পুতিনের নতুন সেনা বৃদ্ধি ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়ার পরবর্তী বড় পদক্ষেপের ইঙ্গিত দিচ্ছে

ইউক্রেন যুদ্ধের গতি ধীর হলেও পুতিনের নতুন সেনা বৃদ্ধি দীর্ঘ লড়াই, বাড়তি চাপ এবং আলোচনার অনিশ্চিত ভবিষ্যতের স্পষ্ট ইঙ্গিত দিচ্ছে।

পুতিনের নতুন সেনা বৃদ্ধি ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়ার পরবর্তী বড় পদক্ষেপের ইঙ্গিত দিচ্ছে

পুতিনের নতুন সেনা বৃদ্ধি ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়ার পরবর্তী বড় পদক্ষেপের ইঙ্গিত দিচ্ছে


রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন দেশটির সশস্ত্র বাহিনীর অনুমোদিত আকার আবারও বাড়ানোর নির্দেশ দিয়েছেন। নতুন আদেশে সক্রিয় সামরিক সদস্যের সংখ্যা আরও ১৫ হাজার ৫০০ বাড়িয়ে ১৫ লাখ ৫০ হাজার ৫০০ করার কথা বলা হয়েছে। একই সঙ্গে রাশিয়ার পুরো সশস্ত্র বাহিনীর অনুমোদিত মোট জনবল দাঁড়াবে ২৪ লাখ ৪১ হাজার ৬৩০ জন। চলতি বছরে এটি রুশ সামরিক বাহিনীর আকার বাড়ানোর চতুর্থ নির্দেশ। মার্চ থেকে এ পর্যন্ত চারটি আদেশে সক্রিয় সামরিক সদস্যের অনুমোদিত সংখ্যা মোট ৪৭ হাজার ৮৬০ জন বেড়েছে। 

তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় পরিষ্কার করা জরুরি। পুতিনের নতুন আদেশকে সরাসরি ১৫ হাজার ৫০০ নতুন সৈন্যকে ইউক্রেনের যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানোর সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। এটি মূলত সেনাবাহিনীর অনুমোদিত কাঠামো বা জনবলসীমা বাড়ানোর প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত। আদেশে নতুন সদস্যদের কোথা থেকে নেওয়া হবে, কীভাবে নিয়োগ হবে বা তাদের কতজন ইউক্রেনে পাঠানো হবে, সে বিষয়ে বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি। রুশ সরকারও এখন পর্যন্ত প্রকাশ্যে এই বৃদ্ধির নির্দিষ্ট কারণ জানায়নি। 

তারপরও এই সিদ্ধান্তের সময়টি গুরুত্বপূর্ণ। ইউক্রেনে রাশিয়ার স্থল অগ্রগতি চলতি বছরে ধীর হয়ে এসেছে। ব্যাপকভাবে চালকবিহীন বিমান ব্যবহারের কারণে বড় আকারে সেনা ও সামরিক সরঞ্জাম এক জায়গায় জড়ো করা এবং দ্রুত এগিয়ে যাওয়া আগের তুলনায় বেশি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। সাম্প্রতিক মূল্যায়নে দেখা যাচ্ছে, রুশ বাহিনী পূর্ব ইউক্রেনের কিছু এলাকায় ধীরে ধীরে অগ্রসর হলেও দীর্ঘ সময় ধরে সামনের সারির বড় ধরনের পরিবর্তন ঘটেনি। 

রাশিয়ার এই সেনা বৃদ্ধির পেছনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর একটি হতে পারে দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধের জন্য জনবল ধরে রাখা। চার বছরের বেশি সময় ধরে চলা সংঘাতে বিপুলসংখ্যক সেনা আহত, নিহত বা যুদ্ধের বাইরে চলে গেছে। রাশিয়া ও ইউক্রেন উভয় পক্ষই নিজেদের ক্ষয়ক্ষতির প্রকৃত সংখ্যা প্রকাশ্যে পুরোপুরি জানায় না। ইউক্রেনের সামরিক বাহিনী চলতি মাসে দাবি করেছে, ২০২৬ সালে রুশ ক্ষয়ক্ষতি তিন লাখ ছাড়িয়েছে এবং সেপ্টেম্বরের প্রথমার্ধেই ২০ হাজারের বেশি রুশ সেনা হতাহত হয়েছে। তবে এসব সংখ্যা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। তাই এগুলোকে নিশ্চিত পরিসংখ্যান হিসেবে উপস্থাপন করা যাবে না। 

