মোখা দখলের পর মারিবের দিকে হুতিরা, লোহিত সাগরজুড়ে সংঘাতের কালো ছায়া

ইয়েমেনের মোখা পতনের পর তাইজ ও মারিবে তীব্র লড়াই হুতিদের সৌদি ঘাঁটিতে ড্রোন হামলা এবং হরমুজ প্রণালিতে জাহাজে আক্রমণ।

মোখা দখলের পর মারিবের দিকে হুতিরা, লোহিত সাগরজুড়ে সংঘাতের কালো ছায়া

মোখা দখলের পর মারিবের দিকে হুতিরা, লোহিত সাগরজুড়ে সংঘাতের কালো ছায়া


ইয়েমেনের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় কৌশলগত বন্দরনগরী মোখা নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার পর ইরান-সমর্থিত হুতি বিদ্রোহী এবং দেশটির সরকারি বাহিনীর মধ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতি চরম রূপ ধারণ করেছে। মোখার পতনের পরপরই দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ শহর তাইজের নিকটবর্তী কাধা এলাকায় দুই পক্ষ মুখোমুখি রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। একই সময়ে তেল সমৃদ্ধ ও কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ মারিব শহরের দিকে হুতি যোদ্ধারা দ্রুত অগ্রসর হওয়ার চেষ্টা করলে সরকারি বাহিনীর তীব্র প্রতিরোধের মুখে পড়ে। মারিব শহরটি যদি শেষ পর্যন্ত হুতিদের দখলে চলে যায়, তবে ইয়েমেনের উত্তরাঞ্চলে সরকারি বাহিনীর উপস্থিতি ও নিয়ন্ত্রণ চূড়ান্তভাবে দুর্বল হয়ে পড়বে বলে সামরিক বিশ্লেষকরা আশঙ্কা করছেন।


ইয়েমেনের অভ্যন্তরীণ এই লড়াইয়ের পাশাপাশি আঞ্চলিক উত্তেজনাও মারাত্মকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। ইরান-সমর্থিত হুতি গোষ্ঠী প্রতিবেশী সৌদি আরবের সীমান্ত ও সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে তাদের হামলা বহুগুণ জোরদার করেছে। সশস্ত্র গোষ্ঠীটি আনুষ্ঠানিকভাবে দাবি করেছে যে, তারা সৌদি আরবের দক্ষিণাঞ্চলের একটি গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ঘাঁটিতে সুনির্দিষ্ট ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে। হুতিদের মুখপাত্র জানিয়েছেন, সৌদি নেতৃত্বাধীন সামরিক জোট তাদের নিয়ন্ত্রিত অঞ্চলগুলোতে ব্যাপক বোমাবর্ষণ চালিয়েছে। হুতিদের দেওয়া তথ্য মতে, মাত্র ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে তাদের অবস্থানে অন্তত ১২৯টি বিমান হামলা চালিয়েছে সৌদি বিমান বাহিনী। বিশেষ করে তাইজ এবং মারিবের আশেপাশে হুতিদের কৌশলগত অবস্থানগুলোকে লক্ষ্য করে এসব শক্তিশালী বিমান হামলা চালানো হয়।
এরই মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যের প্রধান সমুদ্রপথ হরমুজ প্রণালির কাছে বাণিজ্যিক জাহাজে নতুন করে আক্রমণের ঘটনা ঘটেছে, যা বৈশ্বিক জ্বালানি পরিবহন ও আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা নিয়ে বড় ধরনের উদ্বেগ তৈরি করেছে। ইরান সরকারের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, হরমুজ প্রণালির অদূরে কৌশলগত কাসেম দ্বীপের কাছে তাদের একটি বাণিজ্যিক জাহাজে মার্কিন সামরিক বাহিনী সরাসরি আক্রমণ চালিয়েছে। এই হামলায় জাহাজের একজন নাবিক নিহত এবং অন্তত চারজন গুরুতর আহত হয়েছেন বলে ইরানি কর্তৃপক্ষ নিশ্চিত করেছে।


