নারায়ণগঞ্জ থেকে জয়দেবপুর যাবে ট্রেন, কমবে ঢাকা শহরের চরম যানজট

নারায়ণগঞ্জ-ঢাকা-জয়দেবপুর রুটে চালু হতে যাচ্ছে ৫২ কিলোমিটারের প্রথম বৈদ্যুতিক ট্রেন, প্রকল্প বাস্তবায়নে ব্যয় হবে ৩ হাজার ৮২৩ কোটি টাকা।

নারায়ণগঞ্জ থেকে জয়দেবপুর যাবে ট্রেন, কমবে ঢাকা শহরের চরম যানজট

নারায়ণগঞ্জ থেকে জয়দেবপুর যাবে ট্রেন, কমবে ঢাকা শহরের চরম যানজট


বাংলাদেশের যোগাযোগ ব্যবস্থায় এক নবদিগন্তের সূচনা হতে যাচ্ছে। দেশের পরিবহন খাতের আধুনিকায়ন এবং পরিবেশবান্ধব যাতায়াত ব্যবস্থা গড়ে তোলার লক্ষ্যে নারায়ণগঞ্জের কদম রসুল থেকে ঢাকা হয়ে জয়দেবপুর পর্যন্ত ৫২ কিলোমিটার দীর্ঘ রুটে দেশের প্রথম বৈদ্যুতিক ট্রেন চালু করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। এই যুগান্তকারী উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে রাজধানী ঢাকা ও এর চারপাশের উপশহরের কয়েক লাখ যাত্রীর দীর্ঘদিনের যাতায়াত ভোগান্তি নিরসন হবে এবং একই সঙ্গে সময় ও জ্বালানির অভূতপূর্ব সাশ্রয় ঘটবে।


আগামী বুধবার অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির অর্থাৎ একনেক সভায় ৩ হাজার ৮২৩ কোটি টাকা ব্যয়ের গুরুত্বপূর্ণ এই প্রকল্পটির অনুমোদন চাওয়া হবে। এই সুবিশাল অর্থায়নের সিংহভাগই আসছে অন্তর্বর্তীকালীন উন্নয়ন অংশীদারদের কাছ থেকে। আন্তর্জাতিক ঋণদাতা সংস্থা এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক এবং ইউরোপীয় ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক যৌথভাবে প্রকল্পটির জন্য ২ হাজার ৮৮০ কোটি টাকার অর্থায়ন কিংবা উন্নয়ন সহায়তা প্রদান করতে সম্মত হয়েছে। অবশিষ্ট অর্থ সরকারি তহবিল থেকে সরবরাহ করা হবে। বাংলাদেশ সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী ২০৩১ সালের ৩০ জুনের মধ্যে প্রকল্পটির সার্বিক নির্মাণকাজ শেষ করে ট্রেন চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করার সুনির্দিষ্ট সময়সীমা বা লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।


ফ্যাক্ট চেক ও তথ্যের সঠিকতা বিশ্লেষণে দেখা যায় যে, বর্তমানে বাংলাদেশ রেলওয়ের সমস্ত রুট ও বহর মূলত ডিজেলে চালিত ইঞ্জিনের ওপর নির্ভরশীল। প্রচলিত ডিজেল চালিত ব্যবস্থার তুলনায় বৈদ্যুতিক ট্রেন চালনা শতভাগ পরিবেশবান্ধব এবং অত্যন্ত সাশ্রয়ী। সরকারি নথিপত্র ও প্রাথমিক সমীক্ষা অনুসারে, বিদ্যুৎচালিত ট্রেনের মাধ্যমে রেল পরিচালনায় জ্বালানি খরচ অন্তত ৪০ শতাংশ হ্রাস পাবে। বর্তমানে রাজধানীতে তেলের অপচয় ও অতিরিক্ত কার্বন নিঃসরণের যে সমস্যা দেখা যায়, তা বহুগুণে কমবে। পাশাপাশি ডিজেল ট্রেনের ধীরগতির সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে এ ধরনের ট্রেনের গতি উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পাবে। ফলে নারায়ণগঞ্জ থেকে ঢাকা হয়ে জয়দেবপুর পৌঁছাতে আগে যেখানে কয়েক ঘণ্টা সময় লাঘব হতো, সেখানে অতি অল্প সময়ে ও কম খরচে পৌঁছানো সম্ভব হবে।


