ হাজার ২০০ ফুটের বেশি দৈর্ঘ্যের জাহাজ নির্মাণের সক্ষমতাও তৈরি হতে পারে।
সবচেয়ে আলোচিত বিষয়গুলোর একটি হলো কর্মসংস্থান। সারোনিক এবং স্থানীয় কর্তৃপক্ষের হিসাব অনুযায়ী, প্রকল্পটি পূর্ণ সক্ষমতায় পৌঁছালে আগামী এক দশকে সর্বোচ্চ ১০ হাজার সরাসরি কর্মসংস্থান তৈরি হতে পারে। এসব চাকরির মধ্যে থাকবে ঢালাই, যন্ত্রাংশ তৈরি, প্রকৌশল, উন্নত উৎপাদন প্রযুক্তি, রোবট পরিচালনা, নৌযান নকশা এবং বিভিন্ন কারিগরি পেশা। তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় পরিষ্কার রাখা দরকার। ১০ হাজার চাকরি ইতিমধ্যে সৃষ্টি হয়নি। এটি প্রকল্পটি ধাপে ধাপে পূর্ণ সক্ষমতায় পৌঁছানোর পর সম্ভাব্য সরাসরি কর্মসংস্থানের হিসাব।
টেক্সাসের গভর্নরের কার্যালয় জানিয়েছে, প্রকল্পটি পুরোপুরি গড়ে উঠলে বছরে প্রায় ৭৫০ মিলিয়ন ডলার মজুরি প্রদানের সম্ভাবনা রয়েছে। একই সঙ্গে টেক্সাস অঙ্গরাজ্যের অর্থনীতিতে প্রকল্পটির সম্ভাব্য দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ২৬৪ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার এবং ক্যামেরন কাউন্টির ক্ষেত্রে ১৬০ বিলিয়ন ডলারের বেশি হতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের হিসাব। এসব সংখ্যা প্রকল্পের অনুমানভিত্তিক দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক প্রভাব, নিশ্চিত আয় বা নিশ্চিত কর্মসংস্থানের পরিমাণ নয়।
ব্রাউনসভিলকে প্রকল্পটির জন্য বেছে নেওয়ার পেছনে কয়েকটি কারণ রয়েছে। শহরটি মেক্সিকো সীমান্তের কাছে এবং মেক্সিকো উপসাগরের উপকূলে অবস্থিত। ব্রাউনসভিল বন্দর যুক্তরাষ্ট্র-মেক্সিকো সীমান্তে সরাসরি অবস্থিত একটি গভীর সমুদ্রবন্দর। বন্দরের সঙ্গে গভীর নৌপথ, স্থল পরিবহন ও অন্যান্য মালামাল পরিবহন অবকাঠামোর সংযোগ রয়েছে। এসব সুবিধা বড় জাহাজ নির্মাণ প্রকল্পের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
এ বছরের জুনে ব্রাউনসভিল বন্দরের নৌপথ আরও গভীর করার একটি বড় অবকাঠামোগত কাজও সম্পন্ন হয়েছে। ওই প্রকল্পের মাধ্যমে প্রবেশ ও বাঁধসংলগ্ন নৌপথের গভীরতা ৪৪ ফুট থেকে ৫৪ ফুট এবং মূল নৌপথের গভীরতা ৪২ ফুট থেকে ৫২ ফুট করা হয়েছে। বড় জাহাজ চলাচল এবং ভারী মালামাল পরিবহনের সক্ষমতা বাড়ানোর ক্ষেত্রে এই পরিবর্তন গুরুত্বপূর্ণ।
পোর্ট আলফা শুধু সাধারণ বাণিজ্যিক জাহাজ নির্মাণের জন্য তৈরি হচ্ছে না। সারোনিক মূলত স্বয়ংক্রিয় ও স্বয়ংক্রিয়ভাবে পরিচালনাযোগ্য সামুদ্রিক যান তৈরির প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করে। প্রকল্পটির পরিকল্পনায় বাণিজ্যিক এবং প্রতিরক্ষা উভয় ধরনের জাহাজ নির্মাণের কথা রয়েছে। এর ফলে ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর জন্য ব্যবহৃত বিভিন্ন ধরনের নৌযানও এই স্থাপনায় তৈরি হতে পারে।
