বরফশীতল বেরিং সাগরে উল্টে যাওয়া নৌকায় তিনদিন পর ১৫ বছরের কিশোর উদ্ধার

বরফশীতল বেরিং সাগরে উল্টে যাওয়া নৌকার ওপর প্রায় তিনদিন টিকে থেকে মার্কিন কোস্ট গার্ডের হাতে জীবিত উদ্ধার হলো ১৫ বছরের কিশোর।

বরফশীতল বেরিং সাগরে উল্টে যাওয়া নৌকায় তিনদিন পর ১৫ বছরের কিশোর উদ্ধার

বরফশীতল বেরিং সাগরে উল্টে যাওয়া নৌকায় তিনদিন পর ১৫ বছরের কিশোর উদ্ধার


মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আলাস্কা অঙ্গরাজ্যের উপকূলে বরফশীতল বেরিং সাগরে এক অবিশ্বাস্য ও অলৌকিক বেঁচে ফেরার ঘটনা ঘটেছে। অত্যন্ত প্রতিকূল ও হিমাঙ্কের কাছাকাছি তাপমাত্রায় টানা প্রায় তিনদিন ধরে একটি উল্টে যাওয়া ছোট নৌকার ওপর টিকে থাকার পর ১৫ বছর বয়সী এক কিশোরকে জীবিত উদ্ধার করেছে মার্কিন উপকূলরক্ষী বাহিনী বা কোস্ট গার্ড। সেন্ট লরেন্স দ্বীপের কাছে পরিচালিত এই রুদ্ধশ্বাস অভিযানে কিশোরটিকে নৌকার তলদেশের ওপর হাঁটু গেড়ে বসে থাকা অবস্থায় শনাক্ত করা হয়। দীর্ঘ সময় ধরে তীব্র শীত, সমুদ্রের বিশাল ঢেউ এবং কোনো প্রকার খাদ্য ও পানীয় ছাড়া ভেসে থাকার পর তাকে উদ্ধার করার এই ঘটনাকে সামুদ্রিক উদ্ধার ইতিহাসের অন্যতম এক অবিশ্বাস্য লড়াই হিসেবে দেখা হচ্ছে।
মার্কিন কোস্ট গার্ডের একটি টহল দল আকাশ ও সমুদ্রপথে অনুসন্ধান কার্যক্রম চালানোর সময় দূর সমুদ্রে একটি উল্টে থাকা অস্বাভাবিক বস্তু দেখতে পায়। কাছে গিয়ে তারা বুঝতে পারেন এটি একটি উল্টে যাওয়া ছোট নৌকা এবং তার ওপর কেউ একজন সহায়হীন অবস্থায় বসে আছে। উদ্ধারকারী দল কালবিলম্ব না করে দ্রুত নৌকার কাছে পৌঁছায় এবং কিশোরটিকে নিরাপদে তাদের জাহাজে তুলে নেয়।


উদ্ধারের পরপরই কিশোরটির শারীরিক অবস্থা পরীক্ষা করে চিকিৎসকরা জানান যে সে মারাত্মকভাবে হাইপোথার্মিয়ায় ভুগছিল। দীর্ঘ সময় ধরে অতিরিক্ত ঠান্ডা পানি ও বরফশীতল বাতাসের মধ্যে থাকার কারণে তার শরীরের ভেতরের তাপমাত্রা বিপজ্জনক মাত্রায় নেমে গিয়েছিল। বিশেষজ্ঞদের মতে, বেরিং সাগরের মতো চরম প্রতিকূল পরিবেশে বাতাসের তীব্র বেগ এবং সাগরের জমাট বাঁধা পানি মানুষের শরীরের উত্তাপ দ্রুত শুষে নেয়। এমন পরিস্থিতিতে কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই মানুষের প্রাণহানি হতে পারে, সেখানে এই কিশোর টানা প্রায় ৭২ ঘণ্টা টিকে ছিল। জাহাজে তুলে নেওয়ার পরই তাকে জরুরি প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয় এবং শরীরের তাপমাত্রা স্বাভাবিক করার প্রক্রিয়া শুরু করা হয়।


তবে এই অবিশ্বাস্য বেঁচে ফেরার আনন্দের আড়ালে লুকিয়ে রয়েছে এক হৃদয়বিদারক ট্র্যাজেডি। কিশোরটি একা ওই নৌকায় ছিল না, তার সঙ্গে ছিলেন তার ১৬ বছর বয়সী আপন ভাই এবং ৩৯ বছর বয়সী চাচাতো ভাই। তিনজনে মিলে সমুদ্রযাত্রায় বের হলেও আকস্মিক ঝড়ের কবলে পড়ে তাদের নৌকাটি উল্টে যায়। দুর্ভাগ্যবশত, অন্য দুইজন এই চরম প্রতিকূলতার মুখে টিকতে না পেরে সমুদ্রে ডুবে প্রাণ হারান। ফলে তিনজনের মধ্যে কেবল এই ১৫ বছর বয়সী কিশোরটিই অলৌকিকভাবে বেঁচে ফিরেছে। উদ্ধার পাওয়ার পর যখন কিশোরটিকে তার পরিবারের অন্য দুই সদস্যের চিরতরে হারিয়ে যাওয়ার সংবাদ দেওয়া হয়, তখন আনন্দের পরিবেশ মুহূর্তে এক শোকাবহ পরিস্থিতিতে রূপ নেয়।


