১০৫ হাজার কোটি টাকার নতুন পে স্কেল টেকসই অর্থায়নের বড় চ্যালেঞ্জ

নতুন পে স্কেলে সরকারি চাকুরিজীবীদের স্বস্তি মিললেও বিপুল বাজেট ঘাটতি, মূল্যস্ফীতি ও বেসরকারি খাতের আয়ের বৈষম্য বাড়ার তীব্র ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।

১০৫ হাজার কোটি টাকার নতুন পে স্কেল টেকসই অর্থায়নের বড় চ্যালেঞ্জ

১০৫ হাজার কোটি টাকার নতুন পে স্কেল টেকসই অর্থায়নের বড় চ্যালেঞ্জ


সরকারি কর্মচারীদের দীর্ঘদিনের মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির কারণে বেতন পুনর্নির্ধারণের স্বস্তি এলেও রাষ্ট্রের সার্বিক অর্থনীতির ওপর এটি এক বিরাট চাপ সৃষ্টি করেছে। বছরে অতিরিক্ত এক লাখ পাঁচ হাজার পাঁচশত আশি কোটি টাকার এই স্থায়ী ব্যয় বহন করার সক্ষমতা সরকারের রাজস্ব কাঠামোর আছে কি না, তা নিয়ে অর্থনীতিবিদদের মধ্যে গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। এই জাতীয় স্থায়ী ব্যয় প্রতি বছরের বাজেটে বাধ্যতামূলকভাবে যুক্ত হয়, যা রাজস্ব আদায় কমে গেলেও বা অন্য কোনো অর্থনৈতিক সংকট দেখা দিলেও কমানো সম্ভব নয়। ফলে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সামাজিক সুরক্ষা ও নতুন পরিকাঠামো উন্নয়নের বাজেট সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা চরম রূপ নিচ্ছে।


অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক সেলিম রায়হানের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, কার্যকর রাজস্ব সংস্কার ছাড়া এই বিপুল পরিমাণ অর্থ সংস্থান করা প্রায় অসম্ভব। বর্তমানে দেশে রাজস্ব আদায়ের দুর্বলতা বহু বছরের পুরনো সমস্যা, যেখানে প্রতি বছর উচ্চাভিলাষী লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে বড় ঘাটতি থেকে যায়। করের আওতা না বাড়িয়ে, কর ফাঁকি না থামিয়ে এবং প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি জোরদার না করে পে স্কেল বাস্তবায়ন করলে তা বাজেট ঘাটতি, ঋণ অথবা উন্নয়ন খাতের খরচ ছাঁটাইয়ে গিয়ে ঠেকবে। সরকার যদি এই বাড়তি ব্যয়ের জোগান দিতে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে অতিরিক্ত ঋণ গ্রহণ করে, তবে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হবে। এতে নতুন শিল্প স্থাপন, বেসরকারি বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান ব্যাপকভাবে ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকি থেকে যায়।


এছাড়া নতুন পে স্কেলের ফলে অর্থনীতিতে মূল্যস্ফীতির দ্বিতীয় ধাক্কা আসার আশঙ্কা রয়েছে। বাজারে অতিরিক্ত অর্থের প্রবাহ সরবরাহ বৃদ্ধি ব্যতিরেকে ঘটে থাকলে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য ও সেবার দাম দ্রুত বেড়ে যাবে। ফলে সরকারি চাকুরিজীবীদের নামমাত্র আয় বাড়লেও তাদের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা হ্রাস পাবে। অন্যদিকে অনানুষ্ঠানিক ও বেসরকারি খাতের কোটি কোটি মানুষ, যাদের আয় বৃদ্ধি পায়নি, তারা চরম আর্থিক সংকটে পড়বেন। দেশের বিশাল জনসংখ্যার বেসরকারি কর্মী ও সরকারি কর্মচারীদের মধ্যে আয়ের বৈষম্য আরও প্রকট হয়ে সামাজিক অসন্তোষের জন্ম দিতে পারে।


ইতিপূর্বে বেতন বৃদ্ধির সময় যুক্তি দেওয়া হয়েছিল যে এতে সরকারি খাতে দুর্নীতি কমবে এবং কাজের গতি ও সেবার মান বৃদ্ধি পাবে। তবে বাস্তব অভিজ্ঞতা বলে, কেবল বেতন বৃদ্ধি করে প্রশাসনিক দুর্নীতি রোধ করা যায় না। কাজের মূল্যায়ন, শক্তিশালী অডিট, পূর্ণাঙ্গ ডিজিটালাইজেশন এবং শাস্তির নিশ্চয়তা না থাকলে নাগরিকরা কেবল একটি ব্যয়বহুল আমলাতন্ত্রই উপহার পাবেন। তাই প্রতি দশ বছরে একবার বড় লাফ দিয়ে বেতন না বাড়িয়ে মূল্যস্ফীতি, রাজস্ব আয় ও উৎপাদনশীলতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নিয়মভিত্তিক স্বয়ংক্রিয় সমন্বয় ব্যবস্থা চালু করাই দীর্ঘমেয়াদে টেকসই সমাধান হতে পারে। রাষ্ট্রীয় আর্থিক স্থিতিশীলতা রক্ষা করে রাজস্ব বৃদ্ধি ও প্রশাসনিক জবাবদিহিতা নিশ্চিত করাই এখন সময়ের প্রধান দাবি।


সিএসবি নিউজ-এর আরও খবর