দিল্লিতে ‘দাফন’ আওয়ামী লীগের গুলশানে প্রত্যাবর্তনের বার্তা
বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তোলা একটি ঘটনা। ‘দিল্লিতে দাফন’—সরকারের এই রাজনৈতিক ঘোষণার বিপরীতে গুলশানের রাস্তায় কয়েকশ মানুষের আকস্মিক উপস্থিতি অন্তত একটি প্রশ্ন রেখে গেছে: আওয়ামী লীগ কি সত্যিই মাঠ থেকে বিলীন হয়ে গেছে, নাকি দৃশ্যমান নেতৃত্বের আড়ালে তার একটি অংশ এখনো সংগঠিত হওয়ার সক্ষমতা ধরে রেখেছে?
দিল্লিতে ‘দাফন’ আওয়ামী লীগের গুলশানে প্রত্যাবর্তনের বার্তা
আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক অস্তিত্ব ‘শেষ’, দলটির ‘দাফন হয়ে গেছে দিল্লিতে’—সরকারের পক্ষ থেকে গত কয়েক মাস ধরে দেওয়া এমন ধারাবাহিক রাজনৈতিক বার্তার মধ্যেই রাজধানীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর এলাকাগুলোর একটি গুলশানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠনের ১৫০ থেকে ২০০ নেতাকর্মীর ঝটিকা মিছিল নতুন প্রশ্ন সামনে এনেছে।
শুক্রবার বেলা পৌনে ১২টার দিকে গুলশান থানার ৩ নম্বর সড়কের কেএফসি-সংলগ্ন একটি গলিতে হঠাৎ জড়ো হন আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠনের বিপুলসংখ্যক নেতাকর্মী। পুলিশ তাদের ছত্রভঙ্গ করার চেষ্টা করলে মিছিলকারীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষের পরিস্থিতি তৈরি হয়। পুলিশের দাবি, এ সময় তাদের দিকে ককটেল নিক্ষেপ করা হয় এবং দুটি ককটেল বিস্ফোরিত হয়। পরে পুলিশ রাবার বুলেট ছুড়ে মিছিলটি ছত্রভঙ্গ করে। ঘটনাস্থল থেকে পাঁচটি ককটেল উদ্ধারের কথাও জানিয়েছে পুলিশ।
ঘটনাটি শুধু একটি ঝটিকা মিছিলের কারণে আলোচনায় আসেনি। এর আসল তাৎপর্য তৈরি হয়েছে স্থান, সময় এবং অংশগ্রহণকারীর সংখ্যাএই তিনটি কারণে।
গুলশান শুধু ঢাকার অভিজাত আবাসিক ও বাণিজ্যিক এলাকা নয়; এখানেই রয়েছে বিপুলসংখ্যক বিদেশি দূতাবাস, হাইকমিশন, আন্তর্জাতিক সংস্থা ও কূটনৈতিক প্রতিনিধিদের কার্যালয়। সরকারি অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের তালিকায় ইউরোপীয় ইউনিয়নের ডেলিগেশন, অস্ট্রেলিয়ার হাইকমিশনসহ একাধিক কূটনৈতিক মিশনের গুলশান ও আশপাশের ঠিকানা রয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের নিজস্ব তথ্যেও গুলশান এলাকায় একাধিক সদস্যরাষ্ট্রের দূতাবাসের অবস্থানের কথা উল্লেখ আছে।
অর্থাৎ, এমন একটি এলাকায় কয়েকশ মানুষের রাজনৈতিক মিছিল কেবল বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির প্রশ্ন নয়। এটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা সম্পর্কে বিদেশি কূটনৈতিক মহলের পর্যবেক্ষণের ক্ষেত্রেও তাৎপর্যপূর্ণ একটি দৃশ্য।
‘দাফন’ হয়ে গেলে গুলশানে এত মানুষ কোথা থেকে?
