ট্রাম্প–শি জিনপিংয়ের বৈঠকের আগে তাইওয়ানের শক্তি প্রদর্শন, প্রথমবার ড্রোন নিয়ে যৌথ মহড়া

ট্রাম্প–শি জিনপিংয়ের বৈঠকের কয়েক দিন আগে ক্ষেপণাস্ত্র ও একাধিক হামলাকারী ড্রোন নিয়ে বড় সামরিক মহড়া চালিয়েছে তাইওয়ান।

ট্রাম্প–শি জিনপিংয়ের বৈঠকের আগে তাইওয়ানের শক্তি প্রদর্শন, প্রথমবার ড্রোন নিয়ে যৌথ মহড়া

ট্রাম্প–শি জিনপিংয়ের বৈঠকের আগে তাইওয়ানের শক্তি প্রদর্শন, প্রথমবার ড্রোন নিয়ে যৌথ মহড়া


যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের বহুল আলোচিত বৈঠকের মাত্র কয়েক দিন আগে বড় ধরনের সামরিক মহড়া চালিয়েছে তাইওয়ান। শুক্রবারের এই মহড়ায় ক্ষেপণাস্ত্রের পাশাপাশি প্রথমবারের মতো একাধিক ধরনের হামলাকারী ড্রোনকে সমন্বিত যুদ্ধ মহড়ায় ব্যবহার করেছে দ্বীপটির সামরিক বাহিনী।

অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের (এপি) প্রতিবেদন অনুযায়ী, দক্ষিণ তাইওয়ানের পিংতুং কাউন্টিতে মহড়াটি অনুষ্ঠিত হয়। এতে বিভিন্ন ধরনের ড্রোনের পাশাপাশি আকাশ প্রতিরক্ষা, জাহাজবিধ্বংসী ও শত্রুর অবতরণ ঠেকানোর জন্য ব্যবহৃত ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ করা হয়। তাইওয়ানের সামরিক সক্ষমতা আধুনিকায়নের প্রচেষ্টার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রদর্শনী হিসেবে মহড়াটিকে তুলে ধরেছে তাইপে।

এই মহড়ার সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হচ্ছে আক্রমণাত্মক ড্রোনের ব্যবহার। এপি জানিয়েছে, তাইওয়ানের সামরিক বাহিনী প্রথমবারের মতো একাধিক ধরনের হামলাকারী ড্রোনকে অন্য প্রচলিত অস্ত্রের সঙ্গে সমন্বয় করে যৌথ যুদ্ধ মহড়ায় ব্যবহার করেছে। তবে ঠিক কোন ধরনের ড্রোন পরীক্ষায় অংশ নিয়েছে, তাইওয়ানের প্রেসিডেন্টের কার্যালয়ের বিবৃতিতে তার বিস্তারিত জানানো হয়নি।

তাইওয়ানের প্রেসিডেন্ট লাই চিং-তে বলেছেন, এই মহড়া দেশটির সেনাবাহিনীর আধুনিকায়নের অগ্রগতি তুলে ধরেছে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, প্রচলিত অস্ত্রের সঙ্গে মনুষ্যবিহীন যান সমন্বিতভাবে ব্যবহারের সক্ষমতা আধুনিক যুদ্ধের পরিবর্তিত বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

মহড়ার সময়টিও বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। আগামী ২৪ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্রে বৈঠকে বসার কথা প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের। গত মে মাসের পর এটিই হবে দুই নেতার প্রথম মুখোমুখি বৈঠক। এপি জানিয়েছে, আলোচনায় তাইওয়ান ইস্যুও থাকার কথা।

তাইওয়ানকে নিজেদের ভূখণ্ডের অংশ বলে দাবি করে চীন। প্রয়োজনে শক্তি প্রয়োগ করে দ্বীপটিকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে আনার সম্ভাবনাও বাদ দেয়নি বেইজিং। অন্যদিকে তাইওয়ান একটি স্বশাসিত গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা পরিচালনা করে। এই বিরোধ বহু বছর ধরেই যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের সম্পর্কের অন্যতম সংবেদনশীল বিষয়।

এপির প্রতিবেদন অনুযায়ী, বেইজিং ট্রাম্প প্রশাসনের ওপর তাইওয়ানের স্বাধীনতার বিরোধিতায় আরও কঠোর অবস্থান নেওয়ার জন্য চাপ সৃষ্টি করেছে। ফলে আসন্ন ট্রাম্প–শি বৈঠকে তাইওয়ান প্রশ্নে দুই পক্ষ কী অবস্থান নেয়, সেটি আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের নজরে থাকবে।

