কংগ্রেস সদস্য ইলহান ওমরের বিরুদ্ধে অভিবাসন জালিয়াতির তদন্তে বিচার চাইলেন টম হোমান

আমেরিকায় কংগ্রেস সদস্য ইলহান ওমরের বিরুদ্ধে অভিবাসন জালিয়াতির তদন্ত শুরু হয়েছে এবং দোষী প্রমাণিত হলে বহিষ্কারের হুঁশিয়ারি দিয়েছেন টম হোমান।

কংগ্রেস সদস্য ইলহান ওমরের বিরুদ্ধে অভিবাসন জালিয়াতির তদন্তে বিচার চাইলেন টম হোমান

কংগ্রেস সদস্য ইলহান ওমরের বিরুদ্ধে অভিবাসন জালিয়াতির তদন্তে বিচার চাইলেন টম হোমান


আমেরিকার মিনেসোটা রাজ্যের ডেমোক্র্যাট কংগ্রেস সদস্য ইলহান ওমরের বিরুদ্ধে নতুন করে অভিবাসন ও বিয়ে জালিয়াতির অভিযোগ সামনে এনেছে ট্রাম্প প্রশাসন। মার্কিন সরকারের সীমান্ত ও অভিবাসন বিষয়ক শীর্ষ কর্মকর্তা বা বর্ডার জার টম হোমান স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন, কংগ্রেস সদস্য ওমরের বিষয়ে একটি বিস্তৃত ফৌজদারি তদন্ত চলছে। এই তদন্তে যদি কোনো অপরাধের সত্যতা মেলে, তবে আইন অনুযায়ী কঠোরতম ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং কাউকেই কোনো ছাড় দেওয়া হবে না। একই সঙ্গে মার্কিন হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগের প্রধান মার্কওয়েন মুলিনও এই বিষয়ে সরকারের কঠোর অবস্থানের কথা পুনর্ব্যক্ত করেছেন। তারা দুজনই ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, তদন্তে দোষী সাব্যস্ত হলে যুক্তরাষ্ট্র থেকে ওমরের নাগরিকত্ব বাতিলসহ তাকে নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর মতো আইনি পদক্ষেপও নেওয়া হতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান ট্রাম্প প্রশাসন অভিবাসন আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে প্রথম থেকেই অত্যন্ত কঠোর নীতি অনুসরণ করে আসছে। সাম্প্রতিক এক সাক্ষাৎকারে টম হোমানকে যখন ইলহান ওমরের দীর্ঘদিনের অভিবাসন বিতর্কের বিষয়ে প্রশ্ন করা হয়, তখন তিনি বলেন যে দেশের প্রতিটি নাগরিক ও প্রতিনিধির জন্য আইন সমান। তিনি জানান, হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগ বহু দিন ধরেই বিভিন্ন তথ্যপ্রমাণ বিশ্লেষণ করছে। যদি কোনো ব্যক্তি ভুয়া কাগজপত্র দিয়ে বা মিথ্যা তথ্য উপস্থাপন করে আমেরিকান নাগরিকত্ব অর্জন করে থাকেন, তবে তা জালিয়াতি হিসেবে গণ্য হবে। তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, ইলহান ওমর কংগ্রেসের ক্ষমতাধর সদস্য হলেও তিনি আইনের ঊর্ধ্বে নন।


একই সুর শোনা গেছে হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগের সচিব মার্কওয়েন মুলিনের কণ্ঠেও। তিনি একটি সাম্প্রতিক বক্তব্যে বলেছেন যে, ইলহান ওমরের পুরো বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। খুব শীঘ্রই কোনো একটি বড় প্রশাসনিক বা আইনি সিদ্ধান্ত সামনে আসতে যাচ্ছে। মুলিন স্পষ্ট করে দেন, তদন্তের ফলাফল যদি এটি প্রমাণ করে যে কোনো ব্যক্তি শুরু থেকেই অবৈধ উপায়ে অথবা অসত্য তথ্য দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের জমি ব্যবহারের যোগ্যতা পেয়েছিলেন, তবে তাকে কোনো অবস্থাতেই দেশে থাকতে দেওয়া হবে না। তার মতে, আইনের শাসনের প্রতি শ্রদ্ধা বজায় রাখতেই এই তদন্তকে চূড়ান্ত পরিণতি পর্যন্ত নিয়ে যাওয়া প্রয়োজন।


ইলহান ওমরকে ঘিরে বিতর্কটি কিন্তু একদম নতুন নয়। সোমালি বংশোদ্ভূত এই নারী নেতা ২০১৬ সালে মিনেসোটা রাজ্য সংসদে নির্বাচিত হওয়ার পর থেকেই ডানপন্থী রাজনীতিকদের প্রধান লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হন। তার বিরুদ্ধে মূল অভিযোগটি হলো, ২০০৯ সালে তিনি আহমদ নূর সাইদ এলমি নামের এক ব্যক্তিকে বিয়ে করেছিলেন। বিরোধীদের দাবি, এই এলমি আসলে ইলহান ওমরের নিজের ভাই। মার্কিন অভিবাসন আইনের সুযোগ নিয়ে এলমিকে দ্রুত আমেরিকার ভিসা ও নাগরিকত্ব পাইয়ে দেওয়ার উদ্দেশ্যেই নাকি এই ভুয়া বিয়ের আয়োজন করা হয়েছিল। দীর্ঘ দিন ধরে অভিযোগকারীরা বলে আসছেন যে, এই ধরনের কাজ আমেরিকার অভিবাসন আইনের সম্পূর্ণ পরিপন্থী এবং এটি সরাসরি জালিয়াতির শামিল।


