রাশিয়ার নির্বাচনে যুদ্ধবিরোধী কণ্ঠ নেই, রাজনৈতিক মাঠে বাড়ছে প্রশ্ন
ইউক্রেন যুদ্ধের মধ্যেই রাশিয়ায় শুরু হয়েছে পার্লামেন্ট নির্বাচন। জাতীয় পর্যায়ে সরাসরি যুদ্ধবিরোধী বড় দলীয় প্ল্যাটফর্ম না থাকায় ভোটের রাজনীতিতে নতুন করে উঠেছে প্রশ্ন।
রাশিয়ার নির্বাচনে যুদ্ধবিরোধী কণ্ঠ নেই, রাজনৈতিক মাঠে বাড়ছে প্রশ্ন
রাশিয়ায় শুরু হয়েছে তিন দিনের পার্লামেন্ট নির্বাচন। ১৮ সেপ্টেম্বর থেকে শুরু হওয়া এই ভোট চলবে ২০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত। ২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার সামরিক অভিযান শুরুর পর এটিই দেশটির প্রথম জাতীয় পার্লামেন্ট নির্বাচন। ফলে এবারের নির্বাচনকে শুধু নতুন আইনপ্রণেতা নির্বাচনের প্রক্রিয়া হিসেবে নয়, যুদ্ধের মধ্যে রাশিয়ার রাজনৈতিক পরিবেশ ও বিরোধী মতের অবস্থান বোঝার গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হিসেবেও দেখা হচ্ছে।
এবার রাশিয়ার ৪৫০ সদস্যের স্টেট ডুমার সব আসনের জন্য ভোট হচ্ছে। এর মধ্যে ২২৫টি আসন দলীয় তালিকার মাধ্যমে এবং বাকি ২২৫টি একক আসনে প্রার্থীদের মাধ্যমে নির্বাচিত হবে। প্রায় ১১ কোটি ১০ লাখ ভোটার এই নির্বাচনে ভোট দেওয়ার যোগ্য। মোট ১১টি রাজনৈতিক দল নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে। দলীয় তালিকার মাধ্যমে আসন পেতে একটি দলকে অন্তত ৫ শতাংশ ভোট পেতে হয়।
তবে এবারের নির্বাচনে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে যুদ্ধবিরোধী রাজনৈতিক অবস্থানের সীমিত হয়ে পড়ার বিষয়টি। রাশিয়ার দীর্ঘদিনের উদারপন্থী দল ইয়াব্লোকো ইউক্রেনে যুদ্ধের প্রকাশ্য বিরোধিতা করে আসছিল। দলটি যুদ্ধ বন্ধ, শান্তিপূর্ণ সমাধান এবং রাজনৈতিক ও নাগরিক স্বাধীনতার পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। কিন্তু আগস্টে রাশিয়ার সুপ্রিম কোর্ট দলটিকে জাতীয় দলীয় তালিকায় অংশ নেওয়ার সুযোগ থেকে বাদ দেয়। ফলে জাতীয় পর্যায়ে দলীয় প্রতীকে সরাসরি যুদ্ধবিরোধী অবস্থান তুলে ধরার একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম নির্বাচনে থাকছে না।
তবে এর অর্থ এই নয় যে রাশিয়ার নির্বাচনে কোনো যুদ্ধবিরোধী প্রার্থীই নেই। ইয়াব্লোকোর কিছু প্রার্থী একক আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। মস্কোর ইয়াব্লোকো প্রার্থী পলিনা লেরমান্টও নির্বাচনী প্রচারণায় শান্তির পক্ষে নিজের অবস্থান তুলে ধরেছেন। অর্থাৎ যুদ্ধবিরোধী কিছু ব্যক্তিগত রাজনৈতিক কণ্ঠ এখনও নির্বাচনী মাঠে রয়েছে, কিন্তু জাতীয় দলীয় তালিকায় ইয়াব্লোকোর অনুপস্থিতির কারণে তাদের রাজনৈতিক পরিসর অনেক সীমিত।
আল জাজিরার প্রতিবেদনে রাশিয়ার একজন ভোটারের বক্তব্যও উঠে এসেছে, যেখানে তিনি বলেন, বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে কোনো দলই কার্যকরভাবে যুদ্ধবিরোধী অবস্থান নিতে পারছে না। এই বক্তব্য থেকেই প্রতিবেদনের ‘কোনো দলই যুদ্ধবিরোধী হতে পারছে না’—এমন শিরোনামের প্রেক্ষাপট তৈরি হয়েছে। তবে এটিকে রাশিয়ার প্রতিটি রাজনৈতিক দলের আনুষ্ঠানিক অবস্থান হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বরং এটি নির্বাচনে যুদ্ধবিরোধী রাজনীতির সীমিত উপস্থিতি বোঝাতে ব্যবহৃত একটি পর্যবেক্ষণ।