রাশিয়ার জন্য আরেকটি সমস্যা হচ্ছে সেনাবাহিনীর কাঠামো পুনর্গঠন। দীর্ঘ যুদ্ধের কারণে শুধু সামনের সারিতে সেনা পাঠানোই নয়, প্রশিক্ষণ, বিশ্রাম, আহতদের প্রতিস্থাপন, নতুন ইউনিট গঠন, সীমান্ত প্রতিরক্ষা এবং অন্যান্য সামরিক দায়িত্বের জন্যও বিপুল জনবল প্রয়োজন। ফলে অনুমোদিত সেনা সংখ্যা বাড়ানোর সিদ্ধান্তকে যুদ্ধক্ষেত্রে তাৎক্ষণিক আক্রমণের প্রস্তুতি এবং দীর্ঘমেয়াদি সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধির মধ্যে আলাদা করে দেখা দরকার।

রুশ সামরিক বিশ্লেষক আন্দ্রেই কুর্তুনভ এই বৃদ্ধিকে মূলত কারিগরি সিদ্ধান্ত হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তার মতে, মাত্র ১৫ হাজারের কিছু বেশি সদস্য যোগ হওয়া যুদ্ধের সামগ্রিক গতিপথ রাতারাতি বদলে দেবে না। অন্য একজন সামরিক বিশ্লেষক আলেক্সেই মুরাভিয়েভের মতে, নতুন ইউনিট তৈরি, নিয়োগ ও প্রশিক্ষণে সময় লাগে। তাই এই সিদ্ধান্তকে তাৎক্ষণিক যুদ্ধক্ষেত্রের প্রয়োজন মেটানোর পরিবর্তে দীর্ঘমেয়াদি সামরিক পরিকল্পনার অংশ হিসেবেও দেখা যেতে পারে। 

এই ব্যাখ্যার সঙ্গে রাশিয়ার বৃহত্তর প্রতিরক্ষা পরিকল্পনাও মিলে যায়। সাম্প্রতিক সরকারি নথি অনুযায়ী, ২০২৭ সালে রাশিয়া প্রতিরক্ষা খাতে ১৭ দশমিক ১ ট্রিলিয়ন রুবল ব্যয়ের পরিকল্পনা করেছে, যা আগের নির্ধারিত পরিমাণের তুলনায় প্রায় ২৭ শতাংশ বেশি। যুদ্ধ শুরুর পর এটিই হবে দেশটির প্রতিরক্ষা খাতে সর্বোচ্চ পরিকল্পিত ব্যয়। আগামী তিন বছরে প্রতিরক্ষা ব্যয় মোট প্রায় ৫০ ট্রিলিয়ন রুবলে পৌঁছানোর পরিকল্পনাও রয়েছে। 

অর্থাৎ শুধু সেনা সংখ্যা নয়, সামরিক ব্যয়ের ক্ষেত্রেও মস্কো দীর্ঘমেয়াদি প্রস্তুতির সংকেত দিচ্ছে। একই সময়ে রাশিয়ার অর্থনীতির ওপরও যুদ্ধের চাপ বাড়ছে। ২০২৬ সালের বাজেট ঘাটতির পূর্বাভাস ১ দশমিক ৬ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৩ দশমিক ২ শতাংশ করা হয়েছে। তেল ও গ্যাস থেকে প্রত্যাশিত আয়ও কমানো হয়েছে। ফলে সামরিক ব্যয় বাড়াতে গিয়ে রাশিয়াকে রাজস্ব, ঋণ এবং কর ব্যবস্থার ওপর অতিরিক্ত চাপ নিতে হচ্ছে। 

