নেতানিয়াহুর নির্বাচন বাঁচাতে কি ইরানের বিরুদ্ধে ফের যুদ্ধ শুরু করবেন ট্রাম্প
ইসরায়েলের নির্বাচন ঘিরে নিরাপত্তা সতর্কতার মধ্যে ইরান নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান ও নেতানিয়াহুর বার্তা নতুন উদ্বেগ ও জল্পনা তৈরি করেছে মধ্যপ্রাচ্যে।
নেতানিয়াহুর নির্বাচন বাঁচাতে কি ইরানের বিরুদ্ধে ফের যুদ্ধ শুরু করবেন ট্রাম্প
ইসরায়েলের আসন্ন নির্বাচনকে ঘিরে দেশটির নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু মঙ্গলবার তেল নোফ বিমানঘাঁটি পরিদর্শনের সময় দাবি করেছেন, নির্বাচনের আগে ইসরায়েলের শত্রুরা হামলার চেষ্টা করতে পারে। তবে তিনি সম্ভাব্য হামলাকারী, হামলার ধরন, সময় বা গোয়েন্দা তথ্যের বিস্তারিত প্রকাশ করেননি।
এই বক্তব্যের পরই বিরোধী নেতা ইয়াইর লাপিদ জরুরি নিরাপত্তা ব্রিফিং দাবি করেন। প্রথমে প্রধানমন্ত্রীর সামরিক সচিবের মাধ্যমে লাপিদকে তথ্য দেওয়ার কথা জানানো হলেও পরে নেতানিয়াহু ও লাপিদের সরাসরি বৈঠকের ব্যবস্থা করা হয়। লাপিদ একই সঙ্গে নিরাপত্তা সংস্থার প্রধান এবং কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিটির প্রধানকে নিয়ে আলোচনার দাবি জানান।
তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও কিছু প্রতিবেদনে যে দাবি ছড়িয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নাকি নেতানিয়াহুর নির্বাচন বাঁচাতে ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ আবার শুরু করতে যাচ্ছেন, তার পক্ষে এখন পর্যন্ত নির্ভরযোগ্য সরাসরি প্রমাণ পাওয়া যায়নি। বরং সাম্প্রতিক নির্ভরযোগ্য প্রতিবেদনগুলোতে দেখা যাচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান সংঘাত কমানোর জন্য কূটনৈতিক যোগাযোগও চলছে।
রয়টার্সের ২৯ সেপ্টেম্বরের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কাতার যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে মধ্যস্থতার চেষ্টা করছে। দুই পক্ষের মধ্যে বার্তা আদান-প্রদান অব্যাহত রয়েছে। কাতারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মাজেদ আল-আনসারি বলেছেন, সংঘাতের ক্ষতি থেকে সবাইকে রক্ষা করতে একটি সমঝোতার পথ খোঁজা হচ্ছে। একই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের যুদ্ধ তখন অষ্টম মাসে প্রবেশ করেছে।
অর্থাৎ এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্যগত সংশোধন জরুরি। বর্তমান পরিস্থিতিতে ইরান যুদ্ধ নতুন করে শুরু করার প্রশ্নের চেয়ে চলমান যুদ্ধ কীভাবে থামানো যায়, সেটিই কূটনৈতিক আলোচনার বড় বিষয়। ট্রাম্পও ২৯ সেপ্টেম্বর সাংবাদিকদের বলেছেন, ইরান শেষ পর্যন্ত ছাড় দেবে বলে তিনি মনে করেন এবং যুদ্ধ শিগগির শেষ হওয়ার কথা বলেছেন। একই সময়ে তিনি ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন করতে দেওয়া হবে না বলে আবারও অবস্থান জানিয়েছেন।
ইরানের পক্ষ থেকেও আলোচনার ইঙ্গিত এসেছে। জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনের সময় তেহরান এমন একটি প্রস্তাব দিয়েছিল, যার মাধ্যমে সাত দিনের মধ্যে হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়া এবং যুদ্ধবিরতির দিকে যাওয়ার ব্যবস্থা করা যেতে পারে। ট্রাম্প সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করলেও ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি বলেছেন, মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের আনুষ্ঠানিক অবস্থানের অপেক্ষায় তারা রয়েছে।
