যুক্তরাষ্ট্রে ডিজেল সংকট তীব্র, সারাদেশে সরবরাহ নিয়ে বাড়ছে উদ্বেগ!

যুক্তরাষ্ট্রে ডিজেলের দাম ও সরবরাহ চাপ বাড়লেও তিন রাজ্যজুড়ে সর্বাত্মক সংকটের দাবি এখনো পুরোপুরি নিশ্চিত হয়নি, বলছে যাচাই করা তথ্য।

যুক্তরাষ্ট্রে ডিজেল সংকট তীব্র, সারাদেশে সরবরাহ নিয়ে বাড়ছে উদ্বেগ!

যুক্তরাষ্ট্রে ডিজেল সংকট তীব্র, সারাদেশে সরবরাহ নিয়ে বাড়ছে উদ্বেগ!


যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি বাজারে ডিজেল ও পেট্রলের মূল্যবৃদ্ধি এবং সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর বাড়তে থাকা চাপ নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া এক দাবিতে বলা হয়েছে, ক্যালিফোর্নিয়া, ফ্লোরিডা ও টেক্সাসে ভয়াবহ ডিজেল সংকট দেখা দিয়েছে এবং এসব অঙ্গরাজ্যে জ্বালানি সরবরাহ দ্রুত অবনতির দিকে যাচ্ছে। তবে বিভিন্ন সাম্প্রতিক তথ্য ও প্রতিবেদন যাচাই করে দেখা যাচ্ছে, দাবিটির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ বাস্তব পরিস্থিতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হলেও তিনটি রাজ্যজুড়ে সর্বাত্মক ডিজেল ঘাটতির দাবি এখনো প্রমাণিত নয়।

সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্রে ডিজেলের দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে। আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা, অপরিশোধিত তেলের উচ্চমূল্য, শোধনাগারগুলোর ওপর চাপ এবং পরিশোধিত জ্বালানির সরবরাহ সংকোচনের কারণে দেশটির ডিজেল বাজারে পরিস্থিতি কঠিন হয়ে উঠেছে। রয়টার্সের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে যুক্তরাষ্ট্রের গড় ডিজেল মূল্য প্রতি গ্যালনে ৬ ডলারের ওপরে উঠে যাওয়ার কথা জানানো হয়েছে, যা এক বছর আগের তুলনায় উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি।

ডিজেল যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতির জন্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। দেশটির পণ্য পরিবহনের বড় অংশ ট্রাকের মাধ্যমে সম্পন্ন হয় এবং এসব ভারী যানবাহনের অধিকাংশই ডিজেলচালিত। কৃষি যন্ত্রপাতি, নির্মাণ সরঞ্জাম, জেনারেটর এবং বিভিন্ন শিল্পকারখানার ক্ষেত্রেও ডিজেলের ব্যবহার ব্যাপক। ফলে ডিজেলের দাম বাড়লে শুধু গাড়িচালকরাই ক্ষতিগ্রস্ত হন না, বরং পুরো সরবরাহ ব্যবস্থার ব্যয় বেড়ে যায়।

ক্যালিফোর্নিয়ায় জ্বালানি মূল্যের চাপ বিশেষভাবে দৃশ্যমান। লস অ্যাঞ্জেলেস অঞ্চলের কিছু স্টেশনে ডিজেলের দাম ৭ ডলারের কাছাকাছি বা তারও ওপরে ওঠার ছবি ও প্রতিবেদন সামনে এসেছে। ক্যালিফোর্নিয়ার জ্বালানি বাজার অন্যান্য অঙ্গরাজ্যের তুলনায় বেশ কিছু কাঠামোগত কারণে আলাদা। কঠোর পরিবেশগত মানদণ্ড, স্থানীয় পরিশোধন সক্ষমতা এবং পশ্চিম উপকূলের তুলনামূলক বিচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা বাজারে অস্থিরতা তৈরি হলে তার প্রভাব দ্রুত দেখা দিতে পারে।

টেক্সাসের ক্ষেত্রেও জ্বালানি বাজারে চাপ রয়েছে। দেশটির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তেল উৎপাদন ও পরিশোধন কেন্দ্রগুলোর একটি হওয়া সত্ত্বেও আন্তর্জাতিক বাজারের সংকট থেকে টেক্সাস পুরোপুরি সুরক্ষিত নয়। বিভিন্ন স্থানে ডিজেলের মূল্য উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে এবং কিছু স্টেশনে সাময়িক সরবরাহ সমস্যার খবর পাওয়া গেছে। তবে এর অর্থ এই নয় যে পুরো টেক্সাস অঙ্গরাজ্যে ডিজেল পাওয়া যাচ্ছে না।