বেরিং সাগর উত্তর গোলার্ধের অন্যতম বিপজ্জনক ও ভয়াল সামুদ্রিক অঞ্চল হিসেবে পরিচিত। সেখানে আবহাওয়ার পূর্বাভাস খুব দ্রুত পরিবর্তিত হয়। প্রচণ্ড ঠান্ডা বাতাস, দৈত্যাকার ঢেউ এবং বরফজমা পানি যেকোনো সময় বড় ধরনের বিপদের কারণ হতে পারে। বিশেষ করে ছোট বা মাঝারি আকারের নৌযানের জন্য এই সাগরে চলাচল করা চরম ঝুঁকিপূর্ণ। এই দুর্ঘটনায় যেভাবে নৌকাটি হঠাৎ উল্টে গিয়েছিল, তাতে ভেতরের কক্ষে থাকা বা পানির নিচে পড়ে যাওয়া ব্যক্তিদের বেঁচে থাকার সুযোগ একেবারেই ছিল না। কিশোরটি বুদ্ধিমত্তা ও সাহসিকতার পরিচয় দিয়ে উল্টে যাওয়া নৌকার উপরিভাগে উঠে বসে থাকে, যা তাকে সরাসরি পানিতে ডুবে যাওয়া থেকে রক্ষা করেছে।
নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, কোনো নৌযান সমুদ্রে উল্টে গেলে পানিতে সাঁতার না কেটে নৌকার ওপর অবস্থান নেওয়াটাই সবচেয়ে বুদ্ধিমানের কাজ। পানির ভেতর শরীর থাকলে বায়ুমণ্ডলের তুলনায় ২৫ গুণ দ্রুত শরীরের তাপ নষ্ট হয়। কিশোরটি উল্টে যাওয়া নৌকার ওপর হাঁটু গেড়ে বসে থেকে নিজের শরীরকে যতটা সম্ভব শুকনা রাখার চেষ্টা করেছিল, যা তাকে হাইপোথার্মিয়ার চূড়ান্ত পর্যায় থেকে কিছু সময়ের জন্য রক্ষা করে। তবে শিশু ও কিশোরদের শরীর দ্রুত ঠান্ডা হয়ে যায় বলে এত দীর্ঘ সময় বেঁচে থাকা একটি বিরল ঘটনা।


উদ্ধারের সময় হেলিকপ্টার ও উদ্ধারকারী জাহাজের সদস্যদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে কিশোরটি হাত নাড়ানোর চেষ্টা করেছিল। অত্যন্ত সীমিত দৃশ্যমানতা এবং সাগরের উত্তাল ঢেউয়ের মধ্যেও কোস্ট গার্ডের চৌকস সদস্যরা দূর থেকে তাকে শনাক্ত করতে সক্ষম হন। আকাশ থেকে যখন উদ্ধারকারী সদস্য পানিতে নেমে কিশোরটির দিকে এগিয়ে যান, তখন কিশোরটি প্রায় নিস্তেজ হয়ে পড়েছিল। তাকে দ্রুত উদ্ধার করে চিকিৎসাকেন্দ্রে পাঠানোর ব্যবস্থা করা হয়।
বর্তমানে স্থানীয় তদন্তকারী সংস্থা ও সামুদ্রিক নিরাপত্তা কর্তৃপক্ষ এই দুর্ঘটনার মূল কারণ খতিয়ে দেখছে। প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, হঠাৎ আসা প্রবল ঢেউ নাকি নৌকার কোনো যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে এটি উল্টে গিয়েছিল, তা এখনো পরিষ্কার নয়। যাত্রা শুরু করার সময় তাদের কাছে কোনো জরুরি যোগাযোগ যন্ত্র ছিল কি না কিংবা তারা আবহাওয়ার পূর্বাভাস দেখে সমুদ্রে নেমেছিল কি না, সেসব বিষয়ও তদন্তের আওতায় আনা হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ ধরনের বরফশীতল সাগরে যাত্রার আগে পর্যাপ্ত লাইফ জ্যাকেট, জরুরি রেডিও বার্তা পাঠানোর যন্ত্র এবং বিশেষ পোশাক সঙ্গে রাখা বাধ্যতামূলক হওয়া উচিত।


এই ঘটনা একদিকে যেমন প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও বেরিং সাগরের নির্মমতার কথা মনে করিয়ে দেয়, অন্যদিকে বিপদের মুখে মানুষের টিকে থাকার অদম্য ইচ্ছাশক্তির এক অনন্য উদাহরণ হিসেবে ইতিহাসে থেকে যাবে। কিশোরটি এখন চিকিৎসকদের নিবিড় পর্যবেক্ষণে সুস্থ হয়ে উঠছে, তবে দুই নিকটাত্মীয়কে হারানোর গভীর শোক তাকে এবং তার পরিবারকে দীর্ঘকাল তাড়িয়ে বেড়াবে।


সিএসবি নিউজ-এর আরও খবর