জ্যাক স্মিথের তথ্য সংগ্রহ নিয়ে সিএনএনকে আক্রমণ শন ডেভিসের, বাড়ছে সংবাদমাধ্যম বিতর্ক

জ্যাক স্মিথের তদন্তে সংবাদকর্মীদের যোগাযোগ উঠে আসার পর সিএনএন ও ফেডারেলিস্টের অভিযোগে যুক্তরাষ্ট্রে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়ে নতুন বিতর্ক তৈরি হয়েছে।

জ্যাক স্মিথের তথ্য সংগ্রহ নিয়ে সিএনএনকে আক্রমণ শন ডেভিসের, বাড়ছে সংবাদমাধ্যম বিতর্ক

জ্যাক স্মিথের তথ্য সংগ্রহ নিয়ে সিএনএনকে আক্রমণ শন ডেভিসের, বাড়ছে সংবাদমাধ্যম বিতর্ক


যুক্তরাষ্ট্রে সাবেক বিশেষ কৌঁসুলি জ্যাক স্মিথের নেতৃত্বাধীন তদন্তে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের সাংবাদিকদের সরকারি কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগের তথ্য উঠে আসার বিষয়টি ঘিরে নতুন করে তীব্র বিতর্ক শুরু হয়েছে। এই বিতর্কের মধ্যেই ফেডারেলিস্টের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা শন ডেভিস সিএনএন এবং এর প্রধান হোয়াইট হাউস সংবাদদাতা কাইটলিন কলিন্সকে কঠোর ভাষায় সমালোচনা করেছেন।

২৯ সেপ্টেম্বর সিনেটের বিচারবিষয়ক কমিটির শুনানিতে জ্যাক স্মিথকে প্রশ্ন করা হয় তাঁর নেতৃত্বাধীন তদন্তের পরিধি এবং সাংবাদিক, রাজনৈতিক নেতা ও অন্যান্য ব্যক্তির তথ্য সংগ্রহ নিয়ে। একই দিনে সিনেটের বিচারবিষয়ক কমিটির চেয়ারম্যান চাক গ্রাসলির কার্যালয় জানায়, স্মিথের নেতৃত্বাধীন তদন্তে অন্তত ১৮টি সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে সরকারি কর্মকর্তাদের যোগাযোগের তথ্য তদন্তকারীদের হাতে আসে। তালিকায় ছিল ফক্স নিউজ, সিএনএন, সিবিএস নিউজ, এনবিসি নিউজ, সিএনবিসি, ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল, ওয়াশিংটন পোস্ট, ব্লুমবার্গ, লস অ্যাঞ্জেলেস টাইমস, নিউইয়র্ক ম্যাগাজিন, রয়টার্স, অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস, ন্যাশনাল পাবলিক রেডিও, দ্য ফেডারেলিস্ট এবং আরও কয়েকটি সংবাদমাধ্যম। 

তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় পরিষ্কার করা প্রয়োজন। এসব সংবাদমাধ্যমকে আলাদাভাবে লক্ষ্য করে তাদের কার্যালয়ে তল্লাশি চালানো হয়েছিল, এমন তথ্য পাওয়া যায়নি। প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, স্মিথের তদন্তকারীরা ২০২৩ সালে জাতীয় আর্কাইভসে সংরক্ষিত সাবেক ট্রাম্প প্রশাসনের কর্মকর্তাদের ব্যবহৃত একাধিক ফোনের বার্তার তথ্য চেয়েছিলেন। সেই তথ্যের মধ্যেই সরকারি কর্মকর্তা ও সাংবাদিকদের পারস্পরিক যোগাযোগও উঠে আসে। ফলে পুরো ঘটনাকে সরাসরি সব সংবাদমাধ্যমের বিরুদ্ধে পরিকল্পিত গুপ্তচরবৃত্তি হিসেবে বর্ণনা করা একটি রাজনৈতিক ব্যাখ্যা; প্রমাণিত তথ্য হলো তদন্তকারীদের হাতে সাংবাদিকদের সঙ্গে সরকারি কর্মকর্তাদের যোগাযোগের রেকর্ড চলে এসেছিল। 

