অভিবাসীদের গ্রিন কার্ডে কড়াকড়ি, ট্রাম্পের বিরুদ্ধে ২২ রাজ্যের মামলা

সরকারি সহায়তা নেওয়া অভিবাসীদের গ্রিন কার্ড পাওয়া কঠিন করতে ট্রাম্প প্রশাসনের নতুন নিয়মের বিরুদ্ধে আদালতে গেছে নিউইয়র্কসহ ২২ রাজ্য।

অভিবাসীদের গ্রিন কার্ডে কড়াকড়ি, ট্রাম্পের বিরুদ্ধে ২২ রাজ্যের মামলা

অভিবাসীদের গ্রিন কার্ডে কড়াকড়ি, ট্রাম্পের বিরুদ্ধে ২২ রাজ্যের মামলা


যুক্তরাষ্ট্রে গ্রিন কার্ড পাওয়ার অপেক্ষায় থাকা লাখো অভিবাসীর জন্য নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে ট্রাম্প প্রশাসনের ‘পাবলিক চার্জ’ নীতি। খাদ্য, স্বাস্থ্যসেবা, আবাসন কিংবা অন্য কোনো সরকারি সহায়তা নেওয়ার বিষয়টি একজন অভিবাসীর স্থায়ী বসবাসের অনুমতি বা গ্রিন কার্ডের আবেদনে আরও ব্যাপকভাবে বিবেচনা করার সুযোগ তৈরি করছে নতুন নিয়মটি। এর বিরুদ্ধে এবার আদালতের দ্বারস্থ হয়েছে নিউইয়র্কসহ ২২টি রাজ্য ও ডিস্ট্রিক্ট অব কলাম্বিয়া। 

সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কের নেতৃত্বে এই আইনি চ্যালেঞ্জ আনা হয়। মামলাকারীদের অভিযোগ, নতুন নিয়মটি কার্যকর হলে অভিবাসন কর্মকর্তারা একজন আবেদনকারী ভবিষ্যতে সরকারি সহায়তার ওপর নির্ভরশীল হতে পারেন কি না—সেটি নির্ধারণে অনেক বেশি ক্ষমতা পাবেন। ফলে বৈধভাবে সরকারি সুবিধা গ্রহণ করলেও অনেক অভিবাসীর মধ্যে গ্রিন কার্ড হারানোর বা আবেদন প্রত্যাখ্যাত হওয়ার ভয় তৈরি হতে পারে। 

নতুন নিয়মটি ১৮ সেপ্টেম্বর থেকে কার্যকর হওয়ার কথা। তার আগেই সেটি ঠেকাতে আইনি লড়াই শুরু হয়েছে। নিউইয়র্ক ছাড়াও বিভিন্ন রাজ্য, শহর ও কাউন্টি পৃথকভাবে এই নীতির বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে। 

‘পাবলিক চার্জ’ যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন আইনে নতুন কোনো ধারণা নয়। দীর্ঘদিন ধরে সরকার বিবেচনা করে আসছে, কোনো বিদেশি নাগরিক যুক্তরাষ্ট্রে এসে মূলত সরকারের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়বেন কি না। কিন্তু কোন ধরনের সরকারি সুবিধা গ্রহণ করলে একজন মানুষকে ‘পাবলিক চার্জ’ হিসেবে বিবেচনা করা হবে, তা নিয়ে বিভিন্ন প্রশাসনের সময়ে নীতির পরিবর্তন হয়েছে।

ট্রাম্প প্রশাসনের নতুন নিয়মের বিরোধীদের দাবি, এবার এর পরিধি এমনভাবে বাড়ানো হয়েছে যে খাদ্য, চিকিৎসা ও আবাসনের মতো মৌলিক সহায়তা গ্রহণ করাও অভিবাসীদের মধ্যে ভয় তৈরি করতে পারে। নিউইয়র্ক ও অন্য মামলাকারীরা বলছে, নতুন ব্যবস্থায় অভিবাসন কর্মকর্তাদের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে অত্যন্ত বিস্তৃত স্বাধীনতা দেওয়া হচ্ছে। 

বিশেষ করে কম আয়ের অভিবাসী পরিবারগুলোর ওপর এর প্রভাব বেশি পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। পরিবারের একজন সদস্যের অভিবাসন আবেদন চলমান থাকলে অন্য সদস্যরা সরকারি সুবিধা পাওয়ার যোগ্য হলেও পুরো পরিবার সেই সুবিধা গ্রহণ থেকে সরে আসতে পারে—এমন আশঙ্কাও মামলাকারীদের।

