ইথিওপিয়ায় সেনাবাহিনীর আলামাতা দখল, টাইগ্রেতে ফের পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধের আশঙ্কা বাড়ছে নতুন করে
ইথিওপিয়ার টাইগ্রে অঞ্চলে নতুন করে তীব্র লড়াইয়ে আলামাতা দখলের দাবি ঘিরে আবারও যুদ্ধের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে এবং মানবিক সংকট বাড়ছে।
ইথিওপিয়ায় সেনাবাহিনীর আলামাতা দখল, টাইগ্রেতে ফের পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধের আশঙ্কা বাড়ছে নতুন করে
ইথিওপিয়ার উত্তরাঞ্চলীয় টাইগ্রে অঞ্চলে নতুন করে তীব্র লড়াই শুরু হওয়ার পর পরিস্থিতি দ্রুত অবনতির দিকে যাচ্ছে। সরকারি বাহিনী ও তাদের মিত্ররা কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ আলামাতা শহর নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার দাবি করেছে। অন্যদিকে টাইগ্রে অঞ্চলের সশস্ত্র বাহিনীর সঙ্গে কেন্দ্রীয় সরকারের সংঘর্ষ অব্যাহত রয়েছে। কয়েক বছরের ভঙ্গুর শান্তির পর এই লড়াই আবারও দেশটিকে বড় ধরনের গৃহযুদ্ধের দিকে ঠেলে দিতে পারে বলে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
আলামাতা শহরটি টাইগ্রের রাজধানী মেকেলের প্রায় ১২০ কিলোমিটার দক্ষিণে অবস্থিত। ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে শহরটি সামরিক সরবরাহ, খাদ্য ও জ্বালানি পরিবহনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। শহরটি টাইগ্রে ও আমহারা অঞ্চলের সীমান্তের কাছাকাছি হওয়ায় এর নিয়ন্ত্রণ সামরিক দিক থেকেও গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হয়। ২০২০ থেকে ২০২২ সালের ভয়াবহ সংঘাতের সময়ও আলামাতা একাধিকবার পক্ষ পরিবর্তন করেছিল।
সাম্প্রতিক পরিস্থিতিতে সরকারি বাহিনীর পক্ষে থাকা টাইগ্রে শান্তি বাহিনী আলামাতা নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার দাবি করে। পরে রয়টার্সের যাচাই করা ভিডিওতে শহরের রাস্তায় ইথিওপিয়ার সরকারি বাহিনীর সদস্যদের দেখা যায়। দুটি কূটনৈতিক সূত্রও শহরটির নিয়ন্ত্রণ সরকারি বাহিনীর হাতে যাওয়ার কথা নিশ্চিত করেছে। সরকারবিরোধী বাহিনীর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানায়, তাদের যোদ্ধারা আলামাতা থেকে পিছু হটছিল। ফলে শহরটির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে সরকারি পক্ষের দাবিটি এখন পর্যন্ত একাধিক স্বাধীন সূত্রের তথ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
তবে সংঘাতের সামগ্রিক চিত্র এখনো পুরোপুরি পরিষ্কার নয়। টাইগ্রে অঞ্চলে যোগাযোগব্যবস্থা বিঘ্নিত থাকায় ঘটনাস্থল থেকে স্বাধীনভাবে তথ্য সংগ্রহ করা কঠিন হয়ে পড়েছে। ইন্টারনেট ও মুঠোফোন যোগাযোগ কয়েক দিন ধরে ব্যাহত রয়েছে। এর ফলে সাধারণ মানুষ পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারছেন না এবং সংঘর্ষের প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতির তথ্যও দ্রুত পাওয়া যাচ্ছে না।
এই সংঘাতের পেছনে রয়েছে কয়েক বছর ধরে চলা রাজনৈতিক ও সামরিক উত্তেজনা। ২০২০ সালের নভেম্বরে ইথিওপিয়ার কেন্দ্রীয় সরকার ও টাইগ্রে পিপলস লিবারেশন ফ্রন্টের মধ্যে যুদ্ধ শুরু হয়। দুই বছর ধরে চলা সেই যুদ্ধে বিপুলসংখ্যক মানুষ নিহত হন এবং খাদ্য, চিকিৎসা ও অন্যান্য মৌলিক সেবা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ২০২২ সালের নভেম্বরে দক্ষিণ আফ্রিকার প্রিটোরিয়ায় একটি শান্তিচুক্তির মাধ্যমে বড় ধরনের যুদ্ধ বন্ধ হয়। কিন্তু চুক্তির পরও বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ও ভূখণ্ডগত বিরোধের সমাধান হয়নি।
