স্যাটেলাইট ছবিতে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় দ্রুত পুনর্নির্মাণ, বাড়ছে আন্তর্জাতিক উদ্বেগ
তেহরানের দক্ষিণ-পূর্বে পারচিন সামরিক কমপ্লেক্সের তালেঘান-২ স্থাপনায় ইরান দ্রুত পুনর্নির্মাণ ও নিরাপত্তা জোরদারের কাজ চালাচ্ছে বলে নতুন স্যাটেলাইট চিত্রে দেখা গেছে।স্থাপনাটি অতীতে ইরানের পারমাণবিক অস্ত্র-সম্পর্কিত গবেষণার সঙ্গে যুক্ত ছিল বলে আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে।
স্যাটেলাইট ছবিতে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় দ্রুত পুনর্নির্মাণ, বাড়ছে আন্তর্জাতিক উদ্বেগ
ওয়াশিংটনভিত্তিক ইনস্টিটিউট ফর সায়েন্স অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল সিকিউরিটির বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ১৩ সেপ্টেম্বর ধারণ করা স্যাটেলাইট ছবিতে তালেঘান-২ এলাকায় ব্যাপক নির্মাণ তৎপরতা দেখা যায়। নির্মাণস্থলে মাটি বহনকারী ট্রাক, বুলডোজার, কংক্রিট পাম্প, কংক্রিট মেশানোর যন্ত্র ও ক্রেনসহ বিভিন্ন ভারী যন্ত্রপাতি সক্রিয় রয়েছে।
তালেঘান-২ পারচিন সামরিক কমপ্লেক্সের ভেতরে, তেহরান থেকে প্রায় ৩০ কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্বে অবস্থিত। সাম্প্রতিক ছবিতে ক্ষতিগ্রস্ত শক্তিশালী ভূগর্ভস্থ স্থাপনার ওপর একটি বড় আবরণ বা ত্রিপল বসানো হয়েছে। গবেষকদের ধারণা, এর ফলে নিচে চলমান পুনর্নির্মাণের কিছু অংশ স্যাটেলাইট বা আকাশপথের নজরদারি থেকে আড়াল রাখা সম্ভব হচ্ছে।
ছবিতে স্থাপনার একটি অংশে নতুন কংক্রিটের শক্তিশালী আবরণও দেখা গেছে। ইনস্টিটিউট ফর সায়েন্স অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল সিকিউরিটির মতে, এই অতিরিক্ত কংক্রিট কাঠামো সম্ভাব্য বিমান হামলার বিরুদ্ধে স্থাপনাটিকে আরও সুরক্ষিত করতে পারে।
তালেঘান-২ নিয়ে উদ্বেগ অবশ্য নতুন নয়। ২০২৬ সালের জুন ও জুলাইয়ের স্যাটেলাইট ছবিতেও সেখানে মেরামত ও পুনর্গঠনের প্রমাণ পাওয়া যায়। ওই সময় স্থাপনার ওপর হামলায় তৈরি কয়েকটি গর্ত সাময়িকভাবে ঢেকে দেওয়া এবং পরে স্থায়ীভাবে কংক্রিট দিয়ে বন্ধ করার প্রস্তুতি দেখা যায়। স্থাপনার দক্ষিণ-পূর্ব অংশে নতুন কংক্রিট ঢেলে শক্তিশালী করার কাজও শনাক্ত করা হয়েছিল।
এর আগে ২০২৫ সালের শেষ দিকেও তালেঘান-২ এলাকায় বড় ধরনের নির্মাণকাজের ছবি প্রকাশিত হয়। গবেষকদের বিশ্লেষণে সেখানে একটি দীর্ঘ ধাতব কাঠামো এবং নলাকার একটি কক্ষের মতো অংশ শনাক্ত করা হয়েছিল, যেটিকে সম্ভাব্য উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন বিস্ফোরক পরীক্ষার চেম্বার হিসেবে বিবেচনা করা হয়। পরবর্তী সময়ে ওই স্থাপনার চারপাশে মোটা কংক্রিটের আবরণ তৈরির কাজ শুরু হয়।
স্থাপনাটির ইতিহাসই বর্তমান তৎপরতাকে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে। আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোর তথ্য অনুযায়ী, দুই দশকেরও বেশি আগে ইরানের কথিত আমাদ কর্মসূচির সময় তালেঘান এলাকায় এমন কিছু পরীক্ষা চালানো হয়েছিল, যা পারমাণবিক অস্ত্রের বিস্ফোরণ-সংক্রান্ত গবেষণার সঙ্গে প্রাসঙ্গিক হতে পারে।
