ইরানকে কাতারের কড়া বার্তা, উপসাগরীয় দেশগুলোকে যুদ্ধের বাইরে রাখার আহ্বান
কাতার বলছে, ইরানকে প্রতিবেশীদের বিরুদ্ধে আগ্রাসন বন্ধ করে উপসাগরীয় দেশগুলোকে সংঘাতের বাইরে রাখতে হবে এবং হরমুজে নৌচলাচল স্বাভাবিক করতে হবে।
ইরানকে কাতারের কড়া বার্তা, উপসাগরীয় দেশগুলোকে যুদ্ধের বাইরে রাখার আহ্বান
দোহা থেকে নতুন করে কঠোর কূটনৈতিক বার্তা দিয়েছে কাতার। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মাজেদ আল আনসারি বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের চলমান সংঘাতের অংশ হতে উপসাগরীয় দেশগুলো নিজেরা কোনো সিদ্ধান্ত নেয়নি। তাই প্রতিবেশী দেশগুলোকে এই সংঘাতের মধ্যে টেনে নেওয়া বা তাদের ভূখণ্ড ও স্থাপনায় হামলা চালানো বন্ধ করতে ইরানকে স্পষ্ট অবস্থান নিতে হবে। মঙ্গলবার দোহায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাপ্তাহিক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন।
আল আনসারির বক্তব্য অনুযায়ী, উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদের দেশগুলোর সঙ্গে ইরানের আলাদা কোনো যুদ্ধ চলছে না, যার জন্য আলাদা কোনো সমাধান প্রয়োজন। বরং মূল সংকট হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যকার বৃহত্তর সংঘাত। সেই সংঘাতের প্রভাব যেন প্রতিবেশী দেশগুলোর ওপর না পড়ে, সেটিই এখন কাতারের অন্যতম প্রধান কূটনৈতিক দাবি। তিনি ইরানকে প্রতিবেশীদের বিরুদ্ধে অনাক্রমণ নীতি গ্রহণের বিষয়ে পরিষ্কার অবস্থান জানানোর আহ্বান জানিয়েছেন।
কাতারের এই অবস্থান এমন এক সময়ে সামনে এলো, যখন কয়েক মাস ধরে চলা সংঘাতের কারণে পুরো উপসাগরীয় অঞ্চলের নিরাপত্তা, জ্বালানি সরবরাহ এবং সমুদ্রপথে পণ্য পরিবহন নিয়ে ব্যাপক উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালির পরিস্থিতি আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও জ্বালানি বাজারের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলছে। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই সমুদ্রপথ দিয়ে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ জ্বালানি পরিবহন হয়ে থাকে। সংঘাতের কারণে সেখানে নৌচলাচল ব্যাহত হওয়ায় শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়, বিশ্বের বিভিন্ন দেশের অর্থনীতিতেও চাপ তৈরি হয়েছে। সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে কাতারও জানিয়েছে, এই পরিস্থিতির প্রভাব এখন জ্বালানি খাতের বাইরেও বিস্তৃত হচ্ছে।
মঙ্গলবারের সংবাদ সম্মেলনে আল আনসারি আরও বলেন, কাতার সাম্প্রতিক হামলার পরও শান্তির পথ থেকে সরে যায়নি। বরং দেশটি ইরানের সঙ্গে যোগাযোগ অব্যাহত রেখেছে এবং যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সমঝোতার পথ তৈরিতে মধ্যস্থতার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। কাতারের লক্ষ্যগুলোর মধ্যে রয়েছে হরমুজ প্রণালিতে পূর্ণাঙ্গ নৌচলাচল পুনরুদ্ধার, আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং সংঘাতের বিস্তার ঠেকানো।
কাতারের মধ্যস্থতার এই ভূমিকা নতুন নয়। এর আগেও দেশটি যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে পরোক্ষ যোগাযোগের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের সময়ও কাতারের মধ্যস্থতায় দুই পক্ষের প্রতিনিধিদের মধ্যে আলোচনা হয়েছে। সেপ্টেম্বরের তৃতীয় সপ্তাহে নিউইয়র্কে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিদের মধ্যে কয়েক ঘণ্টার আলোচনা হয়। ওই আলোচনার পর হরমুজ প্রণালি পুনরায় স্বাভাবিক করার সম্ভাবনা নিয়ে কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়ে।
তবে আলোচনার পথ এখনো সহজ হয়নি। ইরান হরমুজ প্রণালির পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার সঙ্গে যুদ্ধ বন্ধ, অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধসহ কয়েকটি শর্তকে যুক্ত করেছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের প্রস্তাবের বিভিন্ন দিক নিয়ে আপত্তি জানিয়েছে। সেপ্টেম্বরের শেষ সপ্তাহে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের একটি প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করলেও পরবর্তী সময়ে নতুন করে আলোচনার সম্ভাবনার কথা জানিয়েছেন। ফলে কূটনৈতিক যোগাযোগ পুরোপুরি বন্ধ হয়নি।
কাতারের বক্তব্যের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর নিরাপত্তা। সাম্প্রতিক সংঘাতে উপসাগরীয় কয়েকটি দেশের ভূখণ্ড, স্থাপনা ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো হামলার ঝুঁকিতে পড়েছে। কাতারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, দেশটির ভূখণ্ড লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ও চালকবিহীন বিমান হামলা চালানো হয়েছিল। কাতারি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, হামলার বড় অংশ প্রতিহত করা হয়েছে। কাতার একই সঙ্গে ইরানের পক্ষ থেকে হামলার বিষয়ে আগাম সতর্ক করা হয়েছিল—এমন দাবিও প্রত্যাখ্যান করেছে।