বিশেষ করে পশ্চিম টাইগ্রের নিয়ন্ত্রণ, বাস্তুচ্যুত মানুষের প্রত্যাবর্তন, নিরস্ত্রীকরণ এবং টাইগ্রের প্রশাসন নিয়ে বিরোধ অব্যাহত ছিল। টাইগ্রে পক্ষ পশ্চিম টাইগ্রে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে ফিরিয়ে দেওয়া এবং বাস্তুচ্যুতদের ফেরত পাঠানোর দাবি করে আসছিল। অন্যদিকে কেন্দ্রীয় সরকার ওই অঞ্চলের ভবিষ্যৎ নিয়ে গণভোটের কথা বলেছে। এসব বিরোধের পাশাপাশি টাইগ্রের রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও কেন্দ্রীয় সরকারের মধ্যে ক্ষমতার সম্পর্ক নিয়েও উত্তেজনা বাড়তে থাকে।
চলতি বছরের সেপ্টেম্বরের শুরুতে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। টাইগ্রে পিপলস লিবারেশন ফ্রন্টসহ কয়েকটি সশস্ত্র সংগঠন একটি নতুন জোট গঠনের ঘোষণা দেয়। জোটটির সদস্যদের মধ্যে আমহারা অঞ্চলের ফানো এবং ওরোমিয়া লিবারেশন আর্মির মতো কেন্দ্রীয় সরকারের বিরোধী শক্তিও রয়েছে। তাদের ঘোষিত রাজনৈতিক লক্ষ্য ইথিওপিয়ার বর্তমান কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে সম্মিলিতভাবে অবস্থান নেওয়া।
এরপর ২৩ সেপ্টেম্বর থেকে পরিস্থিতি দ্রুত সামরিক সংঘাতে রূপ নেয়। টাইগ্রে বাহিনী মেকেলে, আকসুম ও শিরে এলাকার বিমানবন্দরসহ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার দাবি করে। একই সময়ে টাইগ্রে, আমহারা ও আফার অঞ্চলের বিভিন্ন এলাকায় সরকারি বাহিনী এবং টাইগ্রে সমর্থিত যোদ্ধাদের মধ্যে সংঘর্ষ শুরু হয়। সংঘর্ষের সূচনা নিয়ে দুই পক্ষের বক্তব্যও পরস্পরবিরোধী। টাইগ্রে পক্ষ দাবি করছে, সরকারি বাহিনীর সামরিক অভিযান ও আকাশ হামলার প্রতিক্রিয়ায় তারা পাল্টা ব্যবস্থা নিয়েছে। সরকারপক্ষের বক্তব্য হলো, টাইগ্রে বাহিনী প্রথমে আক্রমণ চালিয়ে নতুন সংঘাতের সূচনা করেছে।
আলামাতা দখল সরকারি বাহিনীর জন্য গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে দেখা হচ্ছে, কারণ শহরটি মেকেলের দিকে অগ্রসর হওয়ার পথের একটি গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান। তবে এর অর্থ এই নয় যে পুরো টাইগ্রে অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ সরকারি বাহিনীর হাতে চলে গেছে। সংঘাত এখনো বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে রয়েছে এবং টাইগ্রে বাহিনীও কয়েকটি এলাকায় সক্রিয় রয়েছে। সংঘর্ষের গতিপথ প্রতিদিন পরিবর্তিত হচ্ছে।
মানবিক পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ আরও বড় হয়ে উঠেছে। আন্তর্জাতিক চিকিৎসা সংস্থা সীমান্তহীন চিকিৎসক জানিয়েছে, ২২ থেকে ২৫ সেপ্টেম্বর মাত্র ৪৮ ঘণ্টায় কোরেম ও আলামাতা হাসপাতালগুলোতে যুদ্ধাহত রোগীর সংখ্যা প্রায় ১৮০ থেকে বেড়ে ৪২০-এর বেশি হয়েছে। উত্তর-পশ্চিম টাইগ্রের শিরে এলাকার একটি হাসপাতালেও একই সময়ে ৩০০-এর বেশি যুদ্ধাহত মানুষ চিকিৎসা নিতে আসে। নিরাপত্তা পরিস্থিতির কারণে আলামাতা হাসপাতালে সংস্থাটির কার্যক্রম সাময়িকভাবে বন্ধ করতে হয়েছে।
চিকিৎসা সহায়তার পাশাপাশি বাস্তুচ্যুতি নিয়েও আশঙ্কা বাড়ছে। সংঘর্ষের কারণে টাইগ্রে, আমহারা ও আফার অঞ্চলের বহু মানুষ নিজেদের বাড়িঘর ছেড়ে নিরাপদ এলাকায় যাওয়ার চেষ্টা করছেন। আফার অঞ্চলে প্রায় দেড় লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে বলে স্থানীয় মানবিক সহায়তা কর্মীদের বরাতে খবর এসেছে। তবে যোগাযোগব্যবস্থা ভেঙে পড়ায় বাস্তুচ্যুত মানুষের প্রকৃত সংখ্যা নির্ধারণ করা কঠিন।
