সামরিক একাডেমিতে বেসামরিক শিক্ষকদের স্থায়ী নিয়োগ বন্ধ করলেন হেগসেথ

মার্কিন সামরিক একাডেমিতে নতুন বেসামরিক শিক্ষকদের স্থায়ী নিয়োগ বন্ধের নির্দেশ দিয়েছেন হেগসেথ, যুদ্ধ প্রস্তুতি ও সামরিক নেতৃত্বকেন্দ্রিক শিক্ষায় জোর দিয়েছেন তিনি।

সামরিক একাডেমিতে বেসামরিক শিক্ষকদের স্থায়ী নিয়োগ বন্ধ করলেন হেগসেথ

সামরিক একাডেমিতে বেসামরিক শিক্ষকদের স্থায়ী নিয়োগ বন্ধ করলেন হেগসেথ


মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তরের সামরিক একাডেমিগুলোতে বেসামরিক শিক্ষকদের নতুন করে স্থায়ী পদে নিয়োগ দেওয়ার প্রথা বন্ধ করার নির্দেশ দিয়েছেন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ। ২৯ সেপ্টেম্বর স্বাক্ষরিত এক স্মারকের মাধ্যমে তিনি সামরিক বাহিনীর তিন প্রধান একাডেমিতে ভবিষ্যতে বেসামরিক শিক্ষকদের স্থায়ী নিয়োগ না দেওয়ার নির্দেশ দেন। সিদ্ধান্তটির ঘোষণার বিষয়টি একাধিক নির্ভরযোগ্য মার্কিন সংবাদমাধ্যম যাচাই করেছে। 

তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বক্তব্যের সঙ্গে বাস্তব সিদ্ধান্তের একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে। হেগসেথ বর্তমানে স্থায়ী পদে থাকা বেসামরিক শিক্ষকদের পদ বাতিল করেননি। নতুন করে যেসব বেসামরিক শিক্ষককে স্থায়ী নিয়োগ দেওয়ার কথা ছিল, মূলত সেই নিয়োগপ্রক্রিয়াই বন্ধ করা হয়েছে। ফলে প্রচারিত বক্তব্যে যদি বলা হয় যে সব বেসামরিক অধ্যাপকের স্থায়ী পদ একসঙ্গে বাতিল করা হয়েছে, সেটি সঠিক নয়। 

হেগসেথের স্মারকে বলা হয়েছে, সামরিক একাডেমিগুলোর প্রধান উদ্দেশ্য হলো ভবিষ্যৎ সামরিক কর্মকর্তাদের এমনভাবে প্রস্তুত করা, যাতে তারা মার্কিন সামরিক বাহিনীর সদস্যদের নেতৃত্ব দিতে পারেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, শিক্ষা কার্যক্রমের কেন্দ্রবিন্দু হওয়া উচিত যুদ্ধ পরিচালনা, সামরিক প্রস্তুতি এবং ভবিষ্যৎ যুদ্ধক্ষেত্রের জন্য নেতৃত্ব তৈরির সক্ষমতা।

স্মারকে হেগসেথ আরও যুক্তি দিয়েছেন, দীর্ঘমেয়াদি স্থায়ী নিয়োগব্যবস্থা একাডেমিগুলোতে শিক্ষাগত স্থবিরতা তৈরি করতে পারে এবং পরিবর্তিত সামরিক প্রয়োজনের সঙ্গে দ্রুত খাপ খাওয়ানোর সক্ষমতা কমাতে পারে। তার মতে, স্থায়ী পদ পাওয়ার পর শিক্ষকদের একাংশের গবেষণার অগ্রাধিকার কখনো কখনো সামরিক বাহিনীর প্রয়োজনীয় শিক্ষার সঙ্গে দূরত্ব তৈরি করতে পারে। 

এই সিদ্ধান্তের ফলে যুক্তরাষ্ট্রের তিনটি প্রধান সামরিক একাডেমির বেসামরিক শিক্ষকদের নিয়োগ কাঠামোতে বড় পরিবর্তন আসতে পারে। এর মধ্যে রয়েছে নিউইয়র্কের ওয়েস্ট পয়েন্টে অবস্থিত মার্কিন সামরিক একাডেমি, মেরিল্যান্ডের আনাপোলিসে অবস্থিত নৌ একাডেমি এবং কলোরাডোর সামরিক বিমান একাডেমি।