তাইওয়ানের প্রতিরক্ষা সক্ষমতার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কও গুরুত্বপূর্ণ। যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব আইনের অধীনে তাইওয়ানকে আত্মরক্ষার প্রয়োজনীয় উপকরণ সরবরাহের ব্যবস্থা রয়েছে এবং দ্বীপটি দীর্ঘদিন ধরেই মার্কিন অস্ত্র ও সামরিক সরঞ্জামের ওপর নির্ভর করে আসছে।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তাইওয়ান তার সামরিক ব্যয়ও বাড়িয়েছে। চীনের ক্রমবর্ধমান সামরিক চাপের মধ্যে ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন এবং অন্যান্য আধুনিক প্রতিরক্ষা প্রযুক্তির ওপর গুরুত্ব বাড়িয়েছে তাইপে।

যুক্তরাষ্ট্রের তাইওয়ানে অস্ত্র বিক্রির বিষয়টিও ট্রাম্প–শি আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এপি জানিয়েছে, গত মে মাসে ট্রাম্প ও শির আগের বৈঠকের পর তাইওয়ানের জন্য পরিকল্পিত প্রায় ১৪ বিলিয়ন ডলারের একটি মার্কিন অস্ত্র প্যাকেজ স্থগিত করেছিলেন ট্রাম্প। ওই সিদ্ধান্তের পর তাইওয়ানের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিশ্রুতি নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছিল। ট্রাম্প তাইওয়ানের কাছে অস্ত্র বিক্রির বিষয়টিকে চীনের সঙ্গে আলোচনায় একটি দর-কষাকষির উপাদান হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন।

তবে শুক্রবারের মহড়াতেই সামরিক কার্যক্রম শেষ হচ্ছে না। এপি জানিয়েছে, আগামী সপ্তাহেও তাইওয়ানের সেনাবাহিনী আরও মহড়া চালাবে। সেখানে নতুন কেনা যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি হাই মোবিলিটি আর্টিলারি রকেট সিস্টেম—হিমার্স এবং স্টিঙ্গার ক্ষেপণাস্ত্রের সিমুলেটরসহ বিভিন্ন সামরিক সরঞ্জাম ব্যবহারের পরিকল্পনা রয়েছে।

হিমার্স সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিশেষভাবে আলোচনায় এসেছে। দূরপাল্লায় নির্ভুলভাবে লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানার সক্ষমতার কারণে আধুনিক যুদ্ধে এই রকেট ব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তাইওয়ানের সামরিক বাহিনীতে এ ধরনের মার্কিন অস্ত্র যুক্ত হওয়া দ্বীপটির প্রতিরক্ষা আধুনিকায়নের অংশ।

এদিকে তাইওয়ানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের অবস্থানের পার্থক্য এখনও গভীর। ওয়াশিংটন আনুষ্ঠানিকভাবে বেইজিংয়ের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক বজায় রাখলেও তাইওয়ানের আত্মরক্ষার সক্ষমতা বজায় রাখতে অস্ত্র সরবরাহ করে আসছে। অন্যদিকে বেইজিং যুক্তরাষ্ট্রের তাইওয়ান অস্ত্র বিক্রির নিয়মিত বিরোধিতা করে।

এমন পরিস্থিতিতে ২৪ সেপ্টেম্বরের ট্রাম্প–শি বৈঠকের ঠিক আগে তাইওয়ানের এই সামরিক মহড়া আঞ্চলিক নিরাপত্তার আলোচনায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে। তবে মহড়াটি আসন্ন বৈঠককে লক্ষ্য করেই আয়োজন করা হয়েছে—এমন দাবি এপি করেনি। নিশ্চিতভাবে বলা যায়, বৈঠকের কয়েক দিন আগে এটি অনুষ্ঠিত হয়েছে এবং সেখানে তাইওয়ান প্রথমবার একাধিক ধরনের হামলাকারী ড্রোন নিয়ে সমন্বিত যুদ্ধ মহড়া করেছে।

এখন নজর থাকবে ট্রাম্প ও শি জিনপিংয়ের বৈঠকের দিকে। বিশেষ করে তাইওয়ানের নিরাপত্তা, মার্কিন অস্ত্র বিক্রি এবং যুক্তরাষ্ট্র–চীন সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নিয়ে দুই নেতা কী আলোচনা করেন, সেটিই আন্তর্জাতিক রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে।

সিএসবি নিউজ-এর আরও খবর