এই চরম উত্তেজনাপূর্ণ ও সংকটময় পরিস্থিতিতে হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং মধ্যপ্রাচ্যের সার্বিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে পর্যালোচনার উদ্দেশ্যে একটি জরুরি কূটনৈতিক উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম মধ্যস্থতাকারী দেশ ওমানে উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদের সদস্য দেশগুলোর প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠকে বসছে ইরান। এই আন্তর্জাতিক আলোচনা মধ্যপ্রাচ্যে বড় ধরনের যুদ্ধ এড়ানোর একটি প্রচেষ্টা হিসেবে দেখা হলেও এতে পূর্ণাঙ্গ ঐকমত্য তৈরি হওয়া নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে। বাহরাইন সরকার ইতিমধ্যেই আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়ে দিয়েছে যে, তারা ইরানের সঙ্গে আয়োজিত এই বিশেষ কূটনৈতিক বৈঠকে অংশগ্রহণ করবে না।


অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা ও দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে নতুন আলোচনার জন্ম হয়েছে। আয়ারল্যান্ডের ডুনবেগ এলাকায় নিজের মালিকানাধীন গলফ রিসোর্টে সফরকালে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। হরমুজ প্রণালির ভবিষ্যৎ এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর এই বৈঠক সম্পর্কে জানতে চাওয়া হলে ট্রাম্প অত্যন্ত খোলামেলা প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন। মার্কিন প্রেসিডেন্ট স্পষ্ট জানিয়ে দেন যে, হরমুজ প্রণালির ভবিষ্যৎ নিয়ে ইরান যদি উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে আলোচনায় বসে বা কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছায়, তাতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি কিছু যায় আসে না। ট্রাম্প উল্লেখ করেন, এটি সম্পূর্ণভাবে সংশ্লিষ্ট অঞ্চলের দেশগুলোর নিজস্ব বিষয় এবং তাদেরকেই এই সমস্যার সমাধান খুঁজে বের করতে হবে।
ভূ-রাজনীতি ও আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার দিক থেকে মোখা বন্দর ও মারিব শহরের নিয়ন্ত্রণ ইয়েমেন যুদ্ধের মূল নিয়ামক হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। মোখা বন্দর হাতছাড়া হওয়ায় সরকারি বাহিনীর রসদ সরবরাহ ব্যবস্থা বড় ধরনের হুমকির মুখে পড়েছে। অন্যদিকে মারিব শহরটি ইয়েমেন সরকারের সর্বশেষ বড় শক্তিশালী ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত। এটি হাতছাড়া হলে ইয়েমেনের উত্তরের ক্ষমতার ভারসাম্য পুরোপুরি হুতিদের পক্ষে চলে যাবে। এর ফলে ইয়েমেনে দীর্ঘ এক দশকের বেশি সময় ধরে চলা গৃহযুদ্ধ আরও দীর্ঘায়িত ও জটিল রূপ নেবে।


বিশেষজ্ঞদের মতে, লোহিত সাগর এবং হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজে ধারাবাহিক আক্রমণ বিশ্ব বাণিজ্য ব্যবস্থার ওপর মারাত্মক বিরূপ প্রভাব ফেলছে। সমুদ্রপথে নিরাপত্তা বিঘ্নিত হওয়ায় আন্তর্জাতিক শিপিং কোম্পানিগুলো তাদের পণ্য পরিবহনের রুট পরিবর্তন করতে বাধ্য হচ্ছে, যার ফলে বিশ্বব্যাপী সরবরাহ শৃঙ্খল ব্যাহত হচ্ছে এবং জ্বালানি তেলের দাম লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে। ওমানের এই কূটনৈতিক বৈঠক অঞ্চলের সাময়িক উত্তাপ কমাতে কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়ে বড় ধরনের অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে, বিশেষ করে যখন বাহরাইনের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেশী দেশ এই আলোচনা বয়কট করছে এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বিষয়টি থেকে নিজেদের কিছুটা দূরত্বে রাখছে। সব মিলিয়ে ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধ এখন কেবল একটি দেশের অভ্যন্তরীণ সংঘাতের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, বরং তা পুরো মধ্যপ্রাচ্যকে এক ভয়াবহ আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক যুদ্ধের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।


সিএসবি নিউজ-এর আরও খবর