সোরোস পরিবারের সঙ্গে ১৪ বছরের সম্পর্ক, নির্বাচনী তহবিল ঘিরে এল-সায়েদকে নিয়ে নতুন প্রশ্ন

২০১২ সালের ফেলোশিপ থেকে ২০২৬ সালের তহবিল সংগ্রহ, সোরোস পরিবারের সঙ্গে আবদুল এল-সায়েদের সম্পর্ক ঘিরে নতুন করে শুরু হয়েছে রাজনৈতিক আলোচনা।

সোরোস পরিবারের সঙ্গে ১৪ বছরের সম্পর্ক, নির্বাচনী তহবিল ঘিরে এল-সায়েদকে নিয়ে নতুন প্রশ্ন

সোরোস পরিবারের সঙ্গে ১৪ বছরের সম্পর্ক, নির্বাচনী তহবিল ঘিরে এল-সায়েদকে নিয়ে নতুন প্রশ্ন


ক্যালিফোর্নিয়ায় অনুষ্ঠিত একটি তহবিল সংগ্রহের অনুষ্ঠানে মিশিগানের ডেমোক্র্যাটিক সিনেট প্রার্থী আবদুল এল-সায়েদের সঙ্গে সোরোস পরিবারের দীর্ঘদিনের সম্পর্কের নতুন তথ্য সামনে এসেছে। অনুষ্ঠানটিতে জেফ্রি সোরোস নিজেই এল-সায়েদের সঙ্গে ২০১২ সাল থেকে পরিচয়ের কথা তুলে ধরেছেন। তবে এ নিয়ে প্রকাশিত বিভিন্ন দাবির মধ্যে কোনটি নিশ্চিতভাবে প্রমাণিত এবং কোনটি রাজনৈতিক বক্তব্য, তা আলাদা করে দেখা জরুরি। 

২৮ সেপ্টেম্বর ক্যালিফোর্নিয়ার পশ্চিম হলিউডে জেফ্রি সোরোসের বাড়িতে এল-সায়েদের জন্য তহবিল সংগ্রহের অনুষ্ঠান হয়। এর আগে প্রকাশিত আমন্ত্রণপত্র অনুযায়ী, অনুষ্ঠানের আয়োজকদের মধ্যে ছিলেন জেফ্রি সোরোস ও তার স্ত্রী ক্যাথারিন সোরোস। অনুষ্ঠানে সাবেক ওবামা প্রশাসনের কয়েকজন উপদেষ্টা এবং হলিউডের বিনোদন অঙ্গনের পরিচিত ব্যক্তিদেরও থাকার কথা ছিল। আমন্ত্রণপত্রে একজন দাতার সর্বোচ্চ অনুদানের পরিমাণ ৫৭ হাজার ৮০০ ডলার পর্যন্ত উল্লেখ করা হয়েছিল। তবে এই সীমা উল্লেখ থাকার অর্থ এই নয় যে প্রত্যেকে ওই পরিমাণ অর্থ দিয়েছেন বা অনুষ্ঠান থেকে ঠিক কত অর্থ সংগ্রহ হয়েছে। 

পরদিন প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, অনুষ্ঠানে জেফ্রি সোরোস উপস্থিত অতিথিদের সামনে এল-সায়েদের সঙ্গে তার সম্পর্কের কথা জানান। তিনি বলেন, ২০১২ সালে এল-সায়েদের সঙ্গে তার পরিচয় হয় এবং তিনি তার বাবা-মায়ের নামে প্রতিষ্ঠিত ফেলোশিপের জন্য এল-সায়েদের সাক্ষাৎকার নেওয়া ব্যক্তিদের একজন ছিলেন। এই বক্তব্যটি অনুষ্ঠানের গোপনে ধারণ করা ভিডিও থেকে পাওয়া বলে প্রতিবেদনটিতে উল্লেখ করা হয়েছে। অনুষ্ঠানের আয়োজকেরা অতিথিদের ভিডিও ধারণ না করার অনুরোধ করেছিলেন। 

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য যাচাই করা যায় সরাসরি ফেলোশিপের নিজস্ব নথি থেকে। পল ও ডেইজি সোরোস ফেলোশিপের সরকারি ওয়েবসাইটে আবদুল এল-সায়েদের নাম ২০১২ সালের ফেলো হিসেবে রয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, তিনি কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে মহামারিবিদ্যায় পিএইচডি এবং চিকিৎসাবিদ্যায় এমডি করার জন্য এই ফেলোশিপ পেয়েছিলেন। একই নথিতে তাকে মিশরীয় অভিবাসীদের সন্তান হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। 

ফেলোশিপটির আর্থিক সহায়তার বিষয়টিও যাচাইযোগ্য। প্রতিষ্ঠানের বর্তমান তথ্য অনুযায়ী, একজন নির্বাচিত ফেলো দুই বছরে সর্বোচ্চ ৯০ হাজার ডলার পর্যন্ত সহায়তা পেতে পারেন। এর মধ্যে সর্বোচ্চ ৫০ হাজার ডলার ভাতা এবং ৪০ হাজার ডলার পর্যন্ত শিক্ষাব্যয় সহায়তা রয়েছে। শিক্ষাব্যয়ের অর্থ সরাসরি বিশ্ববিদ্যালয়ে দেওয়া হয়। 

