গাজায় আমেরিকা অসাধারণ কাজ করেছে বলে আয়ারল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকে বিতর্কিত মন্তব্য করলেন ট্রাম্

আইরিশ প্রধানমন্ত্রী মাইকেল মার্টিনের সঙ্গে বৈঠককালে গাজায় যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা নিয়ে কথা বলছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।

গাজায় আমেরিকা অসাধারণ কাজ করেছে বলে আয়ারল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকে বিতর্কিত মন্তব্য করলেন ট্রাম্

গাজায় আমেরিকা অসাধারণ কাজ করেছে বলে আয়ারল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকে বিতর্কিত মন্তব্য করলেন ট্রাম্


আয়ারল্যান্ড সফররত মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন যে গাজায় আমেরিকা অত্যন্ত অসাধারণ কাজ করেছে এবং বর্তমানে সেখানে কোনো রক্তক্ষয় বা বিশৃঙ্খলা ঘটছে না। আইরিশ প্রধানমন্ত্রী মাইকেল মার্টিনের সঙ্গে ডাবলিনে আয়োজিত যৌথ সংবাদ সম্মেলনে তিনি এই প্রতিক্রিয়া জানান। তবে তার এই বক্তব্য আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম, বিভিন্ন স্বাধিকার সংস্থা এবং মাঠপর্যায়ের পর্যবেক্ষকদের প্রতিবেদনের সম্পূর্ণ বিপরীতচিত্র ফুটিয়ে তুলেছে। ডাবলিনের রাষ্ট্রীয় বৈঠকে ট্রাম্প গাজা সংকটে নিজের নীতির প্রশংসা করলেও গাজার বাস্তব অবস্থা চরম মানবিক বিপর্যয়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।  


সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের মুখে পড়ে ট্রাম্প তার প্রশাসনের পদক্ষেপগুলোর ভূয়সী প্রশংসা করেন। তিনি উল্লেখ করেন যে গাজার পরিস্থিতি তার আমলে সফলভাবে সামাল দেওয়া হয়েছে এবং সেখানে শান্তি ও শৃঙ্খলা বজায় রাখতে যুক্তরাষ্ট্র মুখ্য ভূমিকা পালন করেছে। তবে একই মঞ্চে অবস্থানরত আইরিশ প্রধানমন্ত্রী মাইকেল মার্টিন মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের অবসান ও মানবিক সহায়তা পৌঁছানোর প্রয়োজনীয়তা নিয়ে সুর নরম রেখেই ট্রাম্পের নীতিগত অবস্থানের বিপরীতে যুক্তি তুলে ধরেন।  
আন্তর্জাতিক নির্ভরযোগ্য তথ্য ও মানবাধিকার সংস্থাগুলোর তথ্য পরীক্ষা করে দেখা গেছে যে ট্রাম্পের করা এসব দাবির সঙ্গে বাস্তবের ব্যাপক ব্যবধান রয়েছে। প্রথমত, গাজায় বর্তমানে কিছুই ঘটছে না বলে ট্রাম্প যে দাবি করেছেন তা সম্পূর্ণ অসত্য। গাজা উপত্যকায় ক্রমাগত সামরিক অভিযান, বিমান হামলা এবং অবরুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে প্রতিদিন বেসামরিক মানুষের প্রাণহানি ঘটছে। বাড়িঘর হারিয়ে লাখ লাখ ফিলিস্তিনি তাঁবুতে মানবেতর জীবনযাপন করতে বাধ্য হচ্ছেন। চিকিৎসাসেবা ও খাদ্য সরবরাহের তীব্র ঘাটতিতে পুরো অঞ্চল জুড়ে এক অভূতপূর্ব দুর্ভিক্ষ অবস্থা বিরাজ করছে।  


দ্বিতীয়ত, আমেরিকা অত্যন্ত ভালো কাজ করেছে বলে ট্রাম্পের দেওয়া বক্তব্যটি অত্যন্ত বিভ্রান্তিকর। সমালোচক এবং আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন যে যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যে কার্যকর শান্তি প্রতিষ্ঠার বদলে ইসরায়েলকে বিপুল পরিমাণ সামরিক ও রাজনৈতিক সমর্থন যুগিয়ে গেছে। জাতিসংঘের বহু চেষ্টা সত্ত্বেও মার্কিন নীতি ও ভেটো ক্ষমতার ব্যবহারের ফলে সেখানে স্থায়ী অস্ত্রবিরতি বাস্তবায়ন ব্যাহত হয়েছে। বিশ্বজুড়ে নিরপেক্ষ তদারকি সংস্থাগুলো গাজার বর্তমান অবস্থাকে গণহত্যা ও মানবিক বিপর্যয় হিসেবে বর্ণনা করছে।  


