যুদ্ধ থামাতে সামরিক শক্তি যথেষ্ট নই, বিশ্বনেতাদের কড়া বার্তা গুতেরেসের
গাজায় ধ্বংসযজ্ঞ, বিশ্বজুড়ে সংঘাত ও জলবায়ু সংকট নিয়ে জাতিসংঘের মঞ্চে বিশ্বনেতাদের কড়া বার্তা দিলেন বিদায়ী মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস তাঁর ভাষণে।
যুদ্ধ থামাতে সামরিক শক্তি যথেষ্ট নই, বিশ্বনেতাদের কড়া বার্তা গুতেরেসের
বিশ্বজুড়ে একের পর এক যুদ্ধ, গাজায় ফিলিস্তিনিদের ভয়াবহ দুর্ভোগ, ইউক্রেনসহ বিভিন্ন অঞ্চলের সংঘাত, জলবায়ু সংকট, ক্রমবর্ধমান বৈষম্য এবং আন্তর্জাতিক আইন উপেক্ষার প্রবণতা নিয়ে গভীর উদ্বেগ জানিয়েছেন জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস।
মঙ্গলবার (২২ সেপ্টেম্বর) নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের উচ্চপর্যায়ের সাধারণ বিতর্কের উদ্বোধনী ভাষণে তিনি বিশ্বনেতাদের সামনে এসব সংকট তুলে ধরেন। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, এবারের সাধারণ বিতর্ক ২২ থেকে ২৮ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত চলবে। অধিবেশনের মূল প্রতিপাদ্য ‘আস্থা পুনরুদ্ধার, রূপান্তর ব্যবস্থাপনা: সবার জন্য কার্যকর জাতিসংঘ’।
মহাসচিব হিসেবে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের উচ্চপর্যায়ের সপ্তাহে এটি গুতেরেসের শেষ দিকের গুরুত্বপূর্ণ ভাষণগুলোর একটি। তাঁর দ্বিতীয় মেয়াদ ২০২৬ সালের শেষ দিকে শেষ হওয়ার কথা। চলতি বছরের শুরুতেই তিনি জানিয়েছিলেন, শেষ বছরেও জাতিসংঘ সনদ, আন্তর্জাতিক আইন, মানবাধিকার এবং বহুপাক্ষিক সহযোগিতার পক্ষে কাজ চালিয়ে যাবেন।
ভাষণে মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতিকে বিশেষ গুরুত্ব দেন গুতেরেস। তিনি বলেন, অঞ্চলটিতে একের পর এক সংঘাত ছড়িয়ে পড়ছে এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সংলাপ ও উত্তেজনা প্রশমনের উদ্যোগ জরুরি। একই সঙ্গে যুদ্ধ বন্ধ এবং বাধাহীনভাবে মানবিক সহায়তা পৌঁছানোর প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেন তিনি।
গাজার পরিস্থিতি তুলে ধরে গুতেরেস ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের হামলার নিন্দা পুনর্ব্যক্ত করেন। একই সঙ্গে এরপর গাজায় ফিলিস্তিনিদের ওপর যে মাত্রার সামরিক অভিযান ও দুর্ভোগ নেমে এসেছে, তার তীব্র সমালোচনা করেন। পশ্চিম তীরে সহিংসতা, বাস্তুচ্যুতি এবং বসতি সম্প্রসারণও শান্তির পথকে আরও কঠিন করে তুলছে বলে সতর্ক করেন তিনি। দ্বিরাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের সম্ভাবনা হারিয়ে যেতে দেওয়া যাবে না বলেও জোর দেন মহাসচিব।
গুতেরেসের বক্তব্যের অন্যতম কেন্দ্রীয় বিষয় ছিল আন্তর্জাতিক আইন ও জবাবদিহি। তাঁর বার্তা—বিশ্বের ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে মানবজাতি কীভাবে ক্ষমতাকে নিয়ন্ত্রণ করে এবং আইনের শাসনকে সমুন্নত রাখে তার ওপর। দায়মুক্তি স্বাভাবিক হয়ে যাওয়ার আগেই আইন প্রতিষ্ঠা এবং প্রজন্মের পর প্রজন্ম যুদ্ধের মধ্যে হারিয়ে যাওয়ার আগেই সংঘাত বন্ধ করার আহ্বান জানান তিনি।
জলবায়ু সংকট নিয়েও বিশ্বনেতাদের সতর্ক করেন জাতিসংঘ মহাসচিব। জলবায়ুর বিপজ্জনক সীমা অতিক্রম করার আগেই কার্যকর পদক্ষেপ দ্রুততর করার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন তিনি। জাতিসংঘের ৮১তম অধিবেশনেও জলবায়ু পরিবর্তন, জীববৈচিত্র্যের ক্ষতি ও পরিবেশগত অবক্ষয়কে শান্তি, নিরাপত্তা ও উন্নয়নের জন্য বড় হুমকি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত বিকাশও তাঁর বক্তব্যে জায়গা পায়। প্রযুক্তি যেন মানুষের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে না যায়, সে জন্য আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কার্যকর শাসনব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন গুতেরেস। এবারের সাধারণ পরিষদেও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সুযোগের পাশাপাশি বৈষম্য, নজরদারি, পক্ষপাত এবং অপব্যবহারের ঝুঁকি নিয়ে আলোচনা হচ্ছে।
বিশ্বব্যাপী বৈষম্য ও বিভাজন বৃদ্ধির বিষয়েও সতর্ক করেন গুতেরেস। তাঁর মতে, বৈষম্য এমন পর্যায়ে পৌঁছানোর আগেই ব্যবস্থা নিতে হবে, যাতে সমাজের সংহতি ভেঙে না পড়ে। জাতিসংঘকে দুর্বল করার পরিবর্তে বর্তমান বিশ্বের সংকট মোকাবিলার উপযোগী আরও কার্যকর ও শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তোলার আহ্বান জানান তিনি।
নিজের প্রায় এক দশকের অভিজ্ঞতার প্রসঙ্গ টেনে গুতেরেস বিশ্বনেতাদের উদ্দেশে এমন একটি ভবিষ্যৎ নির্মাণের আহ্বান জানান, যেখানে শক্তির অর্থ আধিপত্য নয়; বরং সবার জন্য কার্যকর ভবিষ্যৎ গড়ে তোলার সামর্থ্য। মহাসচিবের দায়িত্ব ছাড়ার পরও জাতিসংঘ সনদের মূল্যবোধের পক্ষে কথা বলে যাওয়ার অঙ্গীকার করেন তিনি।
গুতেরেসের এই ভাষণ এমন সময়ে এলো, যখন গাজা, ইউক্রেন, সুদানসহ বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে সংঘাত চলছে এবং জলবায়ু পরিবর্তন, অর্থনৈতিক চাপ ও প্রযুক্তিগত পরিবর্তন আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার সামনে নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। এসব সংকটের মুখে তাঁর মূল বার্তা ছিল—শুধু সামরিক, অর্থনৈতিক কিংবা প্রযুক্তিগত ক্ষমতার ওপর নির্ভর করে টেকসই শান্তি প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়; আন্তর্জাতিক আইন, সহযোগিতা ও জবাবদিহিকে কার্যকর করতে হবে।