১৮তম ব্রিকস সম্মেলনে নয়াদিল্লি ঘোষণাপত্রে স্বাক্ষর শেষে ঐক্যবদ্ধ অবস্থান প্রকাশ করছেন সদস্য রাষ্ট্রগুলোর শীর্ষ নেতৃবৃন্দ।

ভারতের আয়োজনে ঐতিহাসিক ব্রিকস সম্মেলন থেকে বিশ্ববাণিজ্যে ডলারের একচ্ছত্র আধিপত্য ও একতরফা শুল্কের বিরুদ্ধে কড়া বার্তা

১৮তম ব্রিকস সম্মেলনে নয়াদিল্লি ঘোষণাপত্রে স্বাক্ষর শেষে ঐক্যবদ্ধ অবস্থান প্রকাশ করছেন সদস্য রাষ্ট্রগুলোর শীর্ষ নেতৃবৃন্দ।

১৮তম ব্রিকস সম্মেলনে নয়াদিল্লি ঘোষণাপত্রে স্বাক্ষর শেষে ঐক্যবদ্ধ অবস্থান প্রকাশ করছেন সদস্য রাষ্ট্রগুলোর শীর্ষ নেতৃবৃন্দ।


ঘোষণাপত্রের প্রধান বার্তাগুলোর মধ্যে অন্যতম গুরুত্ব পেয়েছে বিশ্ব বাণিজ্য খাত থেকে ডলারের আধিপত্য হ্রাস বা 'ডি-ডলারাইজেশন' প্রক্রিয়া। গত কয়েক দশকে আন্তর্জাতিক লেনদেন, জ্বালানি কেনাবেচা এবং বিভিন্ন দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে মার্কিন ডলারের যে একচেটিয়া একক কর্তৃত্ব ছিল, তা ভেঙে ফেলার বিষয়ে জোরালো পদক্ষেপ নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। শীর্ষ সম্মেলনে অংশগ্রহণকারী রাষ্ট্র প্রধানেরা যৌথভাবে নিজেদের মধ্যকার দ্বিপাক্ষিক ও বহুপাক্ষিক বাণিজ্যে নিজস্ব জাতীয় মুদ্রা ব্যবহারের ওপর সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়ার বিষয়ে একমত হয়েছেন। শুধু নিজস্ব মুদ্রায় বাণিজ্য বাড়ানোই নয়, পাশাপাশি একটি বিকল্প আন্তর্জাতিক পেমেন্ট বা লেনদেন ব্যবস্থা গড়ে তোলার যৌথ উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে, যা বিদ্যমান পশ্চিমা নিয়ন্ত্রণাধীন ব্যবস্থাগুলোর ওপর নির্ভরতা অনেকটাই কমিয়ে আনবে। এই পদক্ষেপের মূল উদ্দেশ্য হলো উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলোকে পশ্চিমা আর্থিক নিষেধাজ্ঞা এবং মার্কিন মুদ্রানীতির হঠাৎ ওঠানামাজনিত ঝুঁকি থেকে মুক্ত রাখা।
বাণিজ্যিক ইস্যুর পাশাপাশি সম্মেলনে গুরুত্ব পেয়েছে সাম্প্রতিক বিশ্ব অর্থনীতির অন্যতম বড় বাধা 'একতরফা শুল্কনীতি' এবং সংরক্ষণবাদী মনোভাব। নির্দিষ্ট কয়েকটি পশ্চিমী দেশের চাপিয়ে দেওয়া অন্যায্য শুল্ক ও বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞার তীব্র বিরোধিতা করা হয়েছে এই নয়াদিল্লি ঘোষণাপত্রে। জোটের নেতারা স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন যে, বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার সার্বিক নিয়মকানুন লঙ্ঘন করে নিজস্ব স্বার্থে চাপিয়ে দেওয়া যেকোনো একতরফা অর্থনৈতিক বা বাণিজ্যিক সিদ্ধান্ত বিশ্ব সরবরাহ শৃঙ্খলকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করে। এই ধরনের পদক্ষেপ মূলত উন্নয়নশীল ও অনগ্রসর দেশগুলোর অর্থনৈতিক বৃদ্ধিকে চরম ঝুঁকির মুখে ফেলে দিচ্ছে। সেই কারণে মুক্ত, স্বচ্ছ, বৈষম্যহীন এবং নিয়মভিত্তিক একটি বিশ্ব বাণিজ্য ব্যবস্থা পুনরুদ্ধারের জন্য যৌথ অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছে ব্রিকস সদস্য দেশগুলো।
একই সাথে বৈশ্বিক কাঠামোগত পরিবর্তনের দাবিতে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের দ্রুত ও গঠনমূলক সংস্কারের বার্তা দেওয়া হয়েছে। বর্তমান সময়ের বৈশ্বিক বাস্তবতার প্রতিফলন ঘটাতে নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী ও অস্থায়ী উভয় বিভাগেই আসন সংখ্যা বাড়ানোর জোর দাবি জানানো হয়েছে। বিশেষ করে এশিয়া, আফ্রিকা ও ল্যাটিন আমেরিকার উদীয়মান ও উন্নয়নশীল দেশগুলোকে আন্তর্জাতিক নীতি নির্ধারণে আরও বেশি প্রতিনিধিত্ব দেওয়ার বিষয়টি এখানে তুলে ধরা হয়। এই প্রেক্ষাপটে নিরাপত্তা পরিষদে ভারতের মতো অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রের স্থায়ী সদস্যপদের বিষয়েও ইতিবাচক আলোচনা হয়েছে। বিশ্বজুড়ে স্থায়ী শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখার জন্য নিরাপত্তা পরিষদকে আরও বেশি সমন্বিত, কার্যকারী এবং গণতান্ত্রিক সংস্থায় রূপান্তরিত করার আহ্বান জানিয়েছে এই শীর্ষ সম্মেলন।


