ট্রাম্পের বিরুদ্ধে তদন্ত নিয়ে সিনেটে জ্যাক স্মিথের বিস্ফোরক জবানবন্দি, রিপাবলিকানদের তীব্র তোপ

ট্রাম্পের বিরুদ্ধে দুই তদন্তের সিদ্ধান্তে অটল থাকার কথা জানিয়ে সিনেটের শুনানিতে রিপাবলিকানদের কঠোর প্রশ্নের মুখে পড়েছেন কৌঁসুলি জ্যাক স্মিথ

ট্রাম্পের বিরুদ্ধে তদন্ত নিয়ে সিনেটে জ্যাক স্মিথের বিস্ফোরক জবানবন্দি, রিপাবলিকানদের তীব্র তোপ

ট্রাম্পের বিরুদ্ধে তদন্ত নিয়ে সিনেটে জ্যাক স্মিথের বিস্ফোরক জবানবন্দি, রিপাবলিকানদের তীব্র তোপ


সাবেক বিশেষ কৌঁসুলি জ্যাক স্মিথ মঙ্গলবার যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটের বিচারবিষয়ক কমিটির শুনানিতে হাজির হয়ে সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিরুদ্ধে পরিচালিত দুটি ফৌজদারি তদন্তের সিদ্ধান্তের পক্ষে দৃঢ় অবস্থান নিয়েছেন। একই সঙ্গে তিনি বলেছেন, তাঁকে বিচারের মুখোমুখি করার হুমকি তাঁকে নীরব করতে পারবে না। ২০২৬ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর ওয়াশিংটনে অনুষ্ঠিত এই শুনানিতে ট্রাম্পের বিরুদ্ধে তাঁর তদন্ত, কংগ্রেস সদস্যদের যোগাযোগের তথ্য সংগ্রহ এবং তদন্তে ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ নিয়ে দীর্ঘ সময় ধরে প্রশ্ন করেন রিপাবলিকান সদস্যরা। 

স্মিথ শুনানির শুরুতেই স্পষ্ট করে বলেন, বিশেষ কৌঁসুলি হিসেবে ট্রাম্পের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনার সিদ্ধান্তের পাশে তিনি এখনো রয়েছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, ওই সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় ট্রাম্পের রাজনৈতিক পরিচয়, রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড কিংবা ২০২৪ সালের নির্বাচনে তাঁর প্রার্থিতা কোনোভাবেই বিবেচনায় নেওয়া হয়নি। একই ধরনের তথ্য ও পরিস্থিতি যদি আবারও সামনে আসে এবং অভিযুক্ত ব্যক্তি রিপাবলিকান কিংবা ডেমোক্র্যাট যেই হোন না কেন, তিনি একইভাবে মামলা করার সিদ্ধান্ত নিতেন বলেও স্মিথ জানান। 

স্মিথের এই অবস্থানের বিপরীতে শুনানিতে রিপাবলিকান সদস্যরা তাঁর তদন্তের পদ্ধতি নিয়ে কঠোর সমালোচনা করেন। কমিটির চেয়ারম্যান চাক গ্রাসলি অভিযোগ করেন, স্মিথের নেতৃত্বে পরিচালিত তদন্ত ছিল রাজনৈতিকভাবে পক্ষপাতদুষ্ট এবং এর মাধ্যমে রিপাবলিকান রাজনীতিবিদ, সংগঠন ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিস্তৃত তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছিল। গ্রাসলির বক্তব্যে বিশেষভাবে উঠে আসে কংগ্রেস সদস্যদের ফোন যোগাযোগের তথ্য এবং রিপাবলিকান সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ব্যক্তির তথ্য সংগ্রহের বিষয়টি। 

তবে এসব অভিযোগের জবাবে স্মিথ বলেন, তাঁর দপ্তর কোনো রাজনৈতিক দলকে লক্ষ্য করে তদন্ত করেনি। তাঁর দাবি, তদন্তের সময় যেসব তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছিল, সেগুলো ট্রাম্প ও তাঁর সহযোগীদের ২০২০ সালের নির্বাচনের ফলাফল পাল্টানোর প্রচেষ্টার সঙ্গে সম্পর্কিত সম্ভাব্য প্রমাণ অনুসন্ধানের অংশ ছিল। বিশেষ করে ২০২১ সালের ৬ জানুয়ারি কংগ্রেসে নির্বাচনের ফল অনুমোদনের সময় ট্রাম্প ও তাঁর সহযোগীরা কয়েকজন আইনপ্রণেতার সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন কি না, সেটি তদন্তের জন্য ফোন যোগাযোগের তথ্য গুরুত্বপূর্ণ ছিল বলে তিনি ব্যাখ্যা করেন। 

