আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার তৈরি অপপ্রচারে দুদকের নতুন নাটকের পর্দা উন্মোচন

আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে গত জানুয়ারিতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তৈরি ভিত্তিহীন অপপ্রচারের নথি নতুন করে প্রকাশ করল দুর্নীতি দমন কমিশন।

আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার তৈরি অপপ্রচারে দুদকের নতুন নাটকের পর্দা উন্মোচন

আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার তৈরি অপপ্রচারে দুদকের নতুন নাটকের পর্দা উন্মোচন


সাবেক অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার বিরুদ্ধে ১১ হাজার কোটি টাকা বিদেশে পাচারের অভিযোগ নিয়ে দেশজুড়ে তীব্র আলোড়ন ও আলোচনার সৃষ্টি হয়েছে। দুর্নীতি দমন কমিশন গত ১৩ সেপ্টেম্বর এক সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে জানায় যে, তাদের কাছে সাবেক এই উপদেষ্টার বিরুদ্ধে সুইজারল্যান্ড, দুবাই, সিঙ্গাপুর ও অস্ট্রেলিয়াসহ বিভিন্ন দেশে বিপুল অঙ্কের অর্থ পাচারের একটি নতুন লিখিত অভিযোগ এসেছে। তবে গভীর অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে যে, যে অভিযোগটিকে কেন্দ্র করে গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে, তার মূল উৎস মূলত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তি ব্যবহার করে তৈরি করা একটি ভিত্তিহীন রাজনৈতিক অপপ্রচার। প্রায় সাত মাস আগে একটি উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ফেসবুক পেজে প্রকাশিত ভুয়া প্রতিবেদনের সাথে দুদকের সাম্প্রতিক হাতে পাওয়া অভিযোগটির হুবহু মিল পাওয়া গেছে।


দেশের শীর্ষস্থানীয় তথ্য যাচাইকারী সংস্থা রিউমর স্ক্যানারের দীর্ঘ বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ১১ হাজার কোটি টাকা পাচারের এই সুনির্দিষ্ট দাবিটি প্রথম প্রচার করা হয় গত জানুয়ারি মাসে। তৎকালীন সময় 'দৈনিক আজকের কণ্ঠ' নামক একটি ফেসবুক পেজ থেকে একটি বিস্তারিত পোস্ট দেওয়া হয়, যেখানে দাবি করা হয়েছিল যে আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া দুবাইয়ে চার হাজার ৫০০ কোটি টাকা, সিঙ্গাপুরে তিন হাজার কোটি টাকা, অস্ট্রেলিয়ায় দুই হাজার কোটি টাকা এবং সুইজারল্যান্ডে এক হাজার ৫০০ কোটি টাকা পাচার করেছেন। একই সাথে দেশের বিভিন্ন এলাকায় শেখ রাসেল মিনি স্টেডিয়াম নির্মাণ প্রকল্পে প্রায় এক হাজার ২০০ কোটি টাকার ব্যয় বাড়িয়ে দুর্নীতির অভিযোগ তোলা হয়েছিল। পরবর্তীতে উন্নত এআই শনাক্তকরণ প্রযুক্তি ব্যবহার করে নিশ্চিত হওয়া যায় যে, ওই বিতর্কিত প্রতিবেদনটি পুরোপুরি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তৈরি করা হয়েছিল।


কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তির মাধ্যমে তৈরি করা যেকোনো প্রতিবেদনের কিছু নির্দিষ্ট ধরণ থাকে, যা সাধারণ অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা। 'দৈনিক আজকের কণ্ঠ' নামক পেজে প্রকাশিত প্রতিবেদনটিতে "মানিলন্ডারিং বোমা", "অফশোর সাম্রাজ্য", কিংবা "দুবাই সিন্ডিকেট"-এর মতো অতিরিক্ত নাটকীয় ও বিভ্রান্তিকর শব্দাবলী ব্যবহার করা হয়। কিন্তু কোনো ব্যাংক হিসাবের নম্বর, অর্থ লেনদেনের সরকারি বা বেসরকারি নথি, গোয়েন্দা তথ্য কিংবা নির্ভরযোগ্য কোনো সূত্রের উল্লেখ ছিল না। সুনির্দিষ্ট তথ্যপ্রমাণ ছাড়াই বিপুল পরিমাণ অর্থ পাচারের অবাস্তব দাবিগুলোকে সত্য হিসেবে উপস্থাপন করার কৌশলটি এআই দিয়ে তৈরি অপপ্রচারের অন্যতম লক্ষণ। গবেষণা বলছে, পেজটি বিগত কয়েক বছর ধরেই বিরোধী পক্ষ ও অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ধারাবাহিক তথ্যসন্ত্রাস ও ভুয়া সংবাদ ছড়িয়ে আসছিল, যা এর আগেও একাধিক তথ্য যাচাইকারী সংস্থা প্রমাণ করেছে।