আন্তর্জাতিক রেডক্রসও সংঘাতপূর্ণ এলাকা থেকে মানুষ সরিয়ে নেওয়ার কাজে যুক্ত হয়েছে। ২৮ সেপ্টেম্বর মেকেলে থেকে ১৬১ জনকে আফার অঞ্চলের রাজধানীর দিকে সরিয়ে নেওয়া হয়। তাদের মধ্যে আফ্রিকান ইউনিয়নের পর্যবেক্ষক, সরকারি পুলিশ, বিমান সংস্থার কর্মী এবং রেডক্রসের কর্মীরাও ছিলেন। এ ধরনের সরিয়ে নেওয়ার ঘটনা পরিস্থিতির নিরাপত্তাজনিত ঝুঁকি কতটা বেড়েছে, তার একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত।
সংঘাতের আঞ্চলিক প্রভাব নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। ইথিওপিয়ার সেনাপ্রধান প্রতিবেশী ইরিত্রিয়া, সুদান ও মিসরের বিরুদ্ধে টাইগ্রে বাহিনীকে সহায়তার অভিযোগ তুলেছেন। তবে অভিযোগ করা দেশগুলোর পক্ষ থেকে এসব দাবির বিরুদ্ধে অস্বীকৃতি জানানো হয়েছে। ফলে প্রতিবেশী দেশগুলোর সম্পৃক্ততা নিয়ে এখনো নিশ্চিত স্বাধীন প্রমাণের চেয়ে পারস্পরিক অভিযোগই বেশি সামনে রয়েছে।
ইরিত্রিয়ার সঙ্গে ইথিওপিয়ার সম্পর্কও এ সংকটের গুরুত্বপূর্ণ একটি দিক। ২০২০ থেকে ২০২২ সালের আগের যুদ্ধে ইরিত্রিয়ার সেনারা ইথিওপিয়ার সরকারি বাহিনীর সঙ্গে থেকে টাইগ্রে বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াই করেছিল। পরবর্তীতে ইথিওপিয়ার সমুদ্রবন্দর ব্যবহারের আকাঙ্ক্ষা এবং লোহিত সাগরকেন্দ্রিক ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা দুই দেশের সম্পর্ককে আবারও স্পর্শকাতর করে তুলেছে।
আফ্রিকান ইউনিয়নসহ আন্তর্জাতিক পক্ষগুলো নতুন করে সংঘাত বন্ধ এবং আলোচনায় ফেরার আহ্বান জানিয়েছে। কারণ ২০২০ থেকে ২০২২ সালের যুদ্ধের মানবিক ক্ষত এখনো পুরোপুরি শুকায়নি। সেই সময়ের যুদ্ধে প্রাণহানির হিসাব নিয়ে বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে পার্থক্য থাকলেও কয়েক লাখ মানুষের মৃত্যুর বিষয়টি বিভিন্ন গবেষণা ও আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। যুদ্ধের পাশাপাশি দুর্ভিক্ষ, রোগ, চিকিৎসাব্যবস্থা ভেঙে পড়া এবং বাস্তুচ্যুতির কারণে মানুষের দুর্ভোগ আরও বেড়েছিল।
বর্তমান সংঘাত তাই শুধু একটি শহরের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে সামরিক লড়াই নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে ইথিওপিয়ার অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার দ্বন্দ্ব, টাইগ্রের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ, বিতর্কিত ভূখণ্ডের নিয়ন্ত্রণ, প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক এবং লোহিত সাগরকেন্দ্রিক আঞ্চলিক রাজনীতি। আলামাতা দখলের পর সরকারি বাহিনী মেকেলের দিকে আরও অগ্রসর হওয়ার চেষ্টা করবে কি না, আর টাইগ্রে বাহিনী ও তাদের মিত্ররা কীভাবে প্রতিরোধ গড়ে তুলবে, সেটিই এখন পরিস্থিতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
সবচেয়ে বড় উদ্বেগ সাধারণ মানুষকে ঘিরে। যোগাযোগব্যবস্থা বন্ধ, হাসপাতালগুলোতে আহত মানুষের চাপ, চলাচলে বাধা এবং নতুন করে বাস্তুচ্যুতির আশঙ্কা পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করে তুলছে। চার বছর আগে যে শান্তিচুক্তি বড় যুদ্ধের অবসান ঘটিয়েছিল, সেটি কার্যকরভাবে ভেঙে পড়ার পর এখন নতুন করে রাজনৈতিক সংলাপ শুরু করা এবং বেসামরিক মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই আন্তর্জাতিক মহলের প্রধান উদ্বেগ হয়ে উঠেছে।