কোরিয়ার সঙ্গে রেল বিনিয়োগ ও প্রযুক্তি সহযোগিতার নতুন সম্ভাবনা খুঁজবেন শেখ রবিউল আলম
বাংলাদেশের রেল ও যোগাযোগ অবকাঠামো উন্নয়নে আন্তর্জাতিক সহযোগিতার নতুন সম্ভাবনা খুঁজতে দক্ষিণ কোরিয়ায় গ্লোবাল ইনফ্রাস্ট্রাকচার কো-অপারেশন কনফারেন্স (GICC) ২০২৬-এ অংশ নিচ্ছেন রেলমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম এমপি। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের নীতিনির্ধারক ও অবকাঠামো খাতের শীর্ষ প্রতিনিধিদের এই সম্মেলনে বাংলাদেশের রেল উন্নয়ন, আধুনিক প্রযুক্তি, বিনিয়োগ ও কারিগরি সহযোগিতার বিষয়গুলো তুলে ধরার সুযোগ রয়েছে। বিশেষ করে রেল খাতে দক্ষিণ কোরিয়ার উন্নত প্রযুক্তি ও দীর্ঘ অভিজ্ঞতার সঙ্গে বাংলাদেশের সম্ভাব্য সহযোগিতা এবং নতুন অংশীদারত্বের ক্ষেত্র উন্মোচনে এই সফর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
কোরিয়ার সঙ্গে রেল বিনিয়োগ ও প্রযুক্তি সহযোগিতার নতুন সম্ভাবনা খুঁজবেন শেখ রবিউল আলম
দক্ষিণ কোরিয়ার রাজধানী সিউলে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া গ্লোবাল ইনফ্রাস্ট্রাকচার কো-অপারেশন কনফারেন্স (GICC) ২০২৬-এ অংশ নিচ্ছেন সড়ক পরিবহন ও সেতু, রেলপথ এবং নৌপরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম এমপি। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের অবকাঠামো খাতের নীতিনির্ধারক, প্রকল্প বাস্তবায়নকারী প্রতিষ্ঠান, আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং নির্মাণ ও প্রকৌশল খাতের প্রতিনিধিদের নিয়ে এই সম্মেলন অনুষ্ঠিত হচ্ছে।
আয়োজকদের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, এবারের জিআইসিসি ১৫ থেকে ১৭ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সিউলের কনরাড সিউল হোটেলে অনুষ্ঠিত হবে। সম্মেলনের প্রথম দুই দিন বিভিন্ন উচ্চপর্যায়ের বৈঠক, পরিবহন সহযোগিতা, অবকাঠামো প্রকল্প, বহুপক্ষীয় উন্নয়ন ব্যাংক এবং ব্যবসায়িক সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা হবে। ১৭ সেপ্টেম্বর অংশগ্রহণকারীদের জন্য শিল্প-পরিদর্শন কর্মসূচি রাখা হয়েছে।
দক্ষিণ কোরিয়ার Ministry of Land, Infrastructure and Transport (MOLIT) সম্মেলনটির হোস্ট এবং International Contractors Association of Korea (ICAK) আয়োজক। দক্ষিণ কোরিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সম্মেলনটিকে সহযোগিতা করছে। সম্মেলনের অন্যতম লক্ষ্য হচ্ছে আন্তর্জাতিক প্রকল্পের মালিক ও অংশীজনদের সঙ্গে কৌশলগত যোগাযোগের মাধ্যমে কোরীয় নির্মাণ প্রতিষ্ঠানগুলোর বৈশ্বিক বাজার সম্প্রসারণ এবং নতুন অবকাঠামো প্রকল্পে অংশগ্রহণের সুযোগ তৈরি করা।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেবেন বাংলাদেশের মন্ত্রী