নয়াদিল্লি ঘোষণাপত্রের পেছনে কূটনৈতিক কৌশল ও ভৌগোলিক ভারসাম্যের বার্তা অত্যন্ত স্পষ্ট। যদিও সাম্প্রতিক সময়ে সীমান্ত বিতর্ক ও আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তার নিয়ে ভারত ও চীনের মধ্যে বিভিন্ন দ্বিপাক্ষিক উত্তেজনা বজায় রয়েছে, আবার অন্যদিকে ইউক্রেন ইস্যু এবং ভূরাজনৈতিক টানাপোড়েনে রাশিয়ার সাথে পশ্চিমাদের সম্পর্কের চরম অবনতি ঘটেছে, তবুও এই তিন বৃহৎ শক্তি একই মঞ্চে দাঁড়িয়ে এক যৌথ সনদে সই করেছে। এটি আন্তর্জাতিক রাজনীতির মাঠে এক অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা। বিশেষজ্ঞদের মতে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক প্রভাব, নিষেধাজ্ঞা আরোপের প্রবণতা ও আন্তর্জাতিক নীতি নির্ধারণে আধিপত্যের মোকাবিলায় ভারত, চীন ও রাশিয়া তাদের স্বার্থের জায়গায় এক অভূতপূর্ব ঐক্য প্রদর্শন করল। এর মাধ্যমে পশ্চিমা বিশ্বকে এই সংকেত দেওয়া হলো যে, বিশ্ব অর্থনীতির কেন্দ্রবিন্দু এখন ক্রমান্বয়ে প্রাচ্যের দিকে স্থানান্তরিত হচ্ছে এবং উদীয়মান শক্তিগুলোকে আর উপেক্ষা করা সম্ভব নয়।


ফ্যাক্ট চেক ও বস্তুনিষ্ঠ পর্যালোচনার ভিত্তিতে এটি স্পষ্ট যে, নয়াদিল্লি ঘোষণাপত্রে ডলারের বিকল্প ব্যবস্থা বা জাতীয় মুদ্রায় বাণিজ্যের কথা বলা হলেও তা রাতারাতি মার্কিন ডলারের পতন ঘটাবে না। বর্তমানে বৈশ্বিক রিজার্ভ এবং আন্তর্জাতিক লেনদেনের সিংহভাগ অংশ এখনো ডলারেই পরিচালিত হয়। একটি আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থার স্থান পরিবর্তন করা দীর্ঘমেয়াদী ও অত্যন্ত জটিল প্রক্রিয়া। তবে ব্রিকসের এই সমন্বিত পদক্ষেপের ফলে দীর্ঘমেয়াদে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য নীতিতে একটি সমান্তরাল ও শক্তিশালী বিকল্পের যে সূচনা হলো, সে বিষয়ে বিশ্ব বিশেষজ্ঞরা একমত। তাছাড়া এই সম্মেলনে ভারত নিজের ভূরাজনৈতিক দূরদর্শিতা ও ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতির পরিচয় দিয়েছে। পশ্চিমাদের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখার পাশাপাশি উদীয়মান দক্ষিণ এশীয় ও বৈশ্বিক শক্তিগুলোর প্রধান কণ্ঠস্বর হিসেবে ভারত নিজেকে সফলভাবে তুলে ধরতে সক্ষম হয়েছে। পরিশেষে, ১৮তম ব্রিকস সম্মেলনে গৃহীত এই নয়াদিল্লি ঘোষণাপত্র কেবল একটি আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক দলিল নয়, বরং এটি বৈশ্বিক ক্ষমতার ভারসাম্যে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে। এটি প্রমাণ করে যে আগামী দিনের বৈশ্বিক অর্থনীতি ও রাজনীতির গতিপথ নির্ধারণে আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার বহু মেরুকরণ বা মাল্টিপোলারিটি একটি বাস্তবতা হয়ে উঠছে, যেখানে উদীয়মান দেশগুলোর সম্মিলিত ইচ্ছা ও সিদ্ধান্ত বিশ্বমঞ্চে মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করবে।


সিএসবি নিউজ-এর আরও খবর