তবে সংঘাত শেষ হয়ে গেছে, এমন পরিস্থিতিও তৈরি হয়নি। যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর অর্থনৈতিক চাপ অব্যাহত রেখেছে এবং ২৯ সেপ্টেম্বর আরও কয়েকজন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে। অন্যদিকে ইরানও যুক্তরাষ্ট্র ও তার আঞ্চলিক মিত্রদের বিরুদ্ধে সামরিক প্রতিক্রিয়ার সক্ষমতা ধরে রাখার কথা জানিয়ে যাচ্ছে। ফলে কূটনৈতিক যোগাযোগ চললেও সামরিক উত্তেজনা পুরোপুরি শেষ হয়নি।
এদিকে ইসরায়েলের নির্বাচনের সময়সূচি বিষয়টিকে আরও স্পর্শকাতর করে তুলেছে। আগামী ২৭ অক্টোবর ইসরায়েলে সাধারণ নির্বাচন হওয়ার কথা। রয়টার্সের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, নির্বাচনের কয়েক সপ্তাহ আগে নেতানিয়াহু তার রাজনৈতিক প্রচারে জাতীয় নিরাপত্তা এবং আঞ্চলিক হুমকিকে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে সামনে আনছেন। মঙ্গলবার বিমানঘাঁটিতে দেওয়া বক্তব্যেও তিনি নির্বাচনের আগে সম্ভাব্য হামলার আশঙ্কার কথা বলেছেন।
নেতানিয়াহুর বক্তব্যের পর ইসরায়েলের বিরোধী রাজনীতিতে প্রশ্ন উঠেছে, এই নিরাপত্তা সতর্কতা কতটা নির্দিষ্ট গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে এবং কতটা সাধারণ সতর্কতা। তবে এখানে একটি ভারসাম্যপূর্ণ তথ্যও গুরুত্বপূর্ণ। ইসরায়েলি সামরিক কর্মকর্তারা মন্ত্রীদের জানিয়েছেন যে একটি হুমকি শনাক্ত হয়েছে, কিন্তু সেই হুমকির অর্থ এই নয় যে পরদিনই যুদ্ধ শুরু হতে যাচ্ছে। তাদের বক্তব্য অনুযায়ী প্রস্তুত থাকা জরুরি, কিন্তু তাৎক্ষণিক যুদ্ধের নিশ্চিত ইঙ্গিত হিসেবে বিষয়টিকে দেখা উচিত নয়।
একই সময়ে একটি প্রতিবেদনে নাম প্রকাশ না করা মার্কিন গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, ওয়াশিংটন ইসরায়েলের এই মূল্যায়নের সঙ্গে একমত যে ইরান বা ইরানপন্থী কোনো গোষ্ঠী নির্বাচনের আগে ইসরায়েলে হামলার চেষ্টা করতে পারে। কিন্তু এই তথ্যও সরাসরি প্রমাণ করে না যে ট্রাম্প নেতানিয়াহুর নির্বাচনী স্বার্থে ইরানের বিরুদ্ধে নতুন করে যুদ্ধ শুরু করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। এটি মূলত সম্ভাব্য হামলার বিষয়ে একটি গোয়েন্দা মূল্যায়নের কথা বলে।
আরেকটি বিষয়ও আলোচনায় এসেছে। সেপ্টেম্বরের শুরুতে রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে চারজন মার্কিন কর্মকর্তার বক্তব্যের ভিত্তিতে বলা হয়েছিল, ট্রাম্প প্রশাসনের কিছু শীর্ষ কর্মকর্তা নভেম্বরের মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে ইরান সংঘাতকে তুলনামূলকভাবে নিয়ন্ত্রিত রাখতে চাইছিলেন। তাদের আলোচনায় নভেম্বরের পর সামরিক পদক্ষেপ বাড়ানোর সম্ভাবনার কথা উঠেছিল, তবে সেটিও কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ছিল না। প্রতিবেদনে স্পষ্ট বলা হয়েছিল, পূর্ণমাত্রার যুদ্ধ আবার শুরু হওয়া নিশ্চিত নয়।