প্রকল্পের বিশদ বিবরণ অনুযায়ী, নারায়ণগঞ্জ থেকে জয়দেবপুর পর্যন্ত যে ৫২ কিলোমিটার রুট নির্বাচন করা হয়েছে, সেটি বাংলাদেশের অন্যতম ব্যস্ততম ও জনবহুল করিডোর। এই করিডোরে প্রতিদিন হাজার হাজার মেহনতী মানুষ, সরকারি-বেসরকারি চাকুরিজীবী, শিক্ষার্থী এবং পোশাক কারখানার শ্রমিকরা যাতায়াত করেন। সড়কপথে প্রতিনিয়ত যানজটের যে তীব্র সংকট লেগেই থাকে, রেলপথে আধুনিক বৈদ্যুতিক ট্রেনের প্রবর্তন সেই সংকটের একটি স্থায়ী ও বৈপ্লবিক সমাধান প্রদান করবে। এর মাধ্যমে সড়কপথের ওপর অতিরিক্ত চাপ কমবে এবং সড়ক দুর্ঘটনার ঝুঁকিও ব্যাপকভাবে কমে আসবে।


প্রকৌশলগত দিক দিয়ে বিবেচনা করলে, বৈদ্যুতিক চালিত এই ট্রেনে থাকবে ওভারহেড ক্যাটেনারি সিগন্যালিং ব্যবস্থা এবং আধুনিক বিদ্যুৎ সরবরাহ উপকেন্দ্র। দেশের মূল বিদ্যুৎ গ্রিড থেকে নিরবচ্ছিন্ন উপায়ে ট্রেন পরিচালনায় প্রয়োজনীয় শক্তি সংগৃহীত হবে। সার্বিক নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করতে এই রুটে স্বয়ংক্রিয় ট্রেন নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা ও উন্নত ফাইবার অপটিক নেটওয়ার্ক ব্যবহার করা হবে। এতে করে যেকোনো অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনা এড়ানো যাবে এবং ট্রেনের সময়সূচি নির্ভুল রাখা সম্ভব হবে।
অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ৩ হাজার ৮২৩ কোটি টাকার প্রকল্পটি বাস্তবায়নের ফলে শুধুমাত্র যাতায়াত ব্যবস্থারই পরিবর্তন হবে না, বরং ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জ এবং গাজীপুর সংলগ্ন শিল্পাঞ্চলসমূহের সার্বিক উৎপাদনশীলতা বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে। যানজটের কারণে ঢাকা ও তার পার্শ্ববর্তী অঞ্চলের মানুষের কর্মঘণ্টার যে বিশাল অপচয় ঘটেছিল, তা সাশ্রয় করা সম্ভব হবে। পোশাক শিল্পের কাঁচামাল পরিবহন এবং শ্রমিকের সঠিক সময়ে কর্মস্থলে পৌঁছানো ত্বরান্বিত হওয়ায় জাতীয় অর্থনীতিতে নতুন গতি সঞ্চার হবে।


প্রকল্পের বাস্তব রূপায়ণে রয়েছে আন্তর্জাতিক দুটি অর্থায়ন সংস্থার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক এবং ইউরোপীয় ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক বহু বছর ধরে এ দেশের দীর্ঘমেয়াদী টেকসই অবকাঠামো উন্নয়নে অংশীদার হিসেবে কাজ করছে। এই দুটি সংস্থার যৌথ অর্থায়ন প্রমাণ করে যে বাংলাদেশ ধীরে ধীরে উন্নত, দক্ষ ও পরিবেশবান্ধব সবুজ যোগাযোগ প্রযুক্তির দিকে অগ্রসর হচ্ছে। তাদের সহায়তায় বাস্তবায়িত এই প্রকল্প বাংলাদেশ রেলওয়েকে সম্পূর্ণ এক নতুন প্রযুক্তিনির্ভর আধুনিক ও বৈশ্বিক যুগের সাথে সংযুক্ত করবে।


২০৩১ সালের জুনের মধ্যে নারায়ণগঞ্জ-ঢাকা-জয়দেবপুর বিদ্যুৎ চালিত এই স্বপ্নের রেলপথ পুরোপুরি কার্যকর করার যে লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে, তা সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে এটি হবে পরবর্তী প্রজন্মের জন্য একটি নিরাপদ, গতিশীল ও বিশ্বমানের গণপরিবহন উপহার। যাত্রীদের জন্য আরামদায়ক ভ্রমণ, জ্বালানির বিশাল সাশ্রয়, শহরের বাতাস দূষণ মুক্ত রাখা এবং দেশের সার্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করার ক্ষেত্রে এই প্রথম বৈদ্যুতিক ট্রেন প্রকল্প এক ঐতিহাসিক মাইলফলক হিসেবে গণমানুষের নিকট চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।


সিএসবি নিউজ-এর আরও খবর