ট্রাম্পের এই আয়ারল্যান্ড সফরকে কেন্দ্র করে আয়ারল্যান্ডের জনগণের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। ডাবলিনের কেন্দ্রস্থলে এবং আয়ারল্যান্ডের পার্লামেন্টের সামনে হাজার হাজার মানুষ রাজপথে নেমে ট্রাম্প বিরোধী বিশাল বিক্ষোভ মিছিল পরিচালনা করেন। আন্দোলনকারীরা ট্রাম্পের ছবি সংবলিত ব্যানার এবং ফিলিস্তিনের পতাকা হাতে নিয়ে গাজায় গণহত্যার বিরোধিতা করেন এবং ট্রাম্পের যুদ্ধভিত্তিক পররাষ্ট্রনীতির প্রতিবাদ জানান। বিক্ষোভে অংশ নেওয়া জনগণ স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেন যে আয়ারল্যান্ডের মাটি থেকে গাজার প্রতি এই অবিচারের কোনো সমর্থন দেওয়া হবে না। যদিও সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প দাবি করেন যে তিনি ডাবলিনে কোনো ধরনের বিক্ষোভের কথা জানেন না বা মিছিল দেখতে পাননি।  


আইরিশ নেতৃত্বের রাজনৈতিক অঙ্গনেও এই সফরের প্রভাব পড়েছে। আয়ারল্যান্ডের প্রেসিডেন্ট ক্যাথরিন কনলি ট্রাম্পের সঙ্গে বন্ধ দরজার বৈঠকে স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দেন যে যুদ্ধ ও মানবসংহারকে স্বাভাবিক হিসেবে মেনে নেওয়ার সুযোগ কোনো জাতির নেই। আয়ারল্যান্ডের জনগণ দীর্ঘ ইতিহাসজুড়ে ঔপনিবেশিক শোষণ ও দুর্ভিক্ষের অভিজ্ঞতা পার করে এসেছে বলেই তারা ফিলিস্তিনের মুক্তিকামী মানুষ ও বেসামরিক নাগরিকেদের অধিকারের পক্ষে সুদৃঢ় অবস্থান নিয়ে থাকে। ক্যাথরিন কনলি ডাবলিনের পক্ষ থেকে বিশ্বজুড়ে আন্তর্জাতিক আইন ও মানবিক মূল্যবোধ রক্ষার যে বার্তা দেন, তা ট্রাম্পের মন্তব্যের সরাসরি বিপরীতে অবস্থান নেয়।  
সংবাদ সম্মেলনে ট্রাম্প গাজা পরিস্থিতি ছাড়াও আইরিশ পুনরেকত্রীকরণ এবং উত্তর আয়ারল্যান্ড ইস্যুতে মতামত দিয়ে যুক্তরাজ্যের রাজনীতিতে নতুন বিবাদের জন্ম দেন। তিনি প্রকাশ্যেই বলেন যে তিনি একীভূত আয়ারল্যান্ড দেখতে বেশ পছন্দ করবেন, যা লন্ডন ও বেলফাস্টের ইউনিয়নবাদী নেতাদের কাছে অসন্তোষের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। ট্রাম্পের একের পর এক বিতর্কিত মন্তব্য ও বাস্তবতাবিমুখ বক্তব্য তার রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির চরম অসংলগ্নতাকে স্পষ্ট করে তুলেছে।  


গাজার প্রকৃত সত্য তুলে ধরতে গিয়ে মাঠপর্যায়ের ত্রাণ সরবরাহকারী আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো জানিয়েছে যে গাজায় দ্রুত ও নিরবচ্ছিন্ন মানবিক ত্রাণ না পৌঁছালে সেখানে অনাহার ও রোগে প্রাণহানির সংখ্যা আরও বহু গুণে বেড়ে যাবে। ট্রাম্পের তৈরি করা এই কাল্পনিক ও বিভ্রান্তিকর চিত্র গাজার ফিলিস্তিনিদের প্রতিদিনের চরম সংগ্রাম ও কষ্টকে সম্পূর্ণ অস্বীকার করে। মার্কিন প্রেসিডেন্টের এই প্রতিক্রিয়া বিশ্ব কূটনীতিতে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে এবং তার এই নীতি বিশ্বজুড়ে গভীর উদ্বেগ তৈরি করেছে।  


বিশ্ব রাজনীতিতে গাজা ইস্যু এখন একটি বড় পরীক্ষার ক্ষেত্র হিসেবে হাজির হয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের অন্যতম সদস্য হিসেবে আয়ারল্যান্ডের পক্ষ থেকে শান্তি ও ন্যায়বিচারের যে তাগিদ দেওয়া হয়েছে, তা ট্রাম্পের নিজস্ব প্রচারণার সঙ্গে স্পষ্ট বৈপরীত্য ফুটিয়ে তোলে। সামনের দিনগুলোতে এই মন্তব্যের জেরে আটলান্টিকের উভয় পারের কূটনৈতিক সম্পর্কে কীভাবে প্রভাব পড়ে, তা পর্যবেক্ষণ করছেন বিশ্ব রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।


সিএসবি নিউজ-এর আরও খবর