সবচেয়ে আশ্চর্যজনক বিষয় হলো, সাত মাস আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারিত সেই এআই দিয়ে তৈরি ভুয়া রিপোর্টের প্রতিটি হিসাব, দেশের নাম এবং টাকার অঙ্ক হুবহু মিল রেখে সম্প্রতি দুদকে একটি নতুন অভিযোগ জমা পড়ে। আর সেই অভিযোগের ভিত্তিতেই দুদক সংবাদ সম্মেলন করে বিষয়টি প্রকাশ্যে আনে। দুদকের জনসংযোগ বিভাগের পক্ষ থেকে সংবাদ সম্মেলনে জানানো তথ্যগুলো নিয়ে যখন অনুসন্ধানী সাংবাদিকরা প্রশ্ন তোলেন, তখন আসল তথ্য বেরিয়ে আসে। দুদকের প্রশাসনিক ও জনসংযোগ কর্মকর্তা মো: আকতারুল ইসলামের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি অত্যন্ত চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রদান করেন। তিনি পরিষ্কার জানান যে, দুদকে আসা যেকোনো সাধারণ বা গোপনীয় অভিযোগ সংবাদ সম্মেলন করে প্রচার করার কোনো স্বাভাবিক নিয়ম নেই। তাদের কাছে একটি তৈরি করা কাগজ বা লিখিত বক্তব্য হস্তান্তর করা হয়েছিল এবং উপর মহলের নির্দেশে তারা কেবল সংবাদ সম্মেলনে সেটি পাঠ করেছেন। এমনকি এই অভিযোগের সত্যতা কিংবা প্রাথমিক ভিত্তি সম্পর্কে জনসংযোগ বিভাগ কিছুই জানত না।
দুদকের এই অপেশাদার এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিত আচরণের সুযোগ নিয়ে দেশের প্রধান প্রধান কিছু গণমাধ্যম সত্যতা যাচাই না করেই ভিত্তিহীন সংবাদ প্রচার শুরু করে। একাত্তর টিভি, খেলাযোগ, কালের কণ্ঠ, ডেইলি সান বাংলা এবং স্টার নিউজের মতো মূলধারার সংবাদমাধ্যমগুলো তাদের ফেসবুক পেজে এমনভাবে শিরোনাম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ছবি প্রচার করে, যেন আসিফ মাহমুদের অর্থ পাচারের বিষয়টি দুদক কর্তৃক প্রমাণিত বা চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত। "১১ হাজার কোটি টাকা পাচার আসিফের, টাকা আছে সুইস ব্যাংকেও" কিংবা "আসিফ মাহমুদের টাকা আছে ৪ দেশে"- এ ধরনের বিভ্রান্তিকর শিরোনাম সাধারণ পাঠকদের মনে চরম বিভ্রান্তি তৈরি করেছে। দুদক কেবল একটি প্রাথমিক অপ্রমাণিত অভিযোগ পাওয়ার কথা জানালেও গণমাধ্যমগুলো সেটিকে সত্য ঘটনা হিসেবে উপস্থাপন করে সাংবাদিকতার ন্যূনতম নীতিমালা লঙ্ঘন করেছে।
সার্বিক পর্যালোচনায় এটি স্পষ্ট যে, একটি রাজনৈতিক মহল এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করে গত জানুয়ারি মাসে যে ভুয়া তথ্য তৈরি করেছিল, সেটিকেই পরবর্তীতে একটি প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে সংবাদমাধ্যমে এনে চরিত্র হননের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। দুর্নীতি দমন কমিশনের মতো দায়িত্বশীল একটি সংস্থা কীভাবে একটি সামাজিক যোগযোগমাধ্যমের ভুয়া অভিযোগ যাচাই ছাড়া সংবাদ সম্মেলন করে প্রচার করল, তা নিয়ে এখন চরম প্রশ্ন উঠছে। এটি কেবল একজন ব্যক্তির সম্মানহানি নয়, বরং দেশের সার্বিক সাংবাদিকতা ও প্রশাসনিক ব্যবস্থার দায়িত্বশীলতাকে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে দিয়েছে। সাধারণ মানুষের উচিত যেকোনো খবর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেখে বিশ্বাস করার আগে তার তথ্যসূত্র এবং নিরপেক্ষ তথ্য যাচাই প্রতিবেদন পর্যবেক্ষণ করা।


সিএসবি নিউজ-এর আরও খবর