তবে এখানে একটি পার্থক্য গুরুত্বপূর্ণ। জেফ্রি সোরোস অনুষ্ঠানে নিজের পরিবারের ফেলোশিপের সঙ্গে এল-সায়েদের সম্পর্ক এবং ২০১২ সালের সাক্ষাৎকারের কথা বলেছেন। কিন্তু প্রকাশ্য তথ্য থেকে এমন দাবি নিশ্চিতভাবে করা যায় না যে জেফ্রি সোরোস ব্যক্তিগতভাবে এল-সায়েদের শিক্ষার খরচ নিজের অর্থে পরিশোধ করেছিলেন। বরং যাচাইযোগ্য তথ্য হলো, এল-সায়েদ পল ও ডেইজি সোরোস ফেলোশিপের মাধ্যমে আর্থিক সহায়তা পেয়েছিলেন এবং জেফ্রি সোরোস সেই নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় সাক্ষাৎকার গ্রহণকারীদের একজন ছিলেন বলে তিনি নিজেই অনুষ্ঠানে বলেছেন। ফলে ব্যক্তিগতভাবে শিক্ষার খরচ বহনের দাবি করলে সেটিকে আরও নির্দিষ্ট প্রমাণ দিয়ে সমর্থন করতে হবে। 

এই সম্পর্কটি এখন রাজনৈতিকভাবে আলোচনায় আসার প্রধান কারণ এল-সায়েদের নির্বাচনী প্রচারের অর্থসংক্রান্ত অবস্থান। তিনি দীর্ঘদিন ধরে রাজনীতিতে বড় অর্থের প্রভাবের সমালোচনা করে আসছেন। সেপ্টেম্বরের একটি জাতীয় টেলিভিশন সাক্ষাৎকারেও তিনি রাজনীতিতে অর্থের প্রভাব কমানোকে তার প্রচারের অন্যতম কেন্দ্রীয় বিষয় হিসেবে তুলে ধরেন। তার প্রচারের তিনটি প্রধান বক্তব্যের মধ্যে রয়েছে রাজনীতি থেকে অর্থের প্রভাব কমানো, সাধারণ মানুষের হাতে বেশি অর্থ পৌঁছানো এবং সবার জন্য সরকারি স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণ। 

এল-সায়েদের প্রচারশিবিরের নিজস্ব তহবিল সংগ্রহের পাতাতেও বলা হয়েছে, তিনি করপোরেট রাজনৈতিক তহবিল গ্রহণ না করার অবস্থান নিয়েছেন। একই সঙ্গে তার বিজয় তহবিলের মাধ্যমে ব্যক্তি ও বিভিন্ন রাজনৈতিক সংগঠন থেকে আইনসম্মতভাবে অর্থ নেওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে। সেখানে একজন ব্যক্তির জন্য সর্বোচ্চ ৫৭ হাজার ৮০০ ডলার পর্যন্ত অর্থ দেওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। তবে ওই অর্থের পুরোটা সরাসরি এল-সায়েদের ব্যক্তিগত নির্বাচনী কমিটিতে যায় না; তহবিলের বণ্টন নির্দিষ্ট আইনগত সীমা অনুযায়ী বিভিন্ন অংশগ্রহণকারীর মধ্যে ভাগ হতে পারে। 

এখানেই সমালোচনার মূল প্রশ্নটি তৈরি হয়েছে। একদিকে এল-সায়েদ বড় করপোরেশন, ধনী ব্যক্তি এবং রাজনৈতিক অর্থের প্রভাব কমানোর কথা বলছেন। অন্যদিকে তার জন্য ক্যালিফোর্নিয়ায় উচ্চমূল্যের তহবিল সংগ্রহের অনুষ্ঠান হয়েছে, যার সঙ্গে জেফ্রি সোরোসের মতো ধনী দাতার সরাসরি সম্পৃক্ততা রয়েছে। রিপাবলিকান প্রার্থী মাইক রজার্সের প্রচারশিবির এই বিষয়টিকে এল-সায়েদের বক্তব্যের সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে দাবি করেছে। এটি একটি রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের বক্তব্য, স্বতন্ত্রভাবে প্রমাণিত সিদ্ধান্ত নয়। 