বর্তমান নির্বাচনে ক্ষমতাসীন ইউনাইটেড রাশিয়া ছাড়াও কমিউনিস্ট পার্টি, লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি, এ জাস্ট রাশিয়া—ফর ট্রুথ এবং নিউ পিপলসহ কয়েকটি দল প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে। এসব দলের মধ্যে ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন রাজনৈতিক অবস্থান থাকলেও ইয়াব্লোকোর মতো সরাসরি যুদ্ধবিরোধী অবস্থান জাতীয় নির্বাচনে খুব একটা দৃশ্যমান নয়। ফলে যুদ্ধ বন্ধের দাবিকে কেন্দ্র করে ভোট দেওয়ার ক্ষেত্রে রুশ ভোটারদের সামনে রাজনৈতিক বিকল্প সীমিত হয়েছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
নির্বাচনের পরিবেশ নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়েও প্রশ্ন রয়েছে। ইউরোপের নিরাপত্তা ও সহযোগিতা সংস্থা ওএসসিই জানিয়েছে, রাশিয়া এবারের পার্লামেন্ট নির্বাচনে তাদের নির্বাচন পর্যবেক্ষকদের আমন্ত্রণ জানায়নি। সংস্থাটির মতে, স্বাধীন আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক না থাকায় নির্বাচনী প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও জনআস্থা মূল্যায়নের সুযোগ সীমিত হয়েছে। রাশিয়ার রাজনৈতিক পরিবেশে মতপ্রকাশ, গণমাধ্যম ও রাজনৈতিক অংশগ্রহণের ওপর বিভিন্ন বিধিনিষেধ নিয়েও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে উদ্বেগ রয়েছে।
এবারের নির্বাচনে ইউক্রেনের রুশ-নিয়ন্ত্রিত কিছু এলাকাতেও ভোট আয়োজন করা হয়েছে। রাশিয়া এসব অঞ্চলে নিজেদের নির্বাচনী ব্যবস্থা প্রয়োগ করলেও ইউক্রেন ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের বড় অংশ এসব এলাকাকে ইউক্রেনের ভূখণ্ড হিসেবে বিবেচনা করে। ওএসসিই জানিয়েছে, আন্তর্জাতিক আইনের দৃষ্টিতে এসব এলাকায় রাশিয়ার আয়োজন করা নির্বাচনের ফল বৈধতা পাবে না।
রাশিয়ার সাধারণ ভোটারদের মধ্যেও যুদ্ধ নিয়ে একক মত নেই। কেউ কেউ ইউক্রেন যুদ্ধের অবসান চান, আবার অনেকে সরকারের সামরিক নীতিকে সমর্থন করেন। যুদ্ধের পাশাপাশি অর্থনীতি, নিরাপত্তা, সামাজিক পরিস্থিতি এবং দেশের ভবিষ্যৎও এবারের নির্বাচনে ভোটারদের বিবেচনার গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে।
রাশিয়ার এবারের পার্লামেন্ট নির্বাচন যুদ্ধের ছায়ায় অনুষ্ঠিত একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক নির্বাচন। ‘কোনো দলই যুদ্ধবিরোধী হতে পারছে না’—এই বক্তব্যটি আক্ষরিক অর্থে সব যুদ্ধবিরোধী প্রার্থী বা মতের অনুপস্থিতি বোঝায় না। বরং জাতীয় পর্যায়ের নির্বাচনে সরাসরি যুদ্ধবিরোধী একটি বড় দলীয় প্ল্যাটফর্মের অনুপস্থিতি এবং বিরোধী রাজনৈতিক পরিসর সংকুচিত হওয়ার বিষয়টিই এতে মূলত তুলে ধরা হয়েছে। ইউক্রেন যুদ্ধ চলাকালে এই নির্বাচন রাশিয়ার অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে বিরোধী মতের জায়গা ও রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে আন্তর্জাতিক মনোযোগ তৈরি করেছে।