সিনেটের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ৫০ জন সাংবাদিকের সঙ্গে সরকারি কর্মকর্তাদের যোগাযোগের তথ্য ওই তদন্তের আওতায় এসেছিল। এর মধ্যে বিভিন্ন বড় সংবাদমাধ্যমের সাংবাদিক ছিলেন। ফেডারেলিস্টের প্রধান নির্বাহী শন ডেভিস এবং ওই প্রতিষ্ঠানের সম্পাদক মলি হেমিংওয়ের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট যোগাযোগও তদন্তের তথ্যভাণ্ডারে ছিল বলে প্রকাশিত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। 

এই বিষয়টিকেই সামনে রেখে শন ডেভিস সিএনএনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তাঁর বক্তব্যের সারকথা হলো, ফেডারেলিস্ট যখন বাইডেন প্রশাসনের সময় সরকারি চাপ ও বিজ্ঞাপন বন্ধ করে দেওয়ার প্রচেষ্টার অভিযোগ তুলেছিল, তখন সিএনএন তাদের পক্ষে প্রকাশ্যে অবস্থান নেয়নি। ডেভিস দাবি করেন, তাঁদের প্রতিষ্ঠানকে আর্থিকভাবে দুর্বল করে ব্যবসা থেকে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা হয়েছিল।

এই দাবির পেছনে অবশ্য একটি বাস্তব আইনি লড়াই রয়েছে। ফেডারেলিস্ট ও ডেইলি ওয়্যার টেক্সাস অঙ্গরাজ্যের সঙ্গে মিলে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের বৈশ্বিক সম্পৃক্ততা কেন্দ্রের বিরুদ্ধে মামলা করেছিল। মামলায় অভিযোগ করা হয়, সরকারি অর্থায়নে পরিচালিত কিছু প্রকল্প ও তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে রক্ষণশীল সংবাদমাধ্যমের বিরুদ্ধে বিজ্ঞাপন ও অনলাইন বিতরণে চাপ সৃষ্টি করা হয়েছিল। ২০২৪ সালের মে মাসে একটি ফেডারেল আদালত সরকারের মামলা খারিজের আবেদন প্রায় পুরোপুরি প্রত্যাখ্যান করে এবং মামলাটি এগিয়ে নেওয়ার সুযোগ দেয়। 

আদালতের নথিতে বলা হয়েছিল, ফেডারেলিস্ট ও ডেইলি ওয়্যার অভিযোগ করেছে যে পররাষ্ট্র দপ্তরের একটি দপ্তর এমন প্রযুক্তি ও প্রতিষ্ঠানের অর্থায়ন বা সহায়তা করেছে, যেগুলো অনলাইনে নির্দিষ্ট সংবাদমাধ্যমের বক্তব্যের বিস্তার কমানো, বিজ্ঞাপন আয় কমানো কিংবা তাদের ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করার কাজে ব্যবহৃত হতে পারে। তবে আদালত তখন অভিযোগগুলোকে চূড়ান্তভাবে সত্য ঘোষণা করেনি। আদালত মূলত বলেছিল, বাদীপক্ষের মামলা করার যথেষ্ট ভিত্তি রয়েছে এবং অভিযোগগুলো বিচারিকভাবে পরীক্ষা করার মতো। 

পরবর্তীতে বৈশ্বিক সম্পৃক্ততা কেন্দ্রটি বন্ধ হয়ে যায়। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের ওই কেন্দ্র বন্ধ হওয়ার খবর প্রকাশিত হয়। ২০২৬ সালের এপ্রিলে মার্কিন বিচার বিভাগ জানায়, বাইডেন আমলের ওই কেন্দ্রকে ঘিরে দায়ের করা মামলার একটি সমঝোতা হয়েছে। বিচার বিভাগের বিবৃতিতে বলা হয়, মামলাটিতে অভিযোগ ছিল যে কেন্দ্রটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমে অনলাইনে আমেরিকানদের বক্তব্য কম প্রচার, অর্থায়ন বন্ধ বা সীমিত করার মতো কার্যক্রমে সহায়তা করেছিল। 