বেসামরিক শিক্ষকরা দীর্ঘদিন ধরেই এসব প্রতিষ্ঠানের শিক্ষাব্যবস্থার অংশ। সামরিক কর্মকর্তারা সাধারণত নিজেদের পেশাগত ও যুদ্ধসংক্রান্ত অভিজ্ঞতা নিয়ে শ্রেণিকক্ষে আসেন। অন্যদিকে বেসামরিক শিক্ষকরা ইংরেজি, ইতিহাস, মানবিক বিদ্যা, বিজ্ঞান, প্রকৌশলসহ বিভিন্ন বিষয়ে দীর্ঘ একাডেমিক অভিজ্ঞতা নিয়ে শিক্ষা দেন। ফলে সামরিক প্রশিক্ষণের পাশাপাশি বিস্তৃত একাডেমিক শিক্ষায় তাদের ভূমিকা রয়েছে। 

বিশেষ করে নৌ একাডেমিতে বেসামরিক শিক্ষকদের উপস্থিতি উল্লেখযোগ্য। সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সেখানে প্রায় ৬০০ শিক্ষকের মধ্যে প্রায় অর্ধেক বেসামরিক। অর্থাৎ নতুন স্থায়ী নিয়োগ বন্ধের সিদ্ধান্তটি নৌ একাডেমির মতো প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক নিয়োগের কাঠামোয় তুলনামূলকভাবে বড় প্রভাব ফেলতে পারে। 

বেসামরিক শিক্ষকদের ভূমিকা সামরিক একাডেমিতে নতুন কোনো বিষয় নয়। ওয়েস্ট পয়েন্টে ১৯৯২ সাল থেকে বেসামরিক শিক্ষকদের উপস্থিতি উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো হয়েছিল। মার্কিন সেনাবাহিনীর নিজস্ব প্রকাশিত তথ্যেও ওই সময়কে একাডেমিটির শিক্ষাব্যবস্থায় বড় পরিবর্তনের সময় হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। 

নৌবাহিনীর সরকারি নথিতেও সামরিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বেসামরিক শিক্ষকদের জন্য আলাদা কাঠামো এবং বেতনব্যবস্থার উল্লেখ রয়েছে। অর্থাৎ বেসামরিক শিক্ষকরা সামরিক শিক্ষাব্যবস্থার বাইরে কোনো সাময়িক ব্যবস্থা ছিলেন না; তারা দীর্ঘদিনের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর অংশ। 

এ কারণে হেগসেথের নতুন সিদ্ধান্তকে শুধু শিক্ষক নিয়োগের প্রশাসনিক পরিবর্তন হিসেবে দেখা হচ্ছে না। এটি সামরিক একাডেমির শিক্ষাদর্শে পরিবর্তনের ইঙ্গিতও দিচ্ছে। তার প্রশাসন সামরিক শিক্ষার ক্ষেত্রে যুদ্ধ প্রস্তুতি, সামরিক সক্ষমতা এবং ভবিষ্যৎ যুদ্ধক্ষেত্রে কার্যকর নেতৃত্বকে আরও বেশি গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলছে।

তবে সিদ্ধান্তটির সমালোচনাও রয়েছে। একাডেমিক স্বাধীনতার পক্ষে থাকা ব্যক্তিরা মনে করেন, স্থায়ী নিয়োগের অন্যতম উদ্দেশ্য হলো শিক্ষককে রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক চাপের বাইরে থেকে শিক্ষা ও গবেষণা করার সুযোগ দেওয়া। তাদের মতে, স্থায়ী নিয়োগ না থাকলে শিক্ষকরা বিতর্কিত বা সংবেদনশীল বিষয় নিয়ে গবেষণা ও মতামত প্রকাশের ক্ষেত্রে বেশি সতর্ক হয়ে যেতে পারেন। 

অন্যদিকে হেগসেথের দপ্তরের যুক্তি হলো, সামরিক একাডেমি সাধারণ বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো প্রতিষ্ঠান নয়। এর প্রধান দায়িত্ব ভবিষ্যৎ সামরিক কর্মকর্তাদের তৈরি করা। তাই শিক্ষাব্যবস্থার কাঠামোও সামরিক বাহিনীর প্রয়োজনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হওয়া উচিত।