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো রাশিয়ার সঙ্গে উত্তর কোরিয়ার সামরিক সহযোগিতা। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি ২৮ সেপ্টেম্বর বলেছেন, রাশিয়ার ভূখণ্ডে আট হাজারের বেশি উত্তর কোরীয় সেনা রয়েছে এবং আরও ১০ হাজার সেনা পাঠানোর প্রস্তুতি চলছে। ইউক্রেন ও দক্ষিণ কোরিয়ার হিসাব অনুযায়ী, ২০২৪ সাল থেকে উত্তর কোরিয়া রাশিয়াকে ১৪ হাজার থেকে ১৫ হাজার সেনা দিয়েছে। এসব দাবির সবকটি স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব নয়, তবে উত্তর কোরিয়ার রাশিয়াকে সামরিক সহায়তার বিষয়টি দীর্ঘদিন ধরেই আন্তর্জাতিকভাবে আলোচিত। 

তাহলে কি নতুন করে বড় ধরনের সেনা সমাবেশের ঘোষণা আসছে? এই মুহূর্তে এমন সিদ্ধান্তের নিশ্চিত প্রমাণ নেই। পুতিন এর আগে ২০২২ সালের সেপ্টেম্বরে সংরক্ষিত সেনাদের আংশিক সমাবেশের নির্দেশ দিয়েছিলেন। এবারও ইউক্রেনীয় কর্মকর্তারা নতুন সেনা সমাবেশের প্রস্তুতির অভিযোগ করছেন। কিন্তু মস্কো তা অস্বীকার করেছে এবং পুতিন এ ধরনের দাবিকে বিভ্রান্তিকর প্রচার হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। নতুন আদেশেও সরাসরি নতুন ব্যাপক সেনা সমাবেশের ঘোষণা নেই। 

যুদ্ধক্ষেত্রের পরিস্থিতি দেখলে বোঝা যায়, রাশিয়া এখন দ্রুত স্থলজয়ের পরিবর্তে বিভিন্ন ধরনের সামরিক চাপ একসঙ্গে ব্যবহার করছে। স্থলবাহিনীর অগ্রগতি ধীর হলেও ক্ষেপণাস্ত্র ও চালকবিহীন বিমানের হামলা অব্যাহত রয়েছে। সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে রুশ বাহিনী রাতের পাশাপাশি দিনের বিভিন্ন সময়েও হামলা চালাচ্ছে। উচ্চগতির চালকবিহীন বিমান ব্যবহারের ফলে ইউক্রেনের আকাশ প্রতিরক্ষার ওপর নতুন চাপ তৈরি হয়েছে। 

২৮ সেপ্টেম্বর ইউক্রেনের বিভিন্ন এলাকায় রুশ হামলায় অন্তত ১০ জন নিহত এবং ৮০ জনের বেশি আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। কিয়েভসহ একাধিক শহরে হামলা হয়েছে। একই সঙ্গে ইউক্রেনও রাশিয়ার জ্বালানি অবকাঠামোসহ বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে দূরপাল্লার হামলা চালাচ্ছে। ফলে যুদ্ধটি কেবল সামনের সারির সীমিত ভূখণ্ড দখলের লড়াইয়ে আটকে নেই; দুই দেশই এখন দূরপাল্লার আঘাত, জ্বালানি অবকাঠামো, সরবরাহব্যবস্থা এবং সামরিক শিল্পকে লক্ষ্য করছে। 

কূটনৈতিক ক্ষেত্রেও পরিস্থিতি এখনো অনিশ্চিত। পুতিন সম্প্রতি বলেছেন, যুদ্ধ বন্ধের বিভিন্ন প্রস্তাব আলোচনার টেবিলে রয়েছে। তবে তিনি একই সঙ্গে বলেছেন, রাশিয়াকে নিজেদের স্বার্থ বিবেচনা করে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নিতে হবে। রুশ পক্ষ ইউক্রেনের ভূখণ্ডগত অবস্থান এবং সামরিক জোটে যোগ দেওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে কঠোর অবস্থান ধরে রেখেছে। অন্যদিকে ইউক্রেন রাশিয়ার কাছে ভূখণ্ড ছেড়ে দেওয়ার বিষয়টি প্রত্যাখ্যান করেছে এবং ভবিষ্যৎ চুক্তির ক্ষেত্রে নিরাপত্তার নিশ্চয়তা চায়। 