ফ্লোরিডার অবস্থাও নজরে রয়েছে। অঙ্গরাজ্যটি তার জ্বালানি চাহিদার একটি বড় অংশ বাইরের সরবরাহের ওপর নির্ভর করে। ফলে সমুদ্রপথে জ্বালানি পরিবহন, আঞ্চলিক সরবরাহ ব্যবস্থা কিংবা পরিশোধিত জ্বালানির বাজারে বড় ধরনের বিঘ্ন তৈরি হলে ফ্লোরিডার ওপর তার প্রভাব পড়তে পারে। কিন্তু বর্তমানে পুরো ফ্লোরিডাজুড়ে ব্যাপক ডিজেল ঘাটতি তৈরি হয়েছে এমন নির্ভরযোগ্য প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

বর্তমান পরিস্থিতির পেছনে সবচেয়ে বড় কারণগুলোর একটি হলো আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত, গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথে নিরাপত্তা ঝুঁকি এবং আন্তর্জাতিক তেল সরবরাহ ব্যবস্থায় অনিশ্চয়তা বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত ও পরিশোধিত জ্বালানির দাম বাড়িয়েছে। একই সঙ্গে রাশিয়ার জ্বালানি অবকাঠামোর ওপর হামলা এবং কিছু শোধনাগারের উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার ঘটনাও বিশ্বব্যাপী ডিজেল সরবরাহে চাপ বাড়িয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বাজারেও মজুত পরিস্থিতি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ডিজেলের মজুত কমে গেলে সরবরাহ ব্যবস্থায় সামান্য বিঘ্নও স্থানীয় বাজারে বড় ধরনের মূল্যবৃদ্ধি তৈরি করতে পারে। কোনো কোনো এলাকায় স্টেশনে জ্বালানি সাময়িকভাবে শেষ হয়ে যাওয়ার ঘটনা ঘটতে পারে, যদিও সেটিকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে রাজ্যব্যাপী সংকট হিসেবে বিবেচনা করা যায় না।

সরবরাহ পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে যুক্তরাষ্ট্র সরকারও পদক্ষেপ নিয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে জ্বালানি পরিবহনকারী ট্রাকচালকদের কর্মঘণ্টা সংক্রান্ত কিছু বিধিনিষেধ সাময়িকভাবে শিথিল করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর উদ্দেশ্য হলো দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে জ্বালানি দ্রুত পরিবহন করা এবং সরবরাহ ব্যবস্থায় সম্ভাব্য বাধা কমানো।

ডিজেলের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব ইতোমধ্যে অর্থনীতির বিভিন্ন অংশে ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি করেছে। ট্রাকিং কোম্পানিগুলোর পরিচালন ব্যয় বাড়লে পরিবহন খরচ বাড়বে। সেই বাড়তি ব্যয় শেষ পর্যন্ত খাদ্য, পোশাক, নির্মাণসামগ্রী এবং অন্যান্য ভোগ্যপণ্যের দামে যুক্ত হতে পারে। কৃষকদের ক্ষেত্রেও ডিজেলের উচ্চমূল্য উৎপাদন ব্যয় বাড়িয়ে দিতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের জন্য সবচেয়ে বড় উদ্বেগ হলো পরিস্থিতি কতদিন স্থায়ী হয়। জ্বালানির দাম দ্রুত কমে না এলে পরিবহন ও কৃষি খাতের ওপর দীর্ঘমেয়াদি চাপ তৈরি হতে পারে। অন্যদিকে আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহ পরিস্থিতি উন্নত হলে এবং শোধনাগারগুলো স্বাভাবিক উৎপাদনে ফিরলে বাজারের চাপ কিছুটা কমে আসতে পারে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারিত দাবিটির শেষ অংশ “একজন পাগলের ভুলের জন্য সাধারণ মানুষ মূল্য দিচ্ছে” মূলত রাজনৈতিক মন্তব্য। এটিকে তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত হিসেবে উপস্থাপন করা ঠিক হবে না। বর্তমান জ্বালানি পরিস্থিতির পেছনে একক কোনো ব্যক্তির সিদ্ধান্তের বদলে আন্তর্জাতিক সংঘাত, তেলের বাজার, শোধনাগারের সক্ষমতা, জ্বালানি মজুত, পরিবহন ব্যবস্থা এবং বৈশ্বিক সরবরাহ চেইনের মতো একাধিক কারণ কাজ করছে।

যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানি বাজারের পরিস্থিতি নিঃসন্দেহে চাপের মধ্যে রয়েছে এবং ডিজেলের মূল্যবৃদ্ধি বাস্তব। কিছু এলাকায় সরবরাহ সংকটও দেখা দিতে পারে। তবে ক্যালিফোর্নিয়া, ফ্লোরিডা ও টেক্সাস তিন অঙ্গরাজ্যজুড়ে একই সঙ্গে সর্বাত্মক ডিজেল সংকট চলছে এমন দাবি বর্তমানে অতিরঞ্জিত। পরিস্থিতি আরও খারাপ হলে স্থানীয় ঘাটতি বৃহত্তর সরবরাহ সংকটে রূপ নিতে পারে, আর সে ক্ষেত্রে এর প্রভাব সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রের পরিবহন, কৃষি ও ভোক্তা বাজারে পড়বে।

সিএসবি নিউজ-এর আরও খবর