এর আগে সামরিক একাডেমির কর্মকর্তারাও বেসামরিক শিক্ষকদের স্থায়ী নিয়োগের গুরুত্ব নিয়ে মার্কিন কংগ্রেসের শুনানিতে বক্তব্য দিয়েছেন। ২০২৫ সালের এক শুনানিতে ওয়েস্ট পয়েন্ট, নৌ একাডেমি এবং বিমান একাডেমির শীর্ষ কর্মকর্তারা জানিয়েছিলেন, স্থায়ী নিয়োগ ব্যবস্থা যোগ্য বেসামরিক শিক্ষক আকর্ষণ ও ধরে রাখার ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখে। 

অর্থাৎ নতুন সিদ্ধান্তের ফলে একদিকে সামরিক বাহিনীর প্রয়োজন অনুযায়ী শিক্ষক নিয়োগে বেশি নমনীয়তা তৈরি হতে পারে। অন্যদিকে দীর্ঘমেয়াদি একাডেমিক অভিজ্ঞতা সম্পন্ন বেসামরিক শিক্ষকদের আকৃষ্ট করা এবং ধরে রাখার ক্ষেত্রে নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। কোন প্রভাব বাস্তবে কতটা হবে, তা নির্ভর করবে নতুন নিয়োগব্যবস্থা কীভাবে তৈরি ও বাস্তবায়ন করা হয় তার ওপর।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, নতুন ব্যবস্থায় বেসামরিক শিক্ষক নিয়োগ পুরোপুরি বন্ধ হচ্ছে না। পরিবর্তনটি মূলত স্থায়ী নিয়োগের ক্ষেত্রে। নতুন বেসামরিক শিক্ষক নেওয়া হতে পারে, কিন্তু তাদের চাকরির কাঠামো আগের মতো স্থায়ী পদভিত্তিক হবে না। নতুন ব্যবস্থার বিস্তারিত কাঠামো কী হবে, সে বিষয়ে প্রতিরক্ষা দপ্তর এখনো পূর্ণাঙ্গ নির্দেশনা প্রকাশ করেনি। 

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারিত দাবির আরেকটি অংশ নিয়েও সতর্ক থাকা প্রয়োজন। সেখানে বলা হয়েছে, হেগসেথ সামরিক একাডেমি থেকে তথাকথিত ‘একাডেমিক বাজে বিষয়’ পুরোপুরি দূর করে দিয়েছেন। বাস্তবে সরকারি সিদ্ধান্তে এমন ভাষা ব্যবহার করা হয়নি। হেগসেথ বেসামরিক একাডেমিক কাঠামো এবং স্থায়ী নিয়োগব্যবস্থাকে সামরিক শিক্ষার লক্ষ্য থেকে দূরে সরে যাওয়ার সম্ভাব্য কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তাই ‘সব একাডেমিক বিষয় উৎখাত’ বা ‘বেসামরিক শিক্ষা বন্ধ’—এ ধরনের দাবি সঠিক নয়। 

আর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারিত ‘যুদ্ধজয়ী বাহিনীকে কেন্দ্র করে সব নীতি বদলে দেওয়া হয়েছে’—এটি মূলত রাজনৈতিক সমর্থকদের ব্যাখ্যা। এটিকে সরাসরি সরকারি সিদ্ধান্তের নিরপেক্ষ বিবরণ হিসেবে উপস্থাপন করা ঠিক হবে না। সরকারি স্মারকে অবশ্য সামরিক একাডেমির যুদ্ধ প্রস্তুতি ও সামরিক নেতৃত্বের দায়িত্বকে সিদ্ধান্তটির কেন্দ্রীয় কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। 

সব মিলিয়ে যাচাই করা তথ্য হলো, পিট হেগসেথ ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ সামরিক একাডেমিগুলোতে নতুন বেসামরিক শিক্ষকদের স্থায়ী নিয়োগ বন্ধের নির্দেশ দিয়েছেন। বর্তমান স্থায়ী বেসামরিক শিক্ষকদের স্থায়ী মর্যাদা এই নির্দেশে বাতিল করা হয়নি। নতুন নিয়োগ কাঠামোতে নমনীয়তা বাড়ানো এবং সামরিক বাহিনীর যুদ্ধ প্রস্তুতির সঙ্গে শিক্ষাব্যবস্থাকে আরও ঘনিষ্ঠ করার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। সিদ্ধান্তটির প্রভাব ভবিষ্যতে শিক্ষক নিয়োগ, একাডেমিক স্বাধীনতা এবং সামরিক কর্মকর্তাদের শিক্ষার ধরন তিন ক্ষেত্রেই দেখা যেতে পারে। 


সিএসবি নিউজ-এর আরও খবর