তবে ইলহান ওমর সবসময়ই তার বিরুদ্ধে ওঠা এসব অভিযোগ শুরু থেকেই সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং ইসলামভীতি থেকে উদ্ভূত বলে প্রত্যাখ্যান করে এসেছেন। তিনি একাধিকবার বলেছেন, তার বিরুদ্ধে আনা জালিয়াতির অভিযোগগুলো সম্পূর্ণ মিথ্যা কথা এবং একটি বিদ্বেষপূর্ণ প্রচারণার অংশ। ওমরের সমর্থক ও আইনজীবীরা দাবি করেছেন যে, তার ব্যক্তিগত জীবনকে কলঙ্কিত করে তার রাজনীতি থমকে দেওয়ার জন্য উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে এই পুরনো গুঞ্জন বারবার সামনে আনা হয়।


ফ্যাক্ট চেক বা তথ্য অনুসন্ধানে দেখা যায় যে, ইলহান ওমরের বিরুদ্ধে এই জালিয়াতির গুঞ্জন দীর্ঘদিন ধরে মার্কিন গণমাধ্যমে ঘুরপাক খেলেও এখন পর্যন্ত আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো আদালত বা বিচার বিভাগ তার বিরুদ্ধে বিচার বিভাগীয় অপরাধের প্রমাণ পায়নি। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সংবাদ মাধ্যমগুলো বহু বছর ধরে এই বিষয়ে তদন্ত চালিয়েও নিশ্চিত হতে পারেনি যে ওমরের প্রাক্তন স্বামী সত্যিই তার ভাই ছিলেন কি না। মিনেসোটার স্থানীয় পত্রিকা এবং আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থাগুলোর অনুসন্ধান অনুযায়ী, তার পারিবারিক নথি এবং কাগজপত্রে নানাবিধ জটিলতা রয়েছে সত্য, কিন্তু জালিয়াতি বা ভুয়া বিয়ের আইনগত কোনো অকাট্য প্রমাণ পাবলিক নথিতে প্রমাণিত হয়নি।


আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞ ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সরকারের তদন্ত প্রক্রিয়ার মানেই এই নয় যে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ইতোমধ্যেই অপরাধী হিসেবে প্রমাণিত হয়ে গেছেন। তদন্ত কেবল সত্যতা উদঘাটনের একটি প্রশাসনিক ধাপ। মার্কিন আইনি ব্যবস্থা অনুযায়ী কোনো অভিযোগ আদালতে প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত অভিযুক্তকে নির্দোষ বলেই বিবেচনা করা হয়। ফলে বর্তমানে টম হোমান ও মার্কওয়েন মুলিনের বক্তব্যগুলো মূলত ট্রাম্প প্রশাসনের কঠোর বার্তা বহন করে, কিন্তু আইনি দৃষ্টিকোণ থেকে ইলহান ওমর এখনো কোনো অপরাধে দণ্ডপ্রাপ্ত নন।
ট্রাম্প প্রশাসনের এই নতুন পদক্ষেপকে আমেরিকার রাজনৈতিক অঙ্গনে বেশ বড় ঘটনা হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিরোধীরা বলছেন যে ট্রাম্প তার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষদের দমন করতে প্রশাসনিক শক্তি ও অভিবাসন বিভাগকে ব্যবহার করছেন। অন্যদিকে ট্রাম্পের সমর্থকরা মনে করেন যে জাতীয় নিরাপত্তা ও অভিবাসন ব্যবস্থার স্বচ্ছতা বজায় রাখতে যেকোনো প্রভাবশালী নেতার বিরুদ্ধেও নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া উচিত।


এখন পুরো আমেরিকার দৃষ্টি হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগের আগামী পদক্ষেপের দিকে। এই তদন্ত যদি কোনো স্পষ্ট তথ্যপ্রমাণ আদালতে দাখিল করতে পারে, তবে তা ওমরের রাজনৈতিক জীবনের জন্য চরম সংকট তৈরি করবে। অন্যদিকে তদন্তে যদি কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্যপ্রমাণ পাওয়া না যায়, তবে এটি কেবলই একটি রাজনৈতিক তর্কবিতর্ক হিসেবে রয়ে যাবে। পরিস্থিতি যেদিকেই যাক না কেন, মার্কিন রাজনীতিতে এই ঘটনাটি বর্তমানে উত্তেজনার পারদ বাড়িয়ে দিয়েছে।


সিএসবি নিউজ-এর আরও খবর