গত ৪ জুলাই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছিলেন, আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক পতন হয়েছে, দলটি রাজনৈতিকভাবে নির্মূল হয়েছে এবং ‘দাফন হয়ে গেছে দিল্লিতে’। একই বক্তব্যে তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ বাংলাদেশে আর কোনোদিন রাজনীতি করতে পারবে না। সরকারের এই রাজনৈতিক মূল্যায়নের সঙ্গে শুক্রবারের গুলশানের বাস্তব দৃশ্যের একটি স্পষ্ট পার্থক্য তৈরি হয়েছে।
কারণ, একটি নিষিদ্ধ দলের কয়েকজন বিচ্ছিন্ন কর্মী কোথাও স্লোগান দিলে সেটিকে সংগঠনের অস্তিত্বের প্রমাণ বলা যায় না। কিন্তু ১৫০ থেকে ২০০ জনের একটি দল একই সময়ে, রাজধানীর অত্যন্ত নিরাপদ ও উচ্চ-নজরদারির এলাকায় জড়ো হয়ে মিছিলের চেষ্টা করেছে এটি অন্তত দেখিয়ে দেয় যে আওয়ামী লীগের সমর্থক বা কর্মীদের একটি অংশ এখনো সংগঠিত হওয়ার সক্ষমতা ধরে রেখেছে। পুলিশের বক্তব্য অনুযায়ী, তারা আকস্মিকভাবে সেখানে জড়ো হয়েছিল।
আর এখানেই সরকারের ‘আওয়ামী লীগের আর কোনো অস্তিত্ব নেই’—এই রাজনৈতিক দাবির সঙ্গে মাঠের বাস্তবতার সংঘাতটি সবচেয়ে স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
নেতৃত্বে কেন্দ্রীয় মুখ নেই, তবু সংগঠিত উপস্থিতি
ঘটনাটির আরেকটি দিকও গুরুত্বপূর্ণ। প্রকাশিত প্রতিবেদনগুলোতে মিছিলটির সঙ্গে কোনো পরিচিত কেন্দ্রীয় বা মহানগর পর্যায়ের শীর্ষ নেতার নেতৃত্বের কথা উঠে আসেনি। বরং পুলিশ ও সংবাদমাধ্যমের বর্ণনায় এটি ছিল আকস্মিকভাবে জড়ো হওয়া নেতাকর্মীদের একটি ঝটিকা মিছিল।এটি আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক শক্তির পূর্ণাঙ্গ প্রমাণ নয়—কিন্তু ভিন্ন একটি প্রশ্ন অবশ্যই তৈরি করে।
কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব দৃশ্যমান না থেকেও যদি শতাধিক কর্মী রাজধানীর একটি কূটনৈতিক ও উচ্চ-নিরাপত্তা এলাকায় সমন্বিতভাবে জড়ো হতে পারেন, তাহলে দলটির তৃণমূল পর্যায়ের নেটওয়ার্ক আসলে কতটা নিষ্ক্রিয় হয়েছে? এই প্রশ্নই শুক্রবারের ঘটনাকে সাধারণ একটি ঝটিকা মিছিলের চেয়ে বড় রাজনৈতিক ঘটনায় পরিণত করেছে।
গুলশান কেন গুরুত্বপূর্ণ?
গুলশান বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক বাস্তবতায় প্রতীকীভাবেও গুরুত্বপূর্ণ। এখানে রয়েছে বিদেশি কূটনৈতিক মিশন, আন্তর্জাতিক সংস্থা ও বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের উপস্থিতি। ফলে গুলশানের রাস্তায় কয়েকশ মানুষের রাজনৈতিক মিছিল দেশের অন্যান্য এলাকার একটি বিচ্ছিন্ন মিছিলের মতো নয়।
বিশেষ করে আওয়ামী লীগকে ঘিরে সরকার যখন দেশ-বিদেশে একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক বার্তা প্রতিষ্ঠা করতে চাইছে দলটি রাজনৈতিকভাবে শেষ, তার কোনো ভবিষ্যৎ নেই এবং বাংলাদেশে তার পুনরাগমনের সুযোগ নেই—ঠিক সেই সময়ে কূটনৈতিক উপস্থিতিসম্পন্ন এলাকায় এমন প্রকাশ্য জমায়েত সেই বার্তাকে অন্তত প্রশ্নের মুখে ফেলেছে।
এখানে বিষয়টি আওয়ামী লীগ আবার ক্ষমতায় ফিরবে কি না—সেটি নয়। বিষয়টি হলো, একটি নিষিদ্ধ দলের সাংগঠনিক ও সামাজিক উপস্থিতি সম্পূর্ণ বিলীন হয়েছে বলে যে রাজনৈতিক ধারণা দেওয়া হচ্ছে, মাঠের একটি ঘটনা কি তার সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ? শুক্রবারের গুলশান সেই প্রশ্নটিই সামনে এনেছে।
মিছিলের বার্তা: ‘আমরা এখনো আছি’
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে মিছিলকারীদের ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দিতে দেখা গেছে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে মিছিলটিকে আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীদের কর্মসূচি হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছে।ফলে মিছিলটির রাজনৈতিক বার্তাকে নিছক উপস্থিতি জানান দেওয়া হিসেবে দেখার সুযোগও রয়েছে।
বিশেষ করে দীর্ঘদিন আত্মগোপন, গ্রেপ্তার-আতঙ্ক এবং সাংগঠনিক নিষেধাজ্ঞার মধ্যে থাকা কর্মীরা যদি রাজধানীর সবচেয়ে দৃশ্যমান এলাকাগুলোর একটিতে এসে প্রকাশ্যে নিজেদের পরিচয় ও রাজনৈতিক স্লোগান তুলে ধরতে পারেন, তাহলে সেটি একটি প্রতীকী রাজনৈতিক বার্তা বহন করে—সংগঠনটি নিষিদ্ধ হতে পারে, কিন্তু এর সব কর্মী-সমর্থক রাজনৈতিকভাবে অদৃশ্য হয়ে যায়নি।
তবে সেই বার্তার সঙ্গে সহিংসতার অভিযোগও যুক্ত হয়েছে। পুলিশ বলছে, ককটেল বিস্ফোরণ হয়েছে এবং পাঁচটি ককটেল উদ্ধার করা হয়েছে। এ কারণে ঘটনাটিকে শুধু শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক কর্মসূচি হিসেবে বর্ণনা করা যাবে না।
পুলিশের জন্যও বড় প্রশ্ন?