এখানে একটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ—সরকারি কোনো সুবিধা গ্রহণ করলেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে গ্রিন কার্ড বাতিল বা প্রত্যাখ্যাত হবে, বিষয়টি এমন নয়। নতুন নীতিতে কর্মকর্তারা আবেদনকারীর পরিস্থিতি মূল্যায়নের সময় সরকারি সুবিধা গ্রহণ বা ভবিষ্যতে তার ওপর নির্ভরশীল হওয়ার সম্ভাবনাকে বিবেচনার অংশ করতে পারবেন। তাই বিষয়টি ব্যক্তির অভিবাসন অবস্থা ও পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করতে পারে। 

নিউইয়র্ক সিটির নেতৃত্বেও নতুন নিয়মের বিরুদ্ধে আলাদা মামলা হয়েছে। শহরটির সঙ্গে রয়েছে শিকাগো, সান ফ্রান্সিসকো, সান্তা ক্লারা কাউন্টি, সিয়াটল ও কিং কাউন্টি। মামলাটি নিউইয়র্কের সাউদার্ন ডিস্ট্রিক্টের ফেডারেল আদালতে করা হয়েছে। একই সময়ে নিউইয়র্কের অ্যাটর্নি জেনারেলের নেতৃত্বেও রাজ্যগুলোর পৃথক আইনি চ্যালেঞ্জ চলছে। 

নিউইয়র্ক সিটি কর্তৃপক্ষের বক্তব্য, আয়ভিত্তিক স্থানীয়, অঙ্গরাজ্য ও ফেডারেল সরকারি সুবিধা নেওয়ার কারণে গ্রিন কার্ড বা ভিসার আবেদন প্রত্যাখ্যান করার সুযোগ বাড়ালে অভিবাসী পরিবারগুলো প্রয়োজনীয় খাদ্য ও স্বাস্থ্যসেবা থেকেও দূরে সরে যেতে পারে।

এই বিষয়টি নিউইয়র্কের জন্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। শহরটিতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে আসা বিপুলসংখ্যক অভিবাসীর বসবাস। বাংলাদেশি কমিউনিটিরও বড় একটি অংশ নিউইয়র্কে বসবাস করে। ফলে গ্রিন কার্ড ও অভিবাসন নীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন হলে বাংলাদেশিসহ বিভিন্ন অভিবাসী কমিউনিটির মধ্যে স্বাভাবিকভাবেই আগ্রহ ও উদ্বেগ তৈরি হয়।

তবে নতুন নিয়মের আওতায় কে কীভাবে প্রভাবিত হবেন, তা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের তথ্যের ওপর নির্ভর না করার পরামর্শই সবচেয়ে নিরাপদ। কারও নিজের বা পরিবারের গ্রিন কার্ড আবেদন চলমান থাকলে এবং তারা সরকারি সুবিধা গ্রহণ করলে ব্যক্তিগত পরিস্থিতি অনুযায়ী অভিবাসন আইনজীবী বা অনুমোদিত আইনি সহায়তা প্রতিষ্ঠানের পরামর্শ নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।

অন্যদিকে ট্রাম্প প্রশাসন অভিবাসন ব্যবস্থায় আর্থিকভাবে স্বনির্ভর ব্যক্তিদের অগ্রাধিকার দেওয়ার বৃহত্তর প্রচেষ্টার অংশ হিসেবেই পাবলিক চার্জ নীতিতে পরিবর্তন আনছে। কিন্তু মামলাকারী রাজ্যগুলোর বক্তব্য, প্রশাসনের নতুন ব্যবস্থা কংগ্রেসের দীর্ঘদিনের আইনি কাঠামোর তুলনায় অনেক বেশি বিস্তৃত এবং অভিবাসন কর্মকর্তাদের অতিরিক্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা দিচ্ছে। 

এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো আদালত কী সিদ্ধান্ত দেয়। কারণ নিয়মটি ১৮ সেপ্টেম্বর কার্যকর হওয়ার কথা থাকায় মামলার প্রাথমিক পর্যায়েই সেটি সাময়িকভাবে বন্ধ করার আবেদন বা আদালতের অন্য কোনো নির্দেশ আসতে পারে। ফলে গ্রিন কার্ড আবেদনকারীদের জন্য আগামী কয়েক দিনের আইনি ঘটনাপ্রবাহ বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। 

নতুন নিয়ম শেষ পর্যন্ত বহাল থাকবে, পরিবর্তিত হবে, নাকি আদালতে আটকে যাবে তা এখনই নিশ্চিত নয়। তাই “সরকারি সুবিধা নিলেই আর গ্রিন কার্ড পাওয়া যাবে না” এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোও ঠিক হবে না। বর্তমান পরিস্থিতি হলো, প্রশাসন নিয়ম পরিবর্তন করেছে এবং সেই পরিবর্তনের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে বড় ধরনের আইনি লড়াই শুরু হয়েছে।

সিএসবি নিউজ-এর আরও খবর