প্রকল্পটির সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর সাম্প্রতিক কয়েকটি সিদ্ধান্তেরও সম্পর্ক রয়েছে। ১৫ সেপ্টেম্বর নৌবাহিনী সারোনিকসহ তিনটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে এলসিইউ ১৭০০ শ্রেণির অবতরণকারী নৌযান তৈরির জন্য প্রাথমিক চুক্তি করে। নৌবাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, সারোনিক ব্রাউনসভিলের জন্য নির্বাচিত প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি এবং এই কর্মসূচির আওতায় প্রাথমিক পর্যায়ে কয়েকটি নৌযান নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে।
এরপর ২৯ সেপ্টেম্বর নৌবাহিনী ঘোষণা করে, মাঝারি আকারের স্বয়ংক্রিয় পৃষ্ঠজাহাজ কর্মসূচির আওতায় সারোনিক, এইচআইআই এবং গ্যালিয়ানো মেরিন সার্ভিসেসকে উৎপাদন চুক্তি দেওয়া হয়েছে। প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের জন্য ১০টি করে মোট ৩০টি নৌযান সংগ্রহের পরিকল্পনা করা হয়েছে। প্রতি নৌযানের গড় ক্রয়মূল্য প্রায় ৪০ মিলিয়ন ডলার এবং প্রথম নৌযানগুলো ২০২৭ অর্থবছর শেষ হওয়ার আগেই সরবরাহের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
এই তথ্য পোর্ট আলফা প্রকল্পের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তব দিক তুলে ধরে। অর্থাৎ ভবিষ্যতে কারখানা চালু হলে শুধু সম্ভাব্য বাজারের ওপর নির্ভর করতে হবে না, সারোনিক ইতোমধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর বিভিন্ন কর্মসূচিতে জায়গা করে নিয়েছে। তবে এসব চুক্তি পোর্ট আলফায় সব উৎপাদন শুরু হয়ে গেছে—এমন দাবি করার সুযোগ নেই। কারণ নতুন স্থাপনাটি এখনো নির্মাণের প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে এবং উৎপাদন কার্যক্রম ধাপে ধাপে শুরু হওয়ার কথা।
সারোনিক জানিয়েছে, পোর্ট আলফার কার্যক্রম ২০২৮ সালে শুরু করার লক্ষ্য রয়েছে। নির্মাণের প্রথম ধাপে সীমিত পরিসরে উৎপাদন শুরু করে পরে চাহিদা অনুযায়ী স্থাপনা বাড়ানোর পরিকল্পনা করা হয়েছে। পূর্ণ সম্প্রসারণের পর প্রকল্পটি কয়েক হাজার একর এলাকায় ছড়িয়ে পড়তে পারে।
এই প্রকল্প বাস্তবায়নে সরকারি সহায়তাও রয়েছে। টেক্সাস অঙ্গরাজ্য সারোনিককে ৮০ মিলিয়ন ডলারের একটি অনুদান দিয়েছে। পাশাপাশি সাবেক সেনাসদস্যদের কর্মসংস্থান উৎসাহিত করার জন্য আরও ৭৮ হাজার ডলারের একটি সহায়তা দেওয়া হয়েছে। ক্যামেরন কাউন্টিও প্রকল্পটি আকর্ষণ করতে ২০ বছরের জন্য ৯৫ শতাংশ সম্পত্তি কর ছাড়ের চুক্তি অনুমোদন করেছে।
স্থানীয় জনগণকে ভবিষ্যতের চাকরির জন্য প্রস্তুত করার বিষয়টিও প্রকল্পের পরিকল্পনার অংশ। ব্রাউনসভিলের অর্থনৈতিক উন্নয়ন সংস্থা কর্মীদের দক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূচির জন্য ১০ মিলিয়ন ডলার দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। স্থানীয় কারিগরি প্রতিষ্ঠান ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সঙ্গে প্রশিক্ষণ এবং শিক্ষানবিশ কর্মসূচি তৈরির পরিকল্পনাও রয়েছে।
