পিয়ার্স মরগানের সরাসরি প্রশ্নে নেতানিয়াহুকে যুদ্ধাপরাধী বললেন কাতারের প্রধানমন্ত্রী

পিয়ার্স মরগানের সরাসরি প্রশ্নে গাজায় সংঘটিত কর্মকাণ্ডকে যুদ্ধাপরাধ বলে দায়ীদের যুদ্ধাপরাধী বলেছেন কাতারের প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ বিন আবদুর রহমান আল থানি।

পিয়ার্স মরগানের সরাসরি প্রশ্নে নেতানিয়াহুকে যুদ্ধাপরাধী বললেন কাতারের প্রধানমন্ত্রী

পিয়ার্স মরগানের সরাসরি প্রশ্নে নেতানিয়াহুকে যুদ্ধাপরাধী বললেন কাতারের প্রধানমন্ত্রী


কাতারের প্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী শেখ মোহাম্মদ বিন আবদুর রহমান আল থানি বলেছেন, গাজায় সংঘটিত কর্মকাণ্ড যুদ্ধাপরাধের পর্যায়ে পড়ে এবং এসব কর্মকাণ্ডের জন্য যারা দায়ী, তারা যুদ্ধাপরাধী। ব্রিটিশ সাংবাদিক পিয়ার্স মরগানের সরাসরি প্রশ্নের জবাবে মঙ্গলবার দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি এ কথা বলেন। সাক্ষাৎকারটি ২৯ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত হয়। 

পিয়ার্স মরগান সরাসরি জানতে চান, ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে তিনি যুদ্ধাপরাধী মনে করেন কি না। জবাবে কাতারের প্রধানমন্ত্রী বলেন, গাজায় যা করা হয়েছে তা যুদ্ধাপরাধ এবং যে ব্যক্তি বা ব্যক্তিরা এর জন্য দায়ী, তারা যুদ্ধাপরাধী। প্রশ্নটির উত্তর দিতে গিয়ে তিনি নেতানিয়াহুর নামও সরাসরি উল্লেখ করেন। 

সাক্ষাৎকারে কাতারের প্রধানমন্ত্রী একই সঙ্গে ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর ইসরায়েলে হামলার কথাও উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, ওই হামলা ছিল হত্যাযজ্ঞ এবং এর সঙ্গে জড়িতদের জবাবদিহির আওতায় আনা উচিত। তবে তাঁর বক্তব্য ছিল, হামাসের ওই হামলা ইসরায়েলের পরবর্তী সামরিক কর্মকাণ্ডকে ন্যায্যতা দেয় না। 

তিনি বিশেষভাবে গাজার হাসপাতাল ও বিদ্যালয়ে হামলার বিষয়টি তুলে ধরেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, কোনো ধরনের যুক্তি দেখিয়েই এ ধরনের কর্মকাণ্ডকে ন্যায্যতা দেওয়া যায় না। একই সঙ্গে তিনি গাজায় বেসামরিক মানুষের ওপর চলমান ক্ষয়ক্ষতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। 

জাতিসংঘের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনের তথ্যও গাজার পরিস্থিতি নিয়ে গুরুতর উদ্বেগের কথা বলছে। জাতিসংঘের মধ্যপ্রাচ্য শান্তিপ্রক্রিয়া বিষয়ক দপ্তর জানিয়েছে, ২০২৫ সালের অক্টোবরের যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পরও গাজায় সহিংসতা বন্ধ হয়নি। ইসরায়েলি বিমান হামলা, গোলাবর্ষণ ও স্থল অভিযান অব্যাহত থাকার পাশাপাশি ফিলিস্তিনি হতাহতের ঘটনাও ঘটছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুদ্ধবিরতির পর অন্তত ১ হাজার ৩৮৬ ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন এবং ৪ হাজার ৭৮৪ জন আহত হয়েছেন। 

