ইরানের তেল সম্পদ দখলে রাখার ইঙ্গিত দিয়ে ট্রাম্পের বিতর্কিত নতুন মন্তব্য

আইরিশ ওপেন গলফ প্রতিযোগিতার ফাঁকে আয়ারল্যান্ড সফরে গিয়ে ইরানের তেল সম্পদের ওপর আধিপত্য বজায় রাখার আভাস দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট।

ইরানের তেল সম্পদ দখলে রাখার ইঙ্গিত দিয়ে ট্রাম্পের বিতর্কিত নতুন মন্তব্য

ইরানের তেল সম্পদ দখলে রাখার ইঙ্গিত দিয়ে ট্রাম্পের বিতর্কিত নতুন মন্তব্য


আয়ারল্যান্ড সফরে থাকা মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এক চাঞ্চল্যকর ও বিতর্কিত বক্তব্য দিয়েছেন। তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, যুক্তরাষ্ট্র চাইলে ইরানে নিজেদের অবস্থান বজায় রাখতে পারে এবং দেশটির বিশাল তেল সম্পদের ওপর নিজস্ব নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারে। এর আগে দক্ষিণ আমেরিকার দেশ ভেনিজুয়েলার মোট তেল সম্পদের এক-পঞ্চমাংশের ওপর নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার যে চেষ্টা ওয়াশিংটন চালিয়েছিল, সেই চুক্তির সঙ্গে ইরানের বর্তমান পরিস্থিতির তুলনা টেনেছেন তিনি। আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক মহলে তার এই বক্তব্য ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।  


ডুনবেগে নিজের গলফ কোর্সে সফরকালে গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে ট্রাম্প পুনর্ব্যক্ত করেন যে, মধ্যপ্রাচ্যে চলমান এই সসংঘাত চলতি বছরের মধ্যেই শেষ হয়ে যাবে বলে তিনি আশা করছেন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নভেম্বরে নির্ধারিত মধ্যবর্তী নির্বাচনের পরপরই যুদ্ধ পরিস্থিতির অবসান ঘটতে পারে বলে তিনি ধারণা প্রকাশ করেছেন। আয়ারল্যান্ডে আয়োজিত আইরিশ ওপেন গলফ টুর্নামেন্টে বক্তব্য রাখার সময় তিনি আরও দাবি করেন, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ বা সংকট শেষ হওয়া মাত্রই আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের মূল্য চরম মাত্রায় কমে যাবে এবং সাধারণ মানুষের জ্বালানি খরচ নাটকীয়ভাবে নেমে আসবে।  
তবে ট্রাম্পের এই ধরনের মন্তব্যের সত্যতা এবং বাস্তব ভিত্তি নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন উঠেছে। তথ্য যাচাই বা ফ্যাক্ট চেক বিশ্লেষণে দেখা যায়, ট্রাম্প দাবি করেছেন যে ইরান টানা শান্তির জন্য ওয়াশিংটনের সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা করছে। অথচ তেহরানের সরকারি প্রতিনিধি ও আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক সূত্র এই দাবি সম্পূর্ণ অস্বীকার ও প্রত্যাখ্যান করেছে। ইরান পূর্বেও স্পষ্ট করে জানিয়েছে যে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে এ ধরনের কোনো পরোক্ষ বা প্রত্যক্ষ দ্বিপাক্ষিক আলোচনা চলছে না এবং মার্কিন প্রশাসনের পক্ষ থেকে ছড়ানো এমন দাবি বাজারে বিভ্রান্তি সৃষ্টির কৌশল মাত্র।  


একই সঙ্গে ভেনিজুয়েলা সম্পর্কিত ট্রাম্পের দাবিটি আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞ এবং অর্থনীতিবিদদের মতে সত্যের অপলাপ। কোনো স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্রের প্রাকৃতিক সম্পদ জোরপূর্বক দখল করে বা চুক্তি ছাড়াই অন্য দেশের যুদ্ধের খরচ মেটানো আন্তর্জাতিক নীতি ও জাতিসংঘ সনদের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। সার্বভৌম দেশের তেল সম্পদ নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখা বিষয়ক মার্কিন নীতি কেবল ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা বাড়াবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।


মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতায় বিশ্বব্যাপী জ্বালানি বাজার অত্যন্ত সংবেদনশীল রূপ নিয়েছে। সম্প্রতি সৌদি আরবের একটি প্রধান তেলের পাইপলাইনে হামলার পর বিশ্ববাজারে তেলের দর আবার আকাশচুম্বী হওয়ার আশঙ্কায় রয়েছে আন্তর্জাতিক তেল ব্যবসায়ীরা। এই অস্থিরতার মধ্যে ট্রাম্প জোর দিয়ে বলেছেন যে, তিনি কেবল সঠিক এবং যুক্তরাষ্ট্রের লাভজনক কোনো চুক্তিতেই সম্মতি দেবেন, কোনো দুর্বল সমঝোতা করবেন না।


তবে এর পাশাপাশি তিনি ইরানের বিষয়ে দীর্ঘমেয়াদে যুক্ত থাকার এবং উপস্থিতি বজায় রাখার নতুন বিকল্পও উত্থাপন করেন। গত আগস্ট মাসে ভেনিজুয়েলার সঙ্গে ঘোষিত বহুল আলোচিত চুক্তির প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, আমরা শেষ পর্যন্ত ইরান থেকে সরে আসব, যদি না আমরা সেখানে থাকার সিদ্ধান্ত নিই এবং ভেনিজুয়েলার মতো দেশটির তেল সম্পদ নিজেদের দখলে রাখি। তার দাবি অনুসারে, ভেনিজুয়েলা থেকে মার্কিন রাজস্ব আয় ইতিমধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ও যুদ্ধসংক্রান্ত ব্যয়ের বহু গুণ অর্থ পুনরুদ্ধার করে দিয়েছে।  


ইরানের ভূ-রাজনৈতিক গুরুত্ব এবং কৌশলগত অবস্থান বিশ্ব অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত সংবেদনশীল। প্রণালী ও আন্তর্জাতিক নৌপথ দিয়ে জ্বালানি সরবরাহের ধারাবাহিকতা বাধাগ্রস্ত হলে সংকট তীব্র হয়ে ওঠে। এই পরিস্থিতিতে মার্কিন প্রেসিডেন্টের এমন অনড় ও দখলদারি মনোভাবের বক্তব্য বিশ্ব অর্থনীতি ও জ্বালানি বাজারে নতুন অনিশ্চয়তার মেঘ ঘনীভূত করছে। কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, যুদ্ধের মূল উদ্দেশ্য হিসেবে অন্য দেশের খনিজ ও তেল সম্পদ দখলে রাখার মন্তব্য আন্তর্জাতিক সম্পর্কে মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে এবং মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধবিরতির সম্ভাবনাকে আরও জটিল করে তুলতে পারে।


সিএসবি নিউজ-এর আরও খবর