গুলশানের মতো উচ্চ-নিরাপত্তা ও কূটনৈতিক উপস্থিতিসম্পন্ন এলাকায় ১৫০ থেকে ২০০ মানুষ একত্রিত হওয়ার আগ পর্যন্ত আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলো কেন তা শনাক্ত করতে পারেনি—এ প্রশ্ন ইতোমধ্যে উঠেছে। এ নিয়ে সংবাদমাধ্যমেও প্রশাসন ও গোয়েন্দা সংস্থার নজরদারি নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে।
পরদিন এ ঘটনায় গ্রেপ্তারের সংখ্যা আরও বেড়েছে এবং আদালত গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদের জন্য রিমান্ড মঞ্জুর করেছে। বাসসের প্রতিবেদনে ২৫ জনের রিমান্ডের কথা বলা হয়েছে; অন্য প্রতিবেদনে গ্রেপ্তারের সংখ্যা আরও বেশি হওয়ার তথ্য এসেছে।
অর্থাৎ ঘটনাটি এখন আর কেবল একটি মিছিলের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর গোয়েন্দা সক্ষমতা, নিষিদ্ধ দলের সাংগঠনিক সক্ষমতা এবং সরকারের রাজনৈতিক মূল্যায়নের বিশ্বাসযোগ্যতার প্রশ্ন।
‘দিল্লিতে দাফন’—রাজনৈতিক দাবির সামনে গুলশানের বাস্তবতা
রাজনীতিতে কোনো দলকে নিষিদ্ধ করা এবং সেই দলের রাজনৈতিক-সামাজিক ভিত্তি রাতারাতি বিলীন হয়ে যাওয়া এক বিষয় নয়। একটি সংগঠন রাষ্ট্রীয়ভাবে নিষিদ্ধ হওয়ার পরও তার কর্মী, সমর্থক ও স্থানীয় নেটওয়ার্ক কিছু সময় সক্রিয় থাকতে পারে।শুক্রবারের গুলশান মিছিল সেই বাস্তবতারই একটি দৃশ্যমান উদাহরণ হতে পারে।
এটি আওয়ামী লীগের পুনরুত্থানের প্রমাণ নয়। একইভাবে একটি মিছিলকে কেন্দ্র করে দলটির ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক সাফল্যের ভবিষ্যদ্বাণীও করা যায় না।
কিন্তু সরকারের পক্ষ থেকে যখন বলা হচ্ছে আওয়ামী লীগ রাজনৈতিকভাবে ‘নির্মূল’ এবং ‘দিল্লিতে দাফন’ হয়ে গেছে, তখন রাজধানীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলোর একটিতে শতাধিক নেতাকর্মীর সংগঠিত উপস্থিতি সেই দাবির বাস্তব ভিত্তি নিয়ে প্রশ্ন তোলার যথেষ্ট কারণ তৈরি করেছে।
আর সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো—এই প্রশ্নটি তৈরি হয়েছে এমন একটি এলাকায়, যেখানে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে বিদেশি কূটনীতিক ও আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিনিধিদের সরাসরি উপস্থিতি রয়েছে।
তাই গুলশানের শুক্রবারের মিছিলকে শুধু একটি ঝটিকা কর্মসূচি হিসেবে দেখলে ঘটনাটির রাজনৈতিক তাৎপর্য কমিয়ে দেখা হবে। এটি একই সঙ্গে আওয়ামী লীগের তৃণমূল সাংগঠনিক সক্ষমতা, সরকারের রাজনৈতিক মূল্যায়ন এবং বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তোলা একটি ঘটনা।‘দিল্লিতে দাফন’ সরকারের এই রাজনৈতিক ঘোষণার বিপরীতে গুলশানের রাস্তায় কয়েকশ মানুষের আকস্মিক উপস্থিতি অন্তত একটি প্রশ্ন রেখে গেছে:
আওয়ামী লীগ কি সত্যিই মাঠ থেকে বিলীন হয়ে গেছে, নাকি দৃশ্যমান নেতৃত্বের আড়ালে তার একটি অংশ এখনো সংগঠিত হওয়ার সক্ষমতা ধরে রেখেছে?