তবে শন ডেভিসের বক্তব্যের আরেকটি অংশ হলো, সিএনএন এখন হোয়াইট হাউসে প্রবেশাধিকার ও প্রেস পুলে নিজেদের অবস্থান নিয়ে ব্যাপক প্রতিবাদ করছে, অথচ ফেডারেলিস্টের মতো রক্ষণশীল সংবাদমাধ্যম সরকারি চাপের অভিযোগ করার সময় একই ধরনের প্রতিক্রিয়া পায়নি।

এখানেও সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ গুরুত্বপূর্ণ। সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে ট্রাম্প প্রশাসন সিএনএন, এমএস নাও এবং পলিটিকোকে হোয়াইট হাউসের নিয়মিত সংবাদ কাভারেজ থেকে বাদ দেওয়ার পদক্ষেপ নেয়। এরপর একটি ফেডারেল আদালত ওই সংবাদমাধ্যমগুলোর প্রবেশাধিকার পুনর্বহালের নির্দেশ দেয়। আদালতের আদেশের পরও হোয়াইট হাউসের সঙ্গে সংবাদমাধ্যমগুলোর বিরোধ পুরোপুরি শেষ হয়নি। 

সিএনএনের পক্ষ থেকে কাইটলিন কলিন্স বিষয়টি ব্যাখ্যা করে বলেছেন, প্রেস পুল শুধু সিএনএনের জন্য নয়। নির্দিষ্ট দিনে একটি সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদক ও ক্যামেরা দল প্রেস পুলের হয়ে কাজ করে এবং তাদের ধারণ করা ছবি ও বক্তব্য অন্যান্য বড় সংবাদমাধ্যমের কাছেও সরবরাহ করা হয়। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, এই ব্যবস্থার কারণে সিএনএনকে বাদ দেওয়া হলে শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের নয়, পুরো টেলিভিশন সংবাদ কাভারেজ ব্যবস্থার ওপর প্রভাব পড়ে। 

এর মধ্যেই ২৫ সেপ্টেম্বর হোয়াইট হাউস সিএনএনকে প্রেস পুলের মাধ্যমে ট্রাম্পের সঙ্গে টেনেসি সফরে যাওয়ার সুযোগ দেয়নি। এর ফলে সিএনএনের নির্ধারিত প্রতিবেদক প্রেসিডেন্টের সঙ্গে বিমানবাহিনীর বিশেষ বিমানে ভ্রমণ করতে পারেননি। অন্য সংবাদমাধ্যমগুলোর সাংবাদিকেরা একযোগে বিকল্প ব্যবস্থা না নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়, ফলে বিষয়টি আরও বড় বিতর্কে পরিণত হয়। 

সিএনএনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, সংবাদমাধ্যমকে তাদের প্রকাশিত প্রতিবেদনের কারণে সরকারি প্রবেশাধিকার থেকে বঞ্চিত করা হলে সেটি সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার জন্য উদ্বেগের বিষয়। অন্যদিকে ট্রাম্প প্রশাসনের বক্তব্য হলো, এটি সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা বন্ধ করা নয় বরং হোয়াইট হাউসের বিশেষ প্রবেশাধিকার ও সংবাদ কাভারেজ ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশাসনের অধিকার প্রয়োগ।

এই দ্বন্দ্বের সঙ্গে জ্যাক স্মিথের তদন্তের বিষয়টি যুক্ত হওয়ায় বিতর্ক আরও রাজনৈতিক রূপ পেয়েছে। কারণ স্মিথের তদন্তে শুধু রক্ষণশীল সংবাদমাধ্যম নয়, সিএনএন, ফক্স নিউজ, সিবিএস, এনবিসি, রয়টার্স, অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস এবং ওয়াশিংটন পোস্টসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক অবস্থানের সংবাদমাধ্যমের সাংবাদিকদের যোগাযোগও উঠে এসেছে। ফলে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী এটি কেবল একটি মতাদর্শের সংবাদমাধ্যমকে প্রভাবিত করার ঘটনা ছিল—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না। 