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য যাচাইয়ের বিষয় রয়েছে। স্মিথের তদন্তকারীরা কয়েকজন রিপাবলিকান সিনেটরের ফোনের কথোপকথনের সময়, স্থায়িত্ব ও সংশ্লিষ্ট নম্বরের মতো যোগাযোগের হিসাব সংগ্রহ করেছিলেন বলে বিভিন্ন নথি ও শুনানিতে উঠে এসেছে। কিন্তু এসব তথ্যে ফোনে কী কথা হয়েছিল, তার বিষয়বস্তু ছিল না। স্মিথের বক্তব্য অনুযায়ী, ওই তথ্য তদন্তের জন্য প্রয়োজনীয় ছিল এবং তা সংগ্রহের উদ্দেশ্য ছিল ২০২১ সালের ৬ জানুয়ারির ঘটনাকে ঘিরে ট্রাম্প ও তাঁর সহযোগীদের কর্মকাণ্ডের ধারাবাহিকতা যাচাই করা। 

এর পাশাপাশি জাতীয় নথি সংরক্ষণ দপ্তর থেকে ৪৪ জন আইনপ্রণেতার বার্তার তথ্য সংগ্রহের বিষয়টিও রিপাবলিকানদের প্রশ্নের মুখে পড়ে। এই তথ্য নিয়ে স্মিথের তদন্তকারীদের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ক্ষমতা ব্যবহারের অভিযোগ তোলা হয়। স্মিথ অবশ্য দাবি করেন, তদন্তের প্রয়োজনেই এসব তথ্য চাওয়া হয়েছিল এবং কোনো ব্যক্তির রাজনৈতিক পরিচয়কে লক্ষ্যবস্তু বানানো তাঁর উদ্দেশ্য ছিল না। 

ট্রাম্পের বিরুদ্ধে স্মিথের নেতৃত্বে পরিচালিত দুটি তদন্ত ছিল আলাদা বিষয়ে। প্রথম তদন্তের কেন্দ্রবিন্দু ছিল ২০২০ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ট্রাম্পের পরাজয়ের পর ফলাফল পরিবর্তনের চেষ্টা এবং ক্ষমতা হস্তান্তরের সাংবিধানিক প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত করার অভিযোগ। দ্বিতীয় তদন্তে গুরুত্ব পায় হোয়াইট হাউস ছাড়ার পর ফ্লোরিডার মার-এ-লাগো এলাকায় গোপনীয় ও অতি সংবেদনশীল সরকারি নথি রাখার অভিযোগ। স্মিথের দপ্তর প্রথম মামলায় ট্রাম্পের বিরুদ্ধে চারটি এবং দ্বিতীয় মামলায় ৪০টি অভিযোগে অভিযোগপত্র দাখিল করেছিল। 

তবে কোনো মামলাই শেষ পর্যন্ত বিচারপর্বে পৌঁছায়নি। ২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ট্রাম্প জয়ী হয়ে আবার প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার পর স্মিথের দপ্তর দুটি মামলাই খারিজের উদ্যোগ নেয়। যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগের দীর্ঘদিনের অবস্থান অনুযায়ী, ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্টের বিরুদ্ধে ফেডারেল ফৌজদারি মামলা চালানো সাংবিধানিকভাবে গ্রহণযোগ্য নয়—এই অবস্থানের ভিত্তিতেই ট্রাম্পের বিরুদ্ধে চলমান দুটি মামলা শেষ করা হয়। 

এই মামলাগুলোর তদন্ত শেষ হওয়ার পরও বিষয়টি রাজনৈতিক ও আইনগত বিতর্ক থেকে বেরিয়ে যায়নি। ট্রাম্প দীর্ঘদিন ধরে স্মিথকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত তদন্ত পরিচালনার জন্য অভিযুক্ত করে আসছেন এবং তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। একই সঙ্গে কংগ্রেসের রিপাবলিকান সদস্যদের একটি অংশ স্মিথের তদন্ত পরিচালনার পদ্ধতি নিয়ে আলাদা অনুসন্ধান চালিয়ে যাচ্ছে। 

চলতি বছরের জুলাইয়ে প্রতিনিধি পরিষদের বিচারবিষয়ক কমিটির চেয়ারম্যান জিম জর্ডান স্মিথের বিরুদ্ধে বিচার বিভাগে ফৌজদারি ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য অভিযোগ পাঠান। তাঁর অভিযোগ ছিল, স্মিথ আগের কংগ্রেসীয় জিজ্ঞাসাবাদে কিছু বিষয়ে অসত্য বক্তব্য দিয়েছেন। তবে এখন পর্যন্ত স্মিথের বিরুদ্ধে কোনো ফৌজদারি অভিযোগ গঠন হয়নি। বিচার বিভাগ বিষয়টি পর্যালোচনা করছে বলে সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। অর্থাৎ, স্মিথের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক চাপ রয়েছে, কিন্তু তাঁকে ইতোমধ্যে অভিযুক্ত করা হয়েছে—এমন দাবি সঠিক নয়। 

শুনানিতে আরেকটি ঘটনা বিশেষভাবে আলোচনায় আসে। রিপাবলিকান সিনেটর এরিক স্মিট স্মিথকে ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে একটি বাস্কেটবল খেলা নিয়ে প্রশ্ন করেন। স্মিটের দাবি ছিল, স্মিথ আটলান্টার একটি পেশাদার বাস্কেটবল দলের খেলা দেখতে গিয়েছিলেন এবং এর মাধ্যমে জর্জিয়ার তৎকালীন কৌঁসুলি ফ্যানি উইলিসের সঙ্গে সম্ভাব্য যোগাযোগের ইঙ্গিত পাওয়া যায়। স্মিট একপর্যায়ে স্মিথের বিরুদ্ধে শপথ করে মিথ্যা বলার অভিযোগও তোলেন। 