জিআইসিসি ২০২৬-এর আনুষ্ঠানিক কর্মসূচিতে বাংলাদেশের প্রতিনিধি হিসেবে শেখ রবিউল আলমের নাম রয়েছে। ১৫ সেপ্টেম্বর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে দক্ষিণ কোরিয়ার ভূমি, অবকাঠামো ও পরিবহনমন্ত্রী কিম ইউন-দুকের স্বাগত বক্তব্যের পর বাংলাদেশের সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম শুভেচ্ছা বক্তব্য দেবেন।
এরপর উচ্চপর্যায়ের বহুপক্ষীয় বৈঠকেও তিনি অংশ নেবেন। ওই বৈঠকে অবকাঠামো খাতের বিভিন্ন দেশের মন্ত্রী ও উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তারা অংশ নেবেন। বৈঠকে বাংলাদেশ ছাড়াও লাওস, তাজিকিস্তান, তানজানিয়া, উগান্ডা ও কাজাখস্তানের প্রতিনিধিদের অংশগ্রহণের কথা রয়েছে।
এবারের সম্মেলনের আলোচনায় অবকাঠামো উন্নয়ন, পরিবহন ব্যবস্থা, আন্তর্জাতিক প্রকল্পে সহযোগিতা, সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব এবং নতুন প্রযুক্তির ব্যবহার বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে। সম্মেলনের বিভিন্ন অধিবেশনে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইয়ের ব্যবহার, স্মার্ট পরিবহন, রেলওয়ে প্রযুক্তি, সড়ক ব্যবস্থাপনা এবং অবকাঠামো অর্থায়ন নিয়ে আলোচনা হবে।
পরিবহন অবকাঠামোতে কোরিয়ার অভিজ্ঞতা
জিআইসিসির পরিবহন সহযোগিতা সেমিনারে দক্ষিণ কোরিয়ার Korea National Railway, KORAIL, Korea Expressway Corporation এবং Incheon International Airport Corporation নিজেদের প্রযুক্তি, পরিচালন ব্যবস্থা ও আন্তর্জাতিক প্রকল্পের অভিজ্ঞতা তুলে ধরবে।
সেমিনারে কোরিয়া এক্সপ্রেসওয়ে করপোরেশন সড়ক অবকাঠামোর আর্থিক ও কারিগরি টেকসই ব্যবস্থাপনা নিয়ে উপস্থাপনা করবে। একই অধিবেশনে কোরিয়ার রেলওয়ে প্রযুক্তি, ভবিষ্যৎ রেল পরিচালনা এবং বিমানবন্দর অবকাঠামো নিয়েও আলোচনা হবে।
বাংলাদেশের জন্যও এই আয়োজন গুরুত্বপূর্ণ। কারণ দেশের সড়ক, সেতু ও রেল অবকাঠামোর উন্নয়নে দক্ষিণ কোরিয়া দীর্ঘদিন ধরে প্রযুক্তি, অর্থায়ন ও প্রকৌশল সহযোগিতার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। জিআইসিসির মতো উচ্চপর্যায়ের প্ল্যাটফর্মে বাংলাদেশের চলমান ও ভবিষ্যৎ অবকাঠামো প্রকল্প তুলে ধরার পাশাপাশি সম্ভাব্য বিনিয়োগ ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতার সুযোগ তৈরির সম্ভাবনা রয়েছে।
বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রকল্প নিয়েও আলোচনা
সম্মেলনের প্রকল্পভিত্তিক অধিবেশনগুলোতে বাংলাদেশের অবকাঠামো খাতের একাধিক প্রকল্পও উপস্থাপনের জন্য রাখা হয়েছে। এর মধ্যে বাংলাদেশ রেলওয়ের নারায়ণগঞ্জ থেকে লাকসাম/কুমিল্লা কর্ড লাইন নির্মাণ প্রকল্প নিয়ে উপস্থাপনা রয়েছে।
এছাড়া বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে “Building Connectivity Together” শীর্ষক একটি উপস্থাপনা রাখা হয়েছে। সম্মেলনের পরিবহন সহযোগিতা অধিবেশনে কর্ণফুলী নদীর কালুরঘাট পয়েন্টে রেল-কাম-রোড সেতু নির্মাণ প্রকল্প নিয়েও বাংলাদেশের পক্ষ থেকে উপস্থাপনার কথা রয়েছে।
এ ধরনের উপস্থাপনার মাধ্যমে বাংলাদেশের অবকাঠামো উন্নয়নের অগ্রাধিকার, ভবিষ্যৎ প্রকল্প এবং সম্ভাব্য আন্তর্জাতিক অংশীদারত্বের সুযোগ সংশ্লিষ্ট দেশ ও প্রতিষ্ঠানগুলোর সামনে তুলে ধরার সুযোগ তৈরি হবে।