জাহাজ নির্মাণশিল্পে একটি বড় প্রকল্পের প্রভাব শুধু সরাসরি চাকরির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। ইস্পাত, বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি, জাহাজের ইঞ্জিন, যোগাযোগব্যবস্থা, পরিবহন, নির্মাণসামগ্রী, রক্ষণাবেক্ষণ, নিরাপত্তা এবং বিভিন্ন ধরনের যন্ত্রাংশ সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানও এর মাধ্যমে কাজ পেতে পারে। ফলে ১০ হাজার সরাসরি চাকরির বাইরেও স্থানীয় অর্থনীতিতে অতিরিক্ত কর্মসংস্থান তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে এসব পরোক্ষ কর্মসংস্থানের নির্দিষ্ট সংখ্যা এখনো নিশ্চিত নয়।
প্রকল্পটি যুক্তরাষ্ট্রের জাহাজ নির্মাণ সক্ষমতা বাড়ানোর বৃহত্তর উদ্যোগের সঙ্গেও যুক্ত। সাম্প্রতিক সময়ে মার্কিন নৌবাহিনী একাধিক নতুন নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে উৎপাদন বাড়ানোর চেষ্টা করছে। একাধিক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে উৎপাদন ভাগ করে দেওয়ার লক্ষ্য হলো সরবরাহব্যবস্থাকে আরও বিস্তৃত করা এবং কোনো একটি প্রতিষ্ঠানের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমানো। নৌবাহিনীর সাম্প্রতিক এলসিইউ কর্মসূচির ঘোষণাতেও এই বিষয়টি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে।
বুধবারের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন অনুষ্ঠান তাই শুধু একটি নতুন কারখানা নির্মাণের সূচনা নয়। এটি টেক্সাসের দক্ষিণাঞ্চলে জাহাজ নির্মাণ, উন্নত উৎপাদন এবং স্বয়ংক্রিয় সামুদ্রিক প্রযুক্তির একটি বড় কেন্দ্র গড়ে তোলার পরিকল্পনার আনুষ্ঠানিক শুরু। তবে প্রকল্পটির প্রকৃত অর্থনৈতিক সাফল্য নির্ভর করবে নির্মাণকাজের গতি, অর্থায়নের ধারাবাহিকতা, শ্রমিক নিয়োগ, প্রশিক্ষণ, উৎপাদন সক্ষমতা এবং নৌবাহিনীসহ অন্যান্য ক্রেতার কাছ থেকে ভবিষ্যৎ আদেশের ওপর।
ফ্যাক্ট যাচাইয়ের সারসংক্ষেপ হলো, ৩ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগের তথ্য সঠিক এবং সরকারি নথিতে আরও নির্দিষ্টভাবে ৩ দশমিক ২৪৮ বিলিয়ন ডলার উল্লেখ রয়েছে। ১০ হাজার কর্মসংস্থানের তথ্যও সঠিক, তবে এটি ভবিষ্যৎ সম্ভাব্য সরাসরি চাকরির হিসাব, ইতিমধ্যে তৈরি হওয়া চাকরির সংখ্যা নয়। ৮৩৫ একর প্রাথমিক জমি, প্রায় ৪ হাজার ৪০০ একর পর্যন্ত সম্প্রসারণের সুযোগ, ২০২৮ সালে কার্যক্রম শুরুর লক্ষ্য এবং নৌবাহিনীর সঙ্গে সাম্প্রতিক চুক্তিগুলোর তথ্যও বিভিন্ন সরকারি ও নির্ভরযোগ্য সূত্রে নিশ্চিত হয়েছে।
সব মিলিয়ে, ব্রাউনসভিলে পোর্ট আলফা প্রকল্প যুক্তরাষ্ট্রের সামুদ্রিক শিল্পে বড় পরিসরের একটি নতুন বিনিয়োগ। প্রকল্পটি পুরোপুরি বাস্তবায়িত হলে দক্ষিণ টেক্সাসে হাজারো কর্মসংস্থান, নতুন সরবরাহব্যবস্থা এবং উন্নত জাহাজ নির্মাণ অবকাঠামো গড়ে উঠতে পারে। এখন মূল নজর থাকবে নির্মাণের অগ্রগতি, স্থানীয় নিয়োগ এবং ২০২৮ সালের নির্ধারিত উৎপাদন শুরুর লক্ষ্যে প্রকল্পটি কতটা এগোয় তার ওপর।