তবে বর্তমান নির্মাণকাজকে সরাসরি পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির প্রমাণ হিসেবে দেখার ক্ষেত্রে সতর্কতা প্রয়োজন। স্যাটেলাইট ছবিতে নির্মাণ, মেরামত ও প্রতিরক্ষামূলক কাঠামো স্পষ্ট হলেও স্থাপনার ভেতরে বর্তমানে ঠিক কী ধরনের কার্যক্রম চলছে, তা এসব ছবি দিয়ে নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। ইনস্টিটিউট ফর সায়েন্স অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল সিকিউরিটিও জানিয়েছে, স্থাপনাটি পুনর্নির্মাণের উদ্দেশ্য নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন এখনো রয়েছে।
তালেঘান-২ ২০২৬ সালে একাধিকবার হামলার শিকার হয়েছে। গবেষণা প্রতিষ্ঠানটির তথ্য অনুযায়ী, মার্চে স্থাপনাটিতে হামলার পর সেখানে তিনটি বড় আঘাতের চিহ্ন দেখা যায়। এরপর ইরান ধ্বংসাবশেষ সরানো, ক্ষতিগ্রস্ত অংশ ঢেকে দেওয়া এবং কংক্রিট দিয়ে স্থাপনাটি আবার শক্তিশালী করার কাজ শুরু করে।
জুলাইয়ের শুরুতে প্রকাশিত স্যাটেলাইট বিশ্লেষণে দেখা যায়, হামলার ফলে তৈরি গর্তগুলোর ওপর স্থায়ী কংক্রিটের ঢাকনা তৈরির প্রস্তুতি চলছে। একটি ক্রেন ওই এলাকায় কাজ করছিল এবং ভবিষ্যতে পুরো অংশটি মাটি দিয়ে আবার ঢেকে ফেলার সম্ভাবনাও গবেষণায় উল্লেখ করা হয়।
সেপ্টেম্বরের নতুন ছবিতে দেখা যাচ্ছে, পুনর্নির্মাণের কাজ আরও বিস্তৃত হয়েছে। শুধু ক্ষতিগ্রস্ত অংশ মেরামত নয়, স্থাপনাটির চারপাশে অতিরিক্ত কংক্রিটের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাও তৈরি করা হচ্ছে। এতে বোঝা যায়, ইরান তালেঘান-২কে পুনরায় কার্যকর বা ব্যবহারযোগ্য করার জন্য দীর্ঘমেয়াদি অবকাঠামোগত কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। তবে এর নির্দিষ্ট ভবিষ্যৎ ব্যবহার এখনো প্রকাশ্যে নিশ্চিত হয়নি।
এই তৎপরতা এমন এক সময়ে সামনে এসেছে, যখন ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার সঙ্গে তেহরানের সম্পর্কও চাপের মধ্যে রয়েছে। সেপ্টেম্বরের ১০ তারিখে আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার পরিচালনা পর্ষদ ইরানের পারমাণবিক বাধ্যবাধকতা পূরণ না করার বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে একটি প্রস্তাব গ্রহণ করে। সংস্থাটি বলেছে, গুরুত্বপূর্ণ কিছু স্থাপনা ও পূর্বে ঘোষিত পারমাণবিক উপাদান সম্পর্কে পর্যাপ্ত যাচাইযোগ্য তথ্য ও প্রবেশাধিকার না থাকায় উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
ইরান অবশ্য দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছে, তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি শান্তিপূর্ণ এবং তারা পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির চেষ্টা করছে না। অন্যদিকে পশ্চিমা দেশগুলো ও আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের একটি অংশ ইরানের অতীত কর্মকাণ্ড এবং বর্তমান পরিদর্শন-সংক্রান্ত সীমাবদ্ধতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছে।
সাম্প্রতিক স্যাটেলাইট চিত্রের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, তালেঘান-২ ছাড়াও ইরানের বিভিন্ন সংবেদনশীল পারমাণবিক স্থাপনায় নির্মাণ ও সুরক্ষা জোরদারের তৎপরতা নিয়ে ধারাবাহিক প্রতিবেদন প্রকাশিত হচ্ছে। ইনস্টিটিউট ফর সায়েন্স অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল সিকিউরিটির সেপ্টেম্বরের তালিকায় ইরানের বিভিন্ন পারমাণবিক স্থাপনা নিয়ে একাধিক নতুন স্যাটেলাইট বিশ্লেষণও রয়েছে।