জাতিসংঘের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, গাজার প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ এলাকা এখনো প্রবেশের ক্ষেত্রে কঠোর বিধিনিষেধের মধ্যে রয়েছে। ফলে বহু ফিলিস্তিনি সাধারণ নাগরিক নিরাপদ ও স্থিতিশীল পরিবেশে বসবাস করতে পারছেন না। প্রায় তিন বছর ধরে চলা সংঘাতের কারণে বিপুলসংখ্যক মানুষ বারবার বাস্তুচ্যুত হয়েছেন এবং গাজার অবকাঠামো ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। 

জাতিসংঘের মানবাধিকার দপ্তর এর আগেও গাজায় বেসামরিক মানুষ নিহত হওয়ার ঘটনায় আন্তর্জাতিক মানবিক আইন লঙ্ঘনের আশঙ্কা এবং সম্ভাব্য যুদ্ধাপরাধের কথা জানিয়েছে। জুলাইয়ের এক প্রতিবেদনে সংস্থাটি বলেছিল, আবাসিক ভবন, বাস্তুচ্যুত মানুষের আশ্রয়স্থল এবং ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় হামলায় নারী ও শিশুসহ বহু মানুষ নিহত ও আহত হয়েছেন। বেসামরিক মানুষকে ইচ্ছাকৃতভাবে লক্ষ্যবস্তু করা আন্তর্জাতিক আইনের অধীনে যুদ্ধাপরাধ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে বলেও জাতিসংঘের মানবাধিকার দপ্তর উল্লেখ করেছে। 

তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ আইনি বিষয় রয়েছে। কাতারের প্রধানমন্ত্রী কোনো আদালতের রায় ঘোষণা করেননি; তিনি রাজনৈতিক ও নৈতিক অবস্থান থেকে গাজায় সংঘটিত কর্মকাণ্ডকে যুদ্ধাপরাধ বলেছেন। অন্যদিকে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত ২০২৪ সালের নভেম্বরে নেতানিয়াহু ও তৎকালীন ইসরায়েলি প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইয়োভ গ্যালান্টের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছিল। আদালত তখন তাঁদের বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির সিদ্ধান্ত নেয়। 

আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের সিদ্ধান্তে বলা হয়েছিল, তদন্তের আওতাধীন সময়ে গাজার বেসামরিক জনগোষ্ঠীকে খাদ্য, পানি, চিকিৎসা সরঞ্জাম, জ্বালানি ও বিদ্যুতের মতো জীবনধারণের প্রয়োজনীয় উপকরণ থেকে বঞ্চিত করার বিষয়ে নেতানিয়াহু ও গ্যালান্টের বিরুদ্ধে যুক্তিসংগত ভিত্তি পাওয়া গেছে। আদালত তাঁদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের পদ্ধতি হিসেবে অনাহারকে ব্যবহার এবং বেসামরিক জনগণের বিরুদ্ধে ইচ্ছাকৃত হামলার অভিযোগের বিষয়ে যুক্তিসংগত ভিত্তি রয়েছে বলে জানিয়েছিল। 

তবে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা কোনো চূড়ান্ত দণ্ডের সমান নয়। এটি আদালতের বিচারিক প্রক্রিয়ার একটি ধাপ। নেতানিয়াহু আদালতের অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছেন। ইসরায়েলও গাজায় গণহত্যা ও যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে এবং তাদের বক্তব্য হলো, সামরিক অভিযান হামাসের বিরুদ্ধে পরিচালিত হচ্ছে। ইসরায়েল আরও দাবি করে, হামাস বেসামরিক এলাকায় সামরিক অবকাঠামো ব্যবহার করে এবং সাধারণ মানুষকে মানবঢাল হিসেবে ব্যবহার করে। 

জাতিসংঘের তথ্য বলছে, যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পরও গাজায় পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি। সংস্থাটির সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে যুদ্ধবিরতিকে ভঙ্গুর হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে এবং বলা হয়েছে, ইসরায়েলি হামলা ও অন্যান্য সামরিক কর্মকাণ্ড অব্যাহত রয়েছে। একই সঙ্গে হামাস ও অন্যান্য ফিলিস্তিনি সশস্ত্র গোষ্ঠীর নিরস্ত্রীকরণও বাস্তবায়িত হয়নি। ফলে যুদ্ধবিরতি সত্ত্বেও রাজনৈতিক সমাধান ও স্থায়ী শান্তির পথ এখনো অনিশ্চিত। 