এই পরিস্থিতিতে দোহার বক্তব্যে একদিকে নিরাপত্তার প্রশ্ন, অন্যদিকে কূটনৈতিক যোগাযোগ—দুই বিষয়ই গুরুত্ব পেয়েছে। কাতার বলছে, সামরিক সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা আরও দুর্বল হবে এবং এর অর্থনৈতিক ক্ষতি কেবল সংঘাতরত দেশগুলোর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। হরমুজ প্রণালির ওপর চাপ বাড়লে জ্বালানি পরিবহন, সমুদ্রবাণিজ্য, বিমা ব্যয় এবং আন্তর্জাতিক পণ্যের দামে তার প্রভাব পড়তে পারে। ইতোমধ্যে উপসাগরীয় বাজারগুলোতে অনিশ্চয়তার প্রভাব দেখা যাচ্ছে। মঙ্গলবার কাতারের প্রধান শেয়ারবাজার সূচকও পতনের মুখে পড়ে এবং হরমুজের পরিস্থিতির কারণে দেশটির তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস পরিবহন নিয়ে উদ্বেগ অব্যাহত ছিল।
সৌদি আরবও বিকল্প জ্বালানি পরিবহন পথ ব্যবহার করে পরিস্থিতির প্রভাব কমানোর চেষ্টা করছে। মঙ্গলবার সৌদি আরবের পূর্ব-পশ্চিম তেল পাইপলাইন আবার চালু হওয়ার খবর পাওয়া যায়। এই পাইপলাইন দিয়ে হরমুজ প্রণালি এড়িয়ে লোহিত সাগরের ইয়ানবু বন্দরের দিকে তেল পাঠানো সম্ভব। ফলে আঞ্চলিক দেশগুলো হরমুজের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমানোর বিভিন্ন পথ খুঁজছে।
কাতার অবশ্য শুধু তাৎক্ষণিক যুদ্ধবিরতির কথা বলছে না। এর আগেও আল আনসারি আঞ্চলিক নিরাপত্তা, পারস্পরিক অনাক্রমণ এবং প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে সুসম্পর্ক প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন। জুনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সমঝোতার সম্ভাবনা তৈরি হওয়ার সময়ও কাতার জানিয়েছিল, হরমুজ প্রণালি, আঞ্চলিক নিরাপত্তা, অনাক্রমণ, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি, ক্ষেপণাস্ত্র এবং বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর ভূমিকা নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি আলোচনা প্রয়োজন।
কাতারের বর্তমান অবস্থান তাই শুধু ইরানকে হামলা বন্ধ করার আহ্বানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। দোহা একই সঙ্গে আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্য একটি দীর্ঘমেয়াদি কাঠামো তৈরির প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরছে। কাতারের নেতৃত্ব মনে করছে, কেবল সামরিক শক্তির মাধ্যমে উপসাগরীয় অঞ্চলে স্থায়ী নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়। বরং প্রতিবেশী দেশগুলোর মধ্যে যোগাযোগ, পারস্পরিক নিরাপত্তার নিশ্চয়তা এবং সংঘাত এড়ানোর ব্যবস্থা প্রয়োজন।
অন্যদিকে ইরানের অবস্থানও পুরোপুরি বদলায়নি। তেহরান বলছে, তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে হরমুজ প্রণালির পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার বিষয়ে অগ্রগতি কঠিন হবে। মঙ্গলবার ইরানের পক্ষ থেকেও হুমকিমূলক বক্তব্য এসেছে যে তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে মধ্যপ্রাচ্যের কোনো অবকাঠামোই নিরাপদ থাকবে না। একই সময়ে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের প্রয়োজনীয়তার কথাও বলে আসছেন। ফলে সামরিক উত্তেজনার পাশাপাশি কূটনৈতিক যোগাযোগও পাশাপাশি চলছে।
তথ্য যাচাই করে দেখা গেছে, কাতারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মাজেদ আল আনসারি মঙ্গলবার ইরানকে প্রতিবেশীদের বিরুদ্ধে স্পষ্ট অনাক্রমণ অবস্থান নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন—এটি সাম্প্রতিক প্রতিবেদনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। কাতার যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে মধ্যস্থতামূলক যোগাযোগ চালিয়ে যাচ্ছে এবং হরমুজ প্রণালিতে নৌচলাচল স্বাভাবিক করার চেষ্টা করছে, সেটিও একাধিক সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে নিশ্চিত হয়েছে। তবে আলোচনার মাধ্যমে চূড়ান্ত কোনো সমঝোতা এখনো হয়নি।
সব মিলিয়ে মঙ্গলবারের কাতারি বার্তার মূল বিষয় তিনটি—উপসাগরীয় দেশগুলোকে বৃহত্তর যুদ্ধের বাইরে রাখা, ইরানের কাছ থেকে প্রতিবেশীদের বিরুদ্ধে অনাক্রমণের স্পষ্ট নিশ্চয়তা চাওয়া এবং কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে হরমুজ প্রণালিতে নিরাপদ নৌচলাচল ফিরিয়ে আনা। সংঘাতের সামরিক দিক যতটা গুরুত্বপূর্ণ, তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে এখন আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যপথ স্বাভাবিক করার কূটনৈতিক প্রচেষ্টাও গুরুত্ব পাচ্ছে। কাতার সেই প্রচেষ্টায় নিজের মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা ধরে রাখার বার্তাই দিয়েছে।