যুক্তরাষ্ট্রের ২৩ বছরের খরা কাটাতে ফাইনালের মহারণে বেন শেলটন

নিউইয়র্কের ফ্ল্যাশিং মেডোজে ইউএস ওপেনের ট্রফি জয়ের লক্ষ্যে কোর্টে আমেরিকান টেনিস তারকা বেন শেলটনের দারুণ এক পারফরম্যান্সের মুহূর্ত।

যুক্তরাষ্ট্রের ২৩ বছরের খরা কাটাতে ফাইনালের মহারণে বেন শেলটন

যুক্তরাষ্ট্রের ২৩ বছরের খরা কাটাতে ফাইনালের মহারণে বেন শেলটন


আমেরিকান টেনিসের দীর্ঘদিনের অপেক্ষার অবসান ঘটাতে এবার নিউইয়র্কের ফ্ল্যাশিং মেডোজে কোর্টে নামছেন তরুণ তুর্কি বেন শেলটন। ২০০৩ সালে অ্যান্ডি রডিকের ইউএস ওপেন জয়ের পর গত দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে কোনো আমেরিকান পুরুষ টেনিস তারকা দেশের মাটিতে প্রধান গ্র্যান্ড স্ল্যাম ট্রফি উঁচিয়ে ধরতে পারেননি। ২৩ বছর বয়সে রডিকের সেই ঐতিহাসিক কীর্তি পুনরাবৃত্তি করার এবং দেশের দীর্ঘ ২৩ বছরের শিরোপাহীনতার অবসান ঘটানোর কঠিন কিন্তু সম্ভাবনাময় এক মিশনে নেমেছেন এই উদীয়মান তারকা। নিজের দুর্দান্ত সার্ভিস এবং আক্রমণাত্মক খেলার শৈলী দিয়ে ইতোমধ্যে তিনি বিশ্ব টেনিস সার্কিটে বড় আলোড়ন সৃষ্টি করেছেন।


তথ্য যাচাই করলে দেখা যায় যে, আমেরিকান পুরুষ টেনিসের ইতিহাস এবং বর্তমান সময়ের পরিস্থিতির সাথে এই পরিসংখ্যানটি পুরোপুরি মিলে যায়। ২০০৩ সালে মাত্র ২১ বছর বয়সে অ্যান্ডি রডিক যখন ইউএস ওপেন জয় করেছিলেন, তখন কেউ ভাবেনি যে এটিই হতে যাচ্ছে দুই দশকের জন্য কোনো আমেরিকান পুরুষের শেষ ইউএস ওপেন বা গ্র্যান্ড স্ল্যাম জয়। পরবর্তীতে পিট সংপ্রাস বা আন্দ্রে আগাসির মতো কিংবদন্তিদের অবসরের পর আমেরিকান পুরুষ টেনিসে যে শূন্যতা তৈরি হয়েছিল, তা আর কোনো খেলোয়াড় পূরণ করতে পারেননি। রজার ফেদেরার, রাফায়েল নাদাল এবং নোভাক জকোভিচের মতো টেনিস দানবদের একচ্ছত্র আধিপত্যের যুগে আমেরিকানরা বারবার সেমিফাইনাল বা কোয়ার্টার ফাইনালেই থমকে গেছে। রডিকের পর দীর্ঘ দুই দশক পেরিয়ে গেলেও আর কোনো পুরুষ খেলোয়াড় যুক্তরাষ্ট্রের হয়ে দেশের মাটিতে এই বড় ট্রফিটি হাতে তুলতে পারেননি।
ঠিক এই দীর্ঘ খরার প্রেক্ষাপটে বেন শেলটনের উত্থানকে দেখা হচ্ছে এক নতুন সূর্যোদয় হিসেবে। ফ্লরিডা থেকে উঠে আসা এই বাঁহাতি তরুণ পেশাদার টেনিস সার্কিটে নিজের জানান দিয়েছেন খুব অল্প সময়েই। কলেজ টেনিস থেকে যাত্রা শুরু করে খুব দ্রুত আন্তর্জাতিক র‌্যাঙ্কিংয়ের শীর্ষ সারিতে উঠে আসেন তিনি। তার সবচেয়ে বড় শক্তিমত্তা হলো তার পাওয়ারফুল সার্ভিস। ঘণ্টায় প্রায় ১৪০ মাইলেরও বেশি গতিতে সার্ভিস করার ক্ষমতা তাকে প্রতিপক্ষের জন্য এক আতঙ্কে পরিণত করেছে। শুধু সার্ভিস নয়, কোর্টের চারপাশের গতিশীলতা, জোরালো ফোরহ্যান্ড এবং যেকোনো পরিস্থিতিতে চাপ সামলানোর মানসিক শক্তি তাকে সময়ের অন্যতম সেরা তরুণ প্রতিভা বানিয়ে তুলেছে।