সাক্ষাৎকারে কাতারের প্রধানমন্ত্রী শুধু নেতানিয়াহুর সমালোচনা করেই থেমে থাকেননি। তিনি কাতারের মধ্যস্থতার ভূমিকা নিয়েও কথা বলেন। তাঁর দাবি, গাজায় যুদ্ধবিরতি প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টায় কাতার দীর্ঘদিন ধরে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করছে এবং এই ভূমিকা বারবার বাধার মুখে পড়েছে। তিনি বলেন, কূটনৈতিক যোগাযোগ অব্যাহত রাখাই সংকট সমাধানের একটি গুরুত্বপূর্ণ পথ। 

এর আগে ২৬ সেপ্টেম্বর দেওয়া আরেক সাক্ষাৎকারেও কাতারের প্রধানমন্ত্রী গাজা নিয়ে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রীকে কঠোরভাবে সমালোচনা করেছিলেন। সেখানে তিনি বলেছিলেন, গাজা শান্তি পরিকল্পনা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে নেতানিয়াহু ও তাঁর সরকার বড় বাধা তৈরি করছে। কাতারের প্রধানমন্ত্রীর সাম্প্রতিক বক্তব্যগুলো থেকে বোঝা যায়, গাজা ইস্যুতে দোহার কূটনৈতিক অবস্থান আরও প্রকাশ্য ও কঠোর হয়েছে। 

অন্যদিকে সাম্প্রতিক আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক পরিস্থিতিতেও গাজা ইস্যু নিয়ে তীব্র মতবিরোধ রয়েছে। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে নেতানিয়াহু গাজায় গণহত্যার অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছেন এবং এসব অভিযোগকে মিথ্যা বলে অভিহিত করেছেন। ফলে একদিকে কাতার ও অন্যান্য সমালোচক রাষ্ট্রগুলো ইসরায়েলি সামরিক কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক আইনের প্রশ্ন তুলছে, অন্যদিকে ইসরায়েল অভিযোগগুলো প্রত্যাখ্যান করে নিজেদের সামরিক অভিযানের পক্ষে যুক্তি দিচ্ছে। 

এই প্রেক্ষাপটে পিয়ার্স মরগানের প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে মূলত এর সরাসরিতার কারণে। কাতারের প্রধানমন্ত্রীও এড়িয়ে না গিয়ে স্পষ্ট ভাষায় যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ এবং এর জন্য দায়ীদের বিষয়ে নিজের অবস্থান জানিয়েছেন। তবে তাঁর বক্তব্যকে একটি রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক অবস্থান হিসেবে দেখা উচিত; নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের গ্রেপ্তারি পরোয়ানা থাকলেও তাঁর বিরুদ্ধে চূড়ান্ত অপরাধের রায় এখনো হয়নি। একই সঙ্গে গাজায় সংঘটিত নির্দিষ্ট ঘটনাগুলোর আইনি দায় নির্ধারণ আদালতের বিচারিক প্রক্রিয়ার বিষয়। 

সব মিলিয়ে, কাতারের প্রধানমন্ত্রীর এই বক্তব্য গাজা যুদ্ধ নিয়ে দোহার অবস্থানের আরও একটি স্পষ্ট প্রকাশ। বিশেষ করে যুদ্ধবিরতি চলমান থাকার পরও গাজায় হতাহতের ঘটনা অব্যাহত থাকা, মানবিক সংকট এবং আন্তর্জাতিক আইনের অভিযোগ সামনে রেখে কাতার আবারও কূটনৈতিক চাপ ও মধ্যস্থতার পথকে গুরুত্ব দিচ্ছে। সাক্ষাৎকারে তিনি একই সঙ্গে ৭ অক্টোবরের হামলার নিন্দা এবং গাজায় ইসরায়েলের সামরিক কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছেন। 


সিএসবি নিউজ-এর আরও খবর