সাম্প্রতিক কূটনৈতিক তৎপরতা সত্ত্বেও এখন পর্যন্ত বড় কোনো সমঝোতা হয়নি। যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে আলোচনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে এবং দুই দেশের সঙ্গে আলাদাভাবে যোগাযোগও হয়েছে। কিন্তু ভূখণ্ড, নিরাপত্তা এবং ভবিষ্যৎ সামরিক অবস্থান নিয়ে মৌলিক মতবিরোধ রয়ে গেছে। ফলে আলোচনা চালু থাকলেও তা দ্রুত যুদ্ধবিরতিতে রূপ নেবে এমন নিশ্চয়তা নেই। 

এই পরিস্থিতিতে পুতিনের নতুন সেনা বৃদ্ধির অর্থ কী দাঁড়ায়? সবচেয়ে সতর্ক ব্যাখ্যা হলো, রাশিয়া যুদ্ধ দ্রুত শেষ করার পরিবর্তে দীর্ঘমেয়াদি সামরিক সক্ষমতা ধরে রাখার প্রস্তুতি নিচ্ছে। তবে এটিকে সরাসরি নতুন বড় আক্রমণের ঘোষণা বলা যাবে না। ১৫ হাজার ৫০০ সদস্যের বৃদ্ধি একা যুদ্ধের গতিপথ বদলে দেওয়ার মতো বড় সংখ্যা নয়। বরং চলতি বছরে বারবার সেনা কাঠামো বাড়ানো, প্রতিরক্ষা ব্যয় বৃদ্ধি, নতুন ইউনিট গঠন এবং বিদেশি সামরিক সহযোগিতা—সবগুলোকে একসঙ্গে দেখলে বোঝা যায়, মস্কো দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের জন্য প্রস্তুতি ধরে রাখছে। 

আগামী দিনগুলোতে যুদ্ধের গতিপথ মূলত তিনটি বিষয়ে নির্ভর করতে পারে। প্রথমত, রাশিয়া কত দ্রুত নতুন সেনা নিয়োগ ও প্রশিক্ষণ দিতে পারে। দ্বিতীয়ত, ইউক্রেন কতটা কার্যকরভাবে রুশ স্থল অগ্রগতি এবং আকাশ হামলা প্রতিহত করতে পারে। তৃতীয়ত, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের সামরিক ও অর্থনৈতিক সহায়তা এবং নতুন কোনো কূটনৈতিক উদ্যোগ বাস্তবে কতটা অগ্রসর হয়। বর্তমানে স্থলযুদ্ধে ধীর অগ্রগতি এবং আকাশপথে তীব্র হামলা—এই দুই প্রবণতা পাশাপাশি চলছে। 

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সত্য হলো, পুতিনের নতুন আদেশ যুদ্ধক্ষেত্রে তাৎক্ষণিকভাবে ১৫ হাজার ৫০০ নতুন সৈন্য নামানোর ঘোষণা নয়। এটি রাশিয়ার অনুমোদিত সক্রিয় সামরিক জনবল বাড়ানোর সিদ্ধান্ত। ক্রেমলিন এর নির্দিষ্ট কারণ প্রকাশ করেনি। তাই এর উদ্দেশ্য সম্পর্কে দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধের প্রস্তুতি, জনবল ঘাটতি পূরণ, সামরিক পুনর্গঠন এবং ন্যাটোর সঙ্গে সম্ভাব্য দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা প্রতিযোগিতা—এসব ব্যাখ্যা রয়েছে, কিন্তু কোনটি একমাত্র কারণ তা নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না। 

বর্তমান তথ্য অনুযায়ী, ইউক্রেন যুদ্ধ দ্রুত সমাপ্তির দিকে যাচ্ছে—এমন কোনো নিশ্চিত লক্ষণ নেই। একই সঙ্গে রাশিয়া দ্রুত সামরিক বিজয় অর্জন করছে—এমন দাবিও বর্তমান যুদ্ধক্ষেত্রের তথ্য পুরোপুরি সমর্থন করে না। বরং ধীর স্থল অগ্রগতি, ব্যাপক আকাশ হামলা, বাড়তে থাকা সামরিক ব্যয়, নতুন জনবল কাঠামো এবং অনিশ্চিত কূটনৈতিক প্রচেষ্টার মধ্য দিয়ে সংঘাতটি আরও দীর্ঘায়িত হওয়ার ঝুঁকিই এখন স্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে। 


সিএসবি নিউজ-এর আরও খবর