জ্যাক স্মিথ ২৯ সেপ্টেম্বর সিনেটের শুনানিতে নিজের তদন্তের বৈধতা এবং উদ্দেশ্য নিয়ে রিপাবলিকান আইনপ্রণেতাদের প্রশ্নের জবাব দেন। তিনি রাজনৈতিক পক্ষপাতের অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে বলেন, তাঁর নেতৃত্বাধীন তদন্ত আইন ও বিচার বিভাগের নীতিমালা অনুসরণ করেই পরিচালিত হয়েছিল। ডেমোক্র্যাট সিনেটররাও স্মিথের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত তদন্তের অভিযোগের বিরোধিতা করেন। 

অন্যদিকে রিপাবলিকান আইনপ্রণেতাদের অভিযোগ হলো, স্মিথের তদন্তের পরিধি প্রয়োজনের তুলনায় অনেক বেশি বিস্তৃত হয়েছিল। তাঁদের দাবি, সাংবাদিকদের যোগাযোগ ছাড়াও কংগ্রেস সদস্য, রাজনৈতিক সংগঠন এবং ট্রাম্প-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ফোন ও আর্থিক তথ্য তদন্তের আওতায় আনা হয়েছিল। স্মিথ এসব অভিযোগের পেছনে তদন্তের প্রয়োজনীয়তা থাকার কথা তুলে ধরেছেন। 

ফলে শন ডেভিসের সিএনএনবিরোধী মন্তব্যকে পুরো ঘটনার একটি রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া হিসেবে দেখা যায়। তাঁর বক্তব্যে সিএনএনকে দলীয় স্বার্থে কাজ করার অভিযোগ করা হয়েছে, কিন্তু এ অভিযোগের পক্ষে নিরপেক্ষভাবে প্রতিষ্ঠিত কোনো সরকারি সিদ্ধান্ত বা আদালতের রায় পাওয়া যায়নি। একইভাবে সিএনএনের হোয়াইট হাউস কাভারেজকে কেবল ব্যক্তিগত ক্ষোভ বা প্রবেশাধিকারের জন্য করা প্রচেষ্টা হিসেবে চূড়ান্তভাবে বর্ণনা করার মতো নিরপেক্ষ প্রমাণও নেই।

তথ্য যাচাই করে সবচেয়ে স্পষ্ট চিত্র হলো, যুক্তরাষ্ট্রে বর্তমানে সংবাদমাধ্যম ও সরকারের সম্পর্ককে ঘিরে দুটি আলাদা কিন্তু পরস্পরকে প্রভাবিত করা বিতর্ক চলছে। একদিকে জ্যাক স্মিথের পুরোনো তদন্তে সাংবাদিকদের যোগাযোগের তথ্য উঠে আসার বিষয়টি নিয়ে সরকারি ক্ষমতার সীমা ও সাংবাদিকদের গোপনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। অন্যদিকে ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে সিএনএনসহ কয়েকটি সংবাদমাধ্যমের হোয়াইট হাউস প্রবেশাধিকার নিয়ে আদালত পর্যন্ত গড়ানো বিরোধ চলছে।

এই দুই ঘটনাকে এক করে কোনো সংবাদমাধ্যমকে পক্ষপাতদুষ্ট বা কোনো সরকারি কর্মকর্তাকে অপরাধী হিসেবে চূড়ান্তভাবে ঘোষণা করার আগে সংশ্লিষ্ট আদালতের নথি, সরকারি নথি এবং উভয় পক্ষের বক্তব্য আলাদাভাবে দেখা প্রয়োজন। বর্তমানে নিশ্চিত তথ্য হলো, সাংবাদিকদের যোগাযোগের তথ্য স্মিথের তদন্তের আওতায় এসেছিল এবং একই সময়ে সিএনএন হোয়াইট হাউসের প্রবেশাধিকার নিয়ে প্রশাসনের সঙ্গে আইনি লড়াই করছে। এই দুই ঘটনাই যুক্তরাষ্ট্রে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা, সরকারি ক্ষমতার সীমা এবং সাংবাদিকদের তথ্যের গোপনীয়তা নিয়ে নতুন করে জাতীয় বিতর্ক সৃষ্টি করেছে। 


সিএসবি নিউজ-এর আরও খবর