চলতি ইউএস ওপেনে শেলটনের যাত্রা ছিল অসাধারণ। একের পর এক শক্তিশালী প্রতিপক্ষকে হারিয়ে তিনি টুর্নামেন্টের শেষ ধাপে নিজের জায়গা শক্ত করেছেন। ঘরের মাঠের দর্শকরাও তাকে ঘিরে বুক বেঁধেছেন এক বুক আশা নিয়ে। আর্থার অ্যাশ স্টেডিয়ামের গ্যালারি যখন ভক্তদের উল্লাসে মুখরিত হয়, তখন কোর্টে তার শক্তি বহুগুণ বেড়ে যায়। বড় মঞ্চে চাপকে জয় করে কীভাবে নিজের সেরাটা নিংড়ে দিতে হয়, তা ইতোমধ্যে তিনি প্রমাণ করেছেন। আগের বছরগুলোতে যেখানে সেমিফাইনালে গিয়ে তার অভিযান শেষ হয়েছিল, এবার সেখান থেকে শিক্ষা নিয়ে আরও পরিণত হয়ে কোর্টে ফিরেছেন এই তরুণ।


বিশ্লেষকদের মতে, রডিকের সেই ২০০৩ সালের ইতিহাস এবং আজকের শেলটনের পরিস্থিতির মধ্যে এক অদ্ভুত মিল রয়েছে। রডিক যেমন তরুণ বয়সে নিজের শক্তিশালী সার্ভিসকে অস্ত্র বানিয়ে বিশ্বজয় করেছিলেন, শেলটনের মধ্যেও ঠিক একই রকম তেজ এবং ক্ষমতা দেখা যাচ্ছে। তবে আজকের টেনিসের মান এবং প্রতিযোগিতা রডিকের সময়ের চেয়েও অনেক বেশি কঠিন। বিশ্বমঞ্চে এখন কার্লোস আলকারাজ এবং ইয়ানিক সিনারের মতো তরুণ প্রতিভাদের সাথে জকোভিচের মতো অভিজ্ঞ তারকাদের কঠিন চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হয়। তবুও শেলটনের সাম্প্রতিক ফর্ম এবং আত্মবিশ্বাস তাকে ফাইনালের অন্যতম দাবিদার করে তুলেছে।
আমেরিকান টেনিস সংস্থা এবং দেশটির সাবেক টেনিস তারকারাও শেলটনকে নিয়ে দারুণ আশাবাদী। তাদের মতে, আমেরিকার পুরুষ টেনিসে যে দীর্ঘ খরার ইতিহাস তৈরি হয়েছে, তা ভাঙার জন্য শেলটনের মতো একজন আক্রমণাত্মক এবং নির্ভীক খেলোয়াড়ই প্রয়োজন ছিল। তিনি যদি নিজের সার্ভিসের ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে পারেন এবং গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলোতে শান্ত থেকে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারেন, তবে ২৩ বছর পর ইউএস ওপেনের ট্রফি আবার কোনো আমেরিকান পুরুষের হাতেই শোভা পাবে।


সব মিলিয়ে নিউইয়র্কের হার্ড কোর্টে এখন ইতিহাস গড়ার অপেক্ষায় বেন শেলটন। কোটি কোটি আমেরিকান ভক্তের চোখ এখন তার দিকে। তরুণ এই তারকার কাঁধে এখন শুধু নিজের প্রথম গ্র্যান্ড স্ল্যাম জয়ের স্বপ্নই নয়, বরং নিজ দেশের দীর্ঘ ২৩ বছরের টেনিস গৌরব পুনরুজ্জীবিত করার বিশাল দায়িত্ব। এখন দেখার বিষয়, সব চাপ সামলে এই তরুণ ইতিহাস নতুন করে লিখতে পারেন কি না।


সিএসবি নিউজ-এর আরও খবর