এই তথ্যটি বর্তমান দাবির সঙ্গে সরাসরি তুলনা করলে দেখা যায়, ইরান যুদ্ধের ভবিষ্যৎ নিয়ে ওয়াশিংটনে বিভিন্ন সামরিক ও রাজনৈতিক বিকল্প নিয়ে আলোচনা হয়েছে। কিন্তু সেখান থেকে এই সিদ্ধান্তে যাওয়া যায় না যে ট্রাম্প নেতানিয়াহুর নির্বাচন রক্ষার উদ্দেশ্যে যুদ্ধ শুরু করবেন। বরং সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে কূটনৈতিক যোগাযোগ, অর্থনৈতিক চাপ এবং সামরিক প্রস্তুতি—তিনটি পথই একসঙ্গে চলতে দেখা যাচ্ছে।
নেতানিয়াহুর জন্য পরিস্থিতি রাজনৈতিকভাবেও গুরুত্বপূর্ণ। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামলার পর তার সরকারের নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা নিয়ে ইসরায়েলে দীর্ঘদিন ধরে বিতর্ক রয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে এমন প্রতিবেদনও প্রকাশিত হয়েছে যে হামলার আগে বিদেশি নেতাদের কাছ থেকে সতর্কবার্তা পাওয়া গিয়েছিল কি না এবং সেগুলো ইসরায়েলি নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে জানানো হয়েছিল কি না, তা নিয়ে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে। নেতানিয়াহু এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
ফলে নির্বাচনের ঠিক আগে সম্ভাব্য নিরাপত্তা হুমকির ঘোষণা রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত সংবেদনশীল হয়ে উঠেছে। বিরোধী পক্ষ চাইছে, সরকার যেন হুমকির প্রকৃতি এবং নির্বাচনী প্রক্রিয়া সুরক্ষিত রাখার ব্যবস্থা সম্পর্কে পরিষ্কার তথ্য দেয়। অন্যদিকে ইসরায়েলি নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের বক্তব্য হলো, হুমকি থাকলে প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে, তবে সেটিকে তাৎক্ষণিক যুদ্ধের পূর্বাভাস হিসেবে ব্যাখ্যা করা ঠিক হবে না।
সব মিলিয়ে যাচাই করা তথ্য বলছে, ইরানকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মধ্যে সামরিক উত্তেজনা এখনও গুরুতর। ইসরায়েল নির্বাচনের আগে সম্ভাব্য হামলার আশঙ্কা প্রকাশ করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা মহলেও ইরান বা তার সহযোগীদের সম্ভাব্য হামলার আশঙ্কার কথা এসেছে বলে একটি প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। একই সঙ্গে কাতারের মধ্যস্থতায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে আলোচনা চলছে।
কিন্তু এখন পর্যন্ত এমন নির্ভরযোগ্য প্রমাণ নেই যে ডোনাল্ড ট্রাম্প ইতিমধ্যে নেতানিয়াহুর নির্বাচন বাঁচাতে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ পুনরায় শুরু করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। বরং বর্তমান তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধ চলমান থাকা অবস্থায় একদিকে সামরিক চাপ ও নিষেধাজ্ঞা অব্যাহত রয়েছে, অন্যদিকে সংঘাত থামাতে মধ্যস্থতা ও আলোচনাও চলছে। তাই প্রচারিত দাবিটিকে নিশ্চিত খবর হিসেবে নয়, বরং সাম্প্রতিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি, ইসরায়েলি নির্বাচন এবং যুক্তরাষ্ট্রের ইরান নীতিকে ঘিরে তৈরি হওয়া একটি রাজনৈতিক দাবি ও জল্পনা হিসেবে উপস্থাপন করাই তথ্যগতভাবে বেশি নির্ভুল।