আরেকটি বিষয় এই বিতর্ককে আরও বিস্তৃত করেছে। ফক্স নিউজের ২১ সেপ্টেম্বরের প্রতিবেদনে বলা হয়, সোরোস-সংযুক্ত রাজনৈতিক তহবিল থেকে চলতি নির্বাচনী চক্রে ডেমোক্র্যাটদের সমর্থনকারী বিভিন্ন রাজনৈতিক সংগঠনে কোটি কোটি ডলার গেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, জুনের শেষ পর্যন্ত ডেমোক্রেসি প্যাক ও ডেমোক্রেসি প্যাক দুই মিলিয়ে ৪ কোটি ডলারের বেশি বিতরণ করেছিল। একই প্রতিবেদনে বলা হয়, ডেমোক্রেসি প্যাক থেকে সিনেট মেজরিটি প্যাক ৯০ লাখ ডলার পেয়েছে এবং ওই সংগঠন মিশিগানের সিনেট নির্বাচনে এল-সায়েদকে সমর্থন করতে ৩ কোটি ডলার ব্যয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। 

তবে এখানেও একটি গুরুত্বপূর্ণ যাচাইয়ের বিষয় রয়েছে। একটি রাজনৈতিক সংগঠন সোরোস-সংযুক্ত অর্থ পেয়েছে এবং পরে এল-সায়েদের পক্ষে অর্থ ব্যয়ের ঘোষণা দিয়েছে এই দুটি তথ্য থেকে সরাসরি বলা যায় না যে সোরোসের ওই অর্থ নির্দিষ্টভাবে এল-সায়েদের নির্বাচনী প্রচারের জন্য বরাদ্দ করা হয়েছিল। প্রচার অর্থের প্রবাহ ও রাজনৈতিক কমিটির ব্যয়ের ক্ষেত্রে অর্থের উৎস, মধ্যবর্তী সংগঠন এবং নির্দিষ্ট ব্যয়ের আইনগত কাঠামো আলাদা বিষয়। প্রকাশিত তথ্যেও এই পার্থক্য উল্লেখ করা হয়েছে। 

অর্থাৎ, এখন পর্যন্ত যাচাই করা তথ্য অনুযায়ী তিনটি বিষয় পরিষ্কার। প্রথমত, এল-সায়েদ ২০১২ সালে পল ও ডেইজি সোরোস ফেলোশিপ পেয়েছিলেন। দ্বিতীয়ত, জেফ্রি সোরোস বলেছেন তিনি ২০১২ সালে এল-সায়েদের সাক্ষাৎকার নিয়েছিলেন। তৃতীয়ত, ২০২৬ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর জেফ্রি সোরোসের বাড়িতে এল-সায়েদের জন্য তহবিল সংগ্রহের অনুষ্ঠান হয়েছে এবং সেখানে বড় অঙ্কের অনুদানের সুযোগ ছিল। 

কিন্তু “জেফ্রি সোরোস ব্যক্তিগতভাবে এল-সায়েদের পুরো শিক্ষার অর্থ দিয়েছেন” অথবা “সোরোসের নির্দিষ্ট রাজনৈতিক অর্থ সরাসরি এল-সায়েদের প্রচারে গেছে”—এ ধরনের সরল বক্তব্য প্রকাশ্য প্রমাণের ভিত্তিতে নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। একইভাবে অনুষ্ঠানে ৫৭ হাজার ৮০০ ডলার পর্যন্ত অনুদানের সুযোগ থাকার অর্থ অনুষ্ঠানটি ওই পরিমাণ অর্থ সংগ্রহ করেছে—এমন দাবিও করা যায় না।

এই ঘটনায় তাই মূল বিতর্কটি ব্যক্তিগত সম্পর্কের অস্তিত্ব নিয়ে নয়। সেটি নথিভুক্ত। বিতর্কটি মূলত রাজনৈতিক অর্থ নিয়ে এল-সায়েদের বক্তব্য এবং ধনী দাতাদের উপস্থিতিতে অনুষ্ঠিত তহবিল সংগ্রহের মধ্যে সামঞ্জস্য কতটা রয়েছে, তা নিয়ে। এল-সায়েদের প্রচারশিবির বলছে, তিনি করপোরেট রাজনৈতিক তহবিলের বিরুদ্ধে এবং তার প্রচারের অর্থ সাধারণ সমর্থকদের কাছ থেকেও আসছে। অন্যদিকে তার রিপাবলিকান প্রতিদ্বন্দ্বীর প্রচারশিবির এই অনুষ্ঠানের মাধ্যমে তার বক্তব্যের সমালোচনা করছে। 

সুতরাং, সাম্প্রতিক ঘটনাটিকে সবচেয়ে নির্ভুলভাবে বলা যায়—আবদুল এল-সায়েদের ২০১২ সালের সোরোস ফেলোশিপ এবং জেফ্রি সোরোসের সঙ্গে দীর্ঘদিনের পরিচয় এখন ২০২৬ সালের নির্বাচনী তহবিল সংগ্রহের কারণে নতুন করে রাজনৈতিক আলোচনায় এসেছে। নথিভুক্ত তথ্য সম্পর্ক ও অর্থায়নের কিছু দিক নিশ্চিত করে, কিন্তু সেগুলো থেকে আরও বিস্তৃত অভিযোগ স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রমাণিত হয় না। 


সিএসবি নিউজ-এর আরও খবর