ক্যাট ইন দ্য হ্যাট ট্রেন্ডে যুক্তরাষ্ট্রের স্কুলে চরম নিরাপত্তা আতঙ্ক ও তদন্ত

টিকটকের মারাত্মক 'ক্যাট ইন দ্য হ্যাট' ট্রেন্ডে যুক্তরাষ্ট্রের স্কুলে চরম আতঙ্ক, তদন্তে পুলিশ, ভুয়া হুমকিতেও কড়া আইনি হুঁশিয়ারি।

ক্যাট ইন দ্য হ্যাট ট্রেন্ডে যুক্তরাষ্ট্রের স্কুলে চরম নিরাপত্তা আতঙ্ক ও তদন্ত

ক্যাট ইন দ্য হ্যাট ট্রেন্ডে যুক্তরাষ্ট্রের স্কুলে চরম নিরাপত্তা আতঙ্ক ও তদন্ত


আমেরিকার ক্যালিফোর্নিয়া রাজ্যের বোল্ডউইন পার্ক শহরের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে নতুন এক সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম প্রবণতা বা ট্রেন্ড চরম আতঙ্ক তৈরি করেছে। ডক্টর সুসের বিখ্যাত শিশুতোষ সাহিত্য চরিত্র "ক্যাট ইন দ্য হ্যাট" বা টুপি পরা বিড়াল কেন্দ্রিক একটি ট্রেন্ডটিকটক ও স্ন্যাপচ্যাটের মতো প্ল্যাটফর্মে হু হু করে ছড়িয়ে পড়ছে। আপাতদৃষ্টিতে কৌতুক মনে হলেও এই ভিডিও এবং পোস্টগুলোতে বিভিন্ন স্কুল, শিক্ষক ও নির্দিষ্ট শিক্ষার্থীদের নাম উল্লেখ করে পরোক্ষ হুমকি দেওয়া হচ্ছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় বোল্ডউইন পার্ক পুলিশ ডিপার্টমেন্ট ইতিমধ্যেই ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত শুরু করেছে। পুলিশ কর্তৃপক্ষ স্পষ্টভাবে জানিয়েছে যে, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বা শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে করা কোনো প্রকার হুমকিকে কৌতুক হিসেবে দেখার কোনো সুযোগ নেই। অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কড়া আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।



সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া এই ভয়াবহ ট্রেন্ড নিয়ে বিস্তারিত তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা গেছে যে, এটি একটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই চালিত প্র্যাংক এবং ভীতি ছড়ানোর উদ্দেশ্যে তৈরি ডিজিটাল কন্টেন্ট। মূলত দুই হাজার তিন সালের লাইভ অ্যাকশন সিনেমা "দ্য ক্যাট ইন দ্য হ্যাট"-এর ক্যারেক্টারকে কেন্দ্র করে বিকৃত ও হরর ধাঁচের এআই ছবি ও সংক্ষিপ্ত ভিডিও তৈরি করা হচ্ছে। ডিজিটাল প্রযুক্তির সাহায্যে ভয়ানক চেহারার টুপি পরা বিড়ালকে রাতের বেলা বিভিন্ন স্কুল ভবন, রাস্তা বা শিক্ষার্থীদের বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখানো হয়। অনেক ক্ষেত্রে ভিডিওতে শিশুদের ছড়া ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে, যা পরিবেশকে আরও রহস্যময় ও ভীতিকর করে তোলে।
ফ্যাক্ট চেকে নিশ্চিত হওয়া গেছে যে, বাস্তব জীবনে কোনো রহস্যময় বিড়াল চরিত্র হেঁটে বেড়াচ্ছে না বা কোনো ভৌত আক্রমণ ঘটায়নি। কিন্তু টিকটক ও স্ন্যাপচ্যাটের মতো মাধ্যমগুলোতে নির্দিষ্ট এলাকা, স্থানীয় স্কুল এবং শিক্ষার্থীদের নাম উল্লেখ করে ক্যাপশন জুড়ে দেওয়ায় সাধারণ মানুষ ও শিশুদের মধ্যে সত্যিকারের নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হচ্ছে। ক্যালিফোর্নিয়া ছাড়াও কানসাস, জর্জিয়া, কেন্টাকি ও কলোরাডো সহ যুক্তরাষ্ট্রের একাধিক রাজ্যে এই ট্রেন্ডের কারণে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। ইতিমধ্যেই কয়েকটি স্থানে ভুয়া হুমকি ও ভয় ছড়ানোর অভিযোগে কয়েকজন কিশোরকে গ্রেপ্তার করেছে স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। অতএব, তথ্য যাচাইয়ে প্রমাণিত হয় যে বিড়ালের উপস্থিতি বাস্তব না হলেও সামাজিক মাধ্যমে নাম উল্লেখ করে দেওয়া বার্তাগুলো আইনত অপরাধ এবং তা শিক্ষার্থীদের মানসিক উদ্বেগের মূল কারণ।