৯ সেপ্টেম্বর সরকারি প্রতিনিধি দলের সফর আদেশ
বাংলাদেশ সেতু বিভাগের ওয়েবসাইটে ৯ সেপ্টেম্বর “Government Delegation Visit to South Korea to Participate in Global Infrastructure Cooperation Conference 2026 (GICC 2026)” শিরোনামে সরকারি সফরসংক্রান্ত নোটিশ প্রকাশ করা হয়েছে। এর মাধ্যমে বাংলাদেশ সরকারের প্রতিনিধি দলের দক্ষিণ কোরিয়া সফরের বিষয়টি সরকারি নথিতেও নিশ্চিত হয়েছে।
সেতু বিভাগের ওয়েবসাইটে শেখ রবিউল আলমকে সড়ক পরিবহন ও সেতু, রেলপথ এবং নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। একই সরকারি তথ্য অনুযায়ী তিনি ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে এসব মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
এআই ও ভবিষ্যৎ অবকাঠামো
এবারের জিআইসিসির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে অবকাঠামো খাতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও নতুন প্রযুক্তির ব্যবহার। দ্বিতীয় দিনে এআই ও এনার্জি ইনফ্রাস্ট্রাকচার নিয়ে আলাদা সেমিনার হবে। সেখানে বৈশ্বিক নির্মাণ খাতে এআই প্রযুক্তির ব্যবহার, এআই ডেটা সেন্টারের অবকাঠামো এবং ভবিষ্যৎ জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে আলোচনা হবে।
এছাড়া বিশ্বব্যাংক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক, ইউরোপীয় ব্যাংক ফর রিকনস্ট্রাকশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট, ইন্টার-আমেরিকান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক এবং এশিয়ান ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংকের মতো আন্তর্জাতিক উন্নয়ন অর্থায়নকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর অংশগ্রহণ রয়েছে। ফলে অবকাঠামো প্রকল্পে আন্তর্জাতিক অর্থায়ন, প্রকল্প প্রস্তুতি এবং বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণ নিয়েও আলোচনা হবে।
জিআইসিসির আয়োজকদের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৩ সাল থেকে এ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। গত ১৩ বছরে ৯০টি দেশের ৫৯০টি প্রতিষ্ঠান বিভিন্ন সময়ে এতে অংশ নিয়েছে। এবারও বিভিন্ন দেশের উচ্চপর্যায়ের অবকাঠামো কর্মকর্তাদের পাশাপাশি প্রকল্প মালিক, আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং নির্মাণ ও প্রকৌশল খাতের প্রতিনিধিরা অংশ নিচ্ছেন।
বাংলাদেশের পক্ষ থেকে শেখ রবিউল আলমের অংশগ্রহণ তাই শুধু একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলনে উপস্থিতির বিষয় নয়। দেশের সড়ক, সেতু ও রেল অবকাঠামোর চলমান উন্নয়ন, ভবিষ্যৎ প্রকল্প, প্রযুক্তি সহযোগিতা এবং আন্তর্জাতিক অর্থায়নের সম্ভাবনা নিয়ে সংশ্লিষ্ট দেশ ও প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ তৈরিরও একটি সুযোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে।