আদালতের তিনটি আদেশ অমান্য করে আশ্রয়প্রার্থীকে তাড়ালো মার্কিন প্রশাসন

আমেরিকায় ট্রাম্প প্রশাসনের কড়া অভিবাসন নীতির মধ্যে ইমিগ্রেশন কর্মকর্তাদের অভিযান ও সন্দেহভাজনদের আটক করার প্রস্তুতিমূলকমূলক দৃশ্য।

PostImage

আদালতের তিনটি আদেশ অমান্য করে আশ্রয়প্রার্থীকে তাড়ালো মার্কিন প্রশাসন


যুক্তরাষ্ট্রের একটি ফেডারেল আদালত দেশের অভিবাসন নীতি ও আইনি প্রক্রিয়ার ওপর এক ঐতিহাসিক ও নজিরবিহীন নির্দেশ জারি করেছেন। তিনটি পৃথক আদালতের আদেশ সরাসরি অমান্য করে একজন তরুণ আশ্রয়প্রার্থীকে জোরপূর্বক এল সালভাদোরে ফেরত পাঠানোর অভিযোগে দেশটির ট্রাম্প প্রশাসনকে আদালত অবমাননায় দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছে।


মার্কিন ডিস্ট্রিক্ট জাজ স্টেফানি গ্যালাগার গত শুক্রবার এই কঠোর আদেশ প্রদান করেন। আদালত নথিতে ‘ই.এল.এ.’ হিসেবে চিহ্নিত ১৯ বছর বয়সী এক আশ্রয়প্রার্থীকে পরপর দুইবার বেআইনিভাবে এল সালভাদোরে ডিপোর্ট বা বহিষ্কার করার ঘটনায় তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করেন বিচারক। রায়ে সুস্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, মার্কিন হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগকে অবিলম্বে নির্দেশ দেওয়া হচ্ছে যেন তারা উক্ত তরুণকে সসম্মানে যুক্তরাষ্ট্রে ফিরিয়ে আনে এবং তার সমস্ত কাগজপত্র ও সম্পত্তি তাকে ফেরত দেয়।
আদালতের নথি ও মামলা সম্পর্কিত বিস্তারিত বিবরণ বিশ্লেষণ করে জানা যায়, ওই তরুণ যুক্তরাষ্ট্রে একজন অপ্রাপ্তবয়স্ক হিসেবে প্রবেশ করেছিলেন। পরবর্তীতে তার আশ্রয় আবেদন প্রক্রিয়াধীন থাকা অবস্থায় ২০১৯ সালের একটি শ্রেণি-সমষ্টিগত মামলার আইনি সুরক্ষা পাওয়ার অধিকার তার ছিল। তা সত্ত্বেও ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষ তাকে প্রথমবার অবৈধভাবে এল সালভাদোরে পাঠায়।  
নিজের জীবনের ঝুঁকি ও সম্ভাব্য সহিংসতার আশঙ্কায় ওই তরুণ দমে যাননি। প্রথমবার বহিষ্কৃত হওয়ার পর তিনি গত ৭ আগস্ট নিজস্ব অর্থায়নে একটি বিমানে উঠে যুক্তরাষ্ট্রে ফিরে আসেন এবং ইমিগ্রেশন কর্মকর্তাদের কাছে আত্মসমর্পণ করেন। সরকারের কাছে নিজেকে সোপর্দ করার পর তাকে কয়েক সপ্তাহ ধরে আটক কেন্দ্রে বন্দি রাখা হয়। তবে আইনি জটিলতা শেষ হওয়া এবং আদালতের পক্ষ থেকে বহিষ্কার না করার নির্দেশ দেওয়া সত্ত্বেও হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগ তাকে দ্বিতীয়বারের মতো এল সালভাদোরে ফেরত পাঠায়।  


বিচারক গ্যালাগার তার পর্যবেক্ষণে উল্লেখ করেন, সরকার কেবল আদালতের নির্দেশই অমান্য করেনি, বরং বিচার ব্যবস্থার আইনি মর্যাদা ও মৌলিক অধিকারকে ক্ষুণ্ন করেছে। তিনি নির্দেশ দেন, আদালতের কাছে সন্তোষজনক যুক্তি না দিয়ে এবং সম্পূর্ণ বিচার প্রক্রিয়া শেষ না হওয়া পর্যন্ত ওই তরুণের বিরুদ্ধে আর কোনো নতুন বহিষ্কার আদেশ জারি বা বাস্তবায়ন করা যাবে না। এছাড়াও, পরবর্তীতে তাকে যদি আবার দেশ থেকে বের করার কোনো আইনি উদ্যোগ গ্রহণ করাও হয়, তবে তার আইনজীবীদের অন্তত পাঁচ কর্মদিবস আগে তা জানাতে হবে।
এই ঘটনা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও বিচার ব্যবস্থার দীর্ঘদিনের দ্বন্দ্বকে নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে। সাবেক রাষ্ট্রপতি ডোনাল্ড ট্রাম্পের মেয়াদের কঠোর অভিবাসন নীতির অংশ হিসেবে বহু অভিবাসীকে দ্রুত গতিতে নিজ নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হচ্ছিল। এর মধ্যে অনেকেরই আশ্রয়ের আবেদন মার্কিন আদালতগুলোতে ঝুলন্ত অবস্থায় ছিল। মানবাধিকার সংগঠনগুলো শুরু থেকেই দাবি করে আসছিল যে, বহু মানুষকে উপযুক্ত শুনানির সুযোগ না দিয়েই ঝুঁকিপূর্ণ দেশে পাঠাচ্ছে প্রশাসন।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, একজন বিচারক কর্তৃক কোনো সরকারি প্রশাসনকে আদালত অবমাননায় দোষী সাব্যস্ত করা একটি অত্যন্ত ব্যতিক্রমী ঘটনা। এর ফলে প্রমাণিত হয় যে দেশের নির্বাহী বিভাগ বিচার বিভাগের আদেশের ওপর নিজেদের ক্ষমতার প্রয়োগ ঘটাচ্ছিল। এই রায়ের মাধ্যমে আদালতের ক্ষমতা এবং আইনানুগ বিচার ব্যবস্থার প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকার বিষয়টি পুনর্ব্যক্ত হলো।
ইতিমধ্যে আইনজীবীরা আদালতের আদেশের ওপর ভিত্তি করে উক্ত তরুণকে দ্রুত যুক্তরাষ্ট্রে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া শুরু করেছেন। এই বিচারিক সিদ্ধান্তের ফলে বর্তমানে আটকে থাকা বা অন্যায়ভাবে বহিষ্কৃত হওয়া আরও হাজার হাজার আশ্রয়প্রার্থীর মামলার ক্ষেত্রে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে আশা করছেন মানবাধিকার কর্মীরা।


সিএসবি নিউজ-এর আরও খবর