অনলাইন থেকে যেভাবে ছড়িয়ে পড়ছে এই ভীতি
অনলাইন প্ল্যাটফর্মে এটি মূলত আগস্টের শেষের দিকে ব্রিটেন ও আয়ারল্যান্ডে প্রথম নজরে আসে এবং সেপ্টেম্বর মাসের শুরুতেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে। টিকটক অ্যালগরিদমের কারণে অতি দ্রুত ভিডিওগুলো স্থানীয় শিক্ষার্থীদের ফিডে পৌঁছে যাচ্ছে। কিছু ব্যবহারকারী নিছক বিনোদন ও অনুসারী বাড়ানোর জন্য এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করে স্থানীয় পরিবেশের সাথে কাল্পনিক বিড়ালটিকে যুক্ত করে দিচ্ছে। তারা বিভিন্ন স্কুলের নাম, ক্লাস রুমের ছবি এবং নির্দিষ্ট বন্ধুদের ইউজারনেম ট্যাগ করে দিচ্ছে। এর ফলে যারা ভিডিওটি দেখছে, তারা এটিকে কোনো গোপন বা আসন্ন হামলার বার্তা ভেবে আতঙ্কিত হয়ে পড়ছে।
বোল্ডউইন পার্ক পুলিশ সতর্ক করে জানিয়েছে, তারা প্রতিটি হুমকির পেছনের ডিজিটাল আইপি ঠিকানা ও অ্যাকাউন্টের সন্ধান করছে। কোনো শিক্ষার্থী যদি মজা করার উদ্দেশ্যেও এই ধরনের কনটেন্ট তৈরি করে কিংবা শেয়ার করে, তবে তাকেও ডিজিটাল সাইবার অপরাধ ও হুমকি দেওয়ার অভিযোগে আইনের মুখোমুখি হতে হবে। মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা ও স্থানীয় পুলিশ ডিপার্টমেন্টগুলো যৌথভাবে এই সাইবার কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করছে।


অভিভাবক ও স্কুল কর্তৃপক্ষের পদক্ষেপ
ঘটনার ভয়াবহতা বিবেচনা করে স্থানীয় স্কুল ডিস্ট্রিক্টগুলো অভিভাবকদের উদ্দেশ্যে চিঠি পাঠিয়েছে। সেখানে সন্তানদের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের গতিবিধি নজরদারিতে রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। শিশুদের সাথে খোলামেলা আলোচনা করে এই ট্রেন্ডের আসল সত্যতা বুঝিয়ে বলার আহ্বান জানানো হয়েছে, যাতে তারা অহেতুক ভয় না পায়।


শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে সাময়িকভাবে পুলিশি পাহারা বাড়ানো হয়েছে। কোনো সন্দেহজনক পোস্ট চোখে পড়লে তা সঙ্গে সঙ্গে বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ বা স্থানীয় পুলিশ লাইনে জানানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ভিডিওটি লাইক, কমেন্ট বা শেয়ার করে প্রচারণা বাড়াতে নিষেধ করা হয়েছে, কারণ এতে অন্য শিশুদের মাঝে উদ্বেগ আরও বাড়ে। আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো জানিয়েছে, প্রযুক্তি মানুষকে বিনোদন দেওয়ার পাশাপাশি অপব্যবহারের সুযোগও করে দেয়, আর এই ধরনের ট্রেন্ডের ক্ষেত্রে সচেতনতাই একমাত্র সমাধানের পথ।
সহজ কথায়, সামাজিক মাধ্যমের এই প্রবণতা সম্পূর্ণ ভুয়া ও মনগড়া হলেও এর প্রভাব বাস্তব জীবনের নিরাপত্তায় বিঘ্ন ঘটাচ্ছে। পুলিশ ও আইনি ব্যবস্থার মাধ্যমে এর লাগাম টানার চেষ্টা চলছে।


সিএসবি নিউজ-এর আরও খবর