পরে স্মিথ ব্যাখ্যা করেন, তিনি ওই দিনে বাস্কেটবল খেলা দেখতে গিয়েছিলেন ঠিকই, কিন্তু সেটি আটলান্টায় কোনো পেশাদার দলের খেলা ছিল না। তিনি মেরিল্যান্ডে আইওয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের নারী দলের একটি খেলা দেখতে গিয়েছিলেন। পরে বিষয়টি নিয়ে ডেমোক্র্যাট সিনেটর অ্যামি ক্লোবুচার বলেন, দুই দলের নামের মিল থেকে বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে। ফলে ওই ঘটনাকে কেন্দ্র করে স্মিথের বিরুদ্ধে মিথ্যা সাক্ষ্যের অভিযোগের ভিত্তি নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়। 

শুনানিতে স্মিথ তাঁর তদন্ত দলের সাবেক সদস্যদের নিয়েও কথা বলেন। তিনি অভিযোগ করেন, তাঁর তদন্তে কাজ করা অনেক কর্মকর্তা পরবর্তী সময়ে চাকরি হারিয়েছেন অথবা প্রশাসনিক চাপের মুখে পড়েছেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, এসব কর্মকর্তা আইন ও প্রমাণের ভিত্তিতে কাজ করেছিলেন। তবে এই অভিযোগের রাজনৈতিক ব্যাখ্যা নিয়ে দুই দলের মধ্যে তীব্র মতপার্থক্য রয়েছে। রিপাবলিকানরা মনে করেন, স্মিথের তদন্তে সরকারি ক্ষমতার অপব্যবহার হয়েছে; অন্যদিকে ডেমোক্র্যাটরা বলছেন, তদন্তের সমালোচনা করে ট্রাম্পের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের মূল বিষয়গুলো আড়াল করার চেষ্টা করা হচ্ছে। 

তদন্তের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো গোপনীয় সরকারি নথি সংক্রান্ত মামলা। স্মিথের তৈরি করা তদন্ত প্রতিবেদনের একটি অংশ প্রকাশ করা হলেও অন্য অংশ প্রকাশের ওপর আদালতের নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। ফলে মঙ্গলবারের শুনানিতেও স্মিথ তদন্তের সব তথ্য প্রকাশ করতে পারেননি। বিশেষ করে গোপন সাক্ষ্য, গ্র্যান্ড জুরি কার্যক্রম এবং আদালতের সুরক্ষিত নথি নিয়ে তিনি বিস্তারিত আলোচনা থেকে বিরত থাকতে বাধ্য হন। 

তথ্য যাচাই করে দেখা যাচ্ছে, মূল দাবিটি সঠিক যে জ্যাক স্মিথ ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ সিনেটের বিচারবিষয়ক কমিটির সামনে হাজির হয়ে ট্রাম্পের বিরুদ্ধে তাঁর দুই ফৌজদারি তদন্তের সিদ্ধান্তের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। এটিও সঠিক যে রিপাবলিকানদের একটি অংশ স্মিথের বিরুদ্ধে সম্ভাব্য ফৌজদারি ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি করছে এবং তাঁর বিরুদ্ধে একটি অভিযোগ বিচার বিভাগে পাঠানো হয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত স্মিথের বিরুদ্ধে কোনো ফৌজদারি অভিযোগ বা মামলা দায়ের হয়নি। একইভাবে, ট্রাম্পের বিরুদ্ধে স্মিথের দুটি মামলাও বর্তমানে বিচারাধীন নয়; ২০২৪ সালের নির্বাচনে ট্রাম্পের বিজয়ের পর দুটিই খারিজ হয়েছে। 

মঙ্গলবারের শুনানি তাই শুধু একজন সাবেক কৌঁসুলির জিজ্ঞাসাবাদ ছিল না; এটি যুক্তরাষ্ট্রের বিচারব্যবস্থা, প্রেসিডেন্টের বিরুদ্ধে ফৌজদারি তদন্ত, কংগ্রেসের তথ্য সংগ্রহ এবং রাজনৈতিক ক্ষমতার সঙ্গে আইন প্রয়োগকারী প্রতিষ্ঠানের সম্পর্ক নিয়ে চলমান বিতর্কের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পর্ব হয়ে উঠেছে। স্মিথ তাঁর সিদ্ধান্তের পক্ষে অটল থাকার কথা জানিয়েছেন, আর রিপাবলিকান সদস্যরা তাঁর তদন্তের পদ্ধতি ও ক্ষমতা ব্যবহারের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। ফলে এই বিতর্কের পরবর্তী ধাপ নির্ভর করবে বিচার বিভাগ ও কংগ্রেসের চলমান পর্যালোচনা এবং সংশ্লিষ্ট নথি ও আইনি প্রক্রিয়ার ওপর। 


সিএসবি নিউজ-এর আরও খবর