চীনা যুবক ও রংপুরী তরুণীর ভালোবাসার টান, ধর্ম পরিবর্তন করে বাংলাদেশে এসে রাজকীয় বিয়ে

প্রেমের টানে চীন থেকে রংপুরে এসে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে আবিদাকে বিয়ে করলেন তরুণ আয়ান ইসলাম, উৎসুক জনতার ঢল।

চীনা যুবক ও রংপুরী তরুণীর ভালোবাসার টান, ধর্ম পরিবর্তন করে বাংলাদেশে এসে রাজকীয় বিয়ে

চীনা যুবক ও রংপুরী তরুণীর ভালোবাসার টান, ধর্ম পরিবর্তন করে বাংলাদেশে এসে রাজকীয় বিয়ে


একটি সাধারণ মোবাইল অ্যাপের পর্দায় শুরু হওয়া যোগাযোগের গল্প যে এতটা নাটকীয় রূপ নেবে, তা হয়তো অনেকেই ভাবতে পারেননি। তবে দূরত্বের সীমানা যে ভালোবাসার আকুলতার কাছে বিন্দুমাত্র বাধা হতে পারে না, তা আরও একবার প্রমাণ করল চীন ও বাংলাদেশের দুই হৃদয়। প্রায় এক বছরের দীর্ঘ অনলাইন যোগাযোগ ও গভীর প্রেমের টানে সুদূর চীনের সিচুয়ান প্রদেশ থেকে বাংলাদেশের রংপুরে ছুটে এসেছেন ২৯ বছর বয়সী তরুণ ঝাওহুইয়ান। শুধু ভালোবাসার মানুষকে আপন করে পাওয়ার জন্য তিনি নিজ ধর্ম পরিবর্তন করে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছেন, নিজের নতুন নাম রেখেছেন আয়ান ইসলাম এবং পীরগঞ্জের মেয়ে আবিদা সুলতানাকে পারিবারিকভাবে বিয়ে করে বাঁধনে বেঁধেছেন নিজেদের জীবন। ১০ সেপ্টেম্বর রাতে অনুষ্ঠিত এই অনন্য বিয়ের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর রংপুর অঞ্চলের শানেরহাট ইউনিয়নের প্রথমডাঙ্গা গ্রামজুড়ে তৈরি হয়েছে উৎসবমুখর পরিবেশ ও ব্যাপক কৌতুহল।


ঘটনার সূত্রপাত প্রায় এক বছর আগে, একটি জনপ্রিয় আন্তর্জাতিক মোবাইল অ্যাপ ব্যবহারের মাধ্যমে। রংপুরের পীরগঞ্জ উপজেলার শানেরহাট ইউনিয়নের প্রথমডাঙ্গা গ্রামের তরুণী আবিদা সুলতানা ও চীনের সিচুয়ান প্রদেশের বাসিন্দা ঝাওহুইয়ানের মধ্যে প্রথম কথা হয় এই অনলাইন মাধ্যমে। শুরুতে সাধারণ পরিচয় ও কুশল বিনিময়ের মাধ্যমে যোগাযোগ চালু হলেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তাদের ভাব বিনিময় গভীর হতে থাকে। ভাষা ও সংস্কৃতির ব্যাপক পার্থক্য থাকা সত্ত্বেও আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তির অনুবাদ সুবিধা ব্যবহার করে তারা একে অপরের মনের কথা বুঝতে শুরু করেন। নিয়মিত ভিডিও কল এবং বার্ত আদান-প্রদানের মধ্য দিয়ে তাদের বন্ধুত্বের সম্পর্ক রূপ নেয় গভীর প্রেমের সম্পর্কে। একে অপরের পরিবার, সংস্কৃতি এবং চিন্তাভাবনা শেয়ার করতে করতে তারা উপলব্ধি করেন যে জীবনের বাকি দিনগুলো তারা একসাথেই কাটাতে চান।


সম্পর্ককে পরিণতি দিতে এবং আন্তর্জাতিক সীমানার সমস্ত জটিলতা অতিক্রম করতে ঝাওহুইয়ান বাংলাদেশে আসার সিদ্ধান্ত নেন। পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী গত ২৫ আগস্ট চীনে নিজের সমস্ত কাজকর্ম সামলে তিনি বাংলাদেশের উদ্দেশ্যে রওনা হন। শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণের পর তিনি ঢাকার কোলাহল পেরিয়ে দূরপাল্লার বাসে চেপে সরাসরি চলে যান রংপুরে। সেখানে পৌঁছানোর পর পীরগঞ্জে গিয়ে আবিদা সুলতানা ও তার পরিবারের সদস্যদের সাথে দেখা করেন। ঝাওহুইয়ানের আন্তরিকতা, নম্র ব্যবহার এবং আবিদার প্রতি তার ভালোবাসার প্রতিশ্রুতির গভীরতা দেখে আবিদার পরিবারের সদস্যরা মুগ্ধ হন। দুই পরিবারের মধ্যে সরাসরি আলোচনা শেষে বিয়ের আনুষ্ঠানিকতার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
বাংলাদেশে আসার পর ভালোবাসার সম্পর্কের প্রতি নিজের পূর্ণ আনুগত্য ও সম্মান জানাতে এবং স্থানীয় কৃষ্টি ও ধর্মীয় অনুভূতির সাথে মিশে যেতে ঝাওহুইয়ান ইসলাম ধর্ম গ্রহণের ইচ্ছা প্রকাশ করেন। গত ৯ সেপ্টেম্বর রংপুরের একজন স্থানীয় আলেমের নিকট গিয়ে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন এবং তার নতুন নামকরণ করা হয় আয়ান ইসলাম। ধর্ম পরিবর্তনের পর পরদিনই অর্থাৎ ১০ সেপ্টেম্বর রাতে শানেরহাট ইউনিয়নের প্রথমডাঙ্গা গ্রামে আবিদার নিজ বাড়িতে দুই পরিবারের পূর্ণ সম্মতিতে এবং স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিদের উপস্থিতিতে মুসলিম ধর্মীয় রীতি অনুযায়ী তাদের বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হয়। আয়ান ইসলাম নিজ দেশের সমস্ত সামাজিক ও পারিবারিক গণ্ডি পেরিয়ে এক নতুন দেশে এক নতুন জীবনের সূচনা করেন।


পীরগঞ্জের মতো প্রত্যন্ত একটি গ্রামে সুদূর চীন থেকে এসে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে কোনো যুবকের বিয়ের ঘটনা সচরাচর দেখা যায় না। ফলে এই বিয়ের খবরটি ছড়িয়ে পড়ার পর থেকেই শানেরহাট ইউনিয়নসহ আশেপাশের বিভিন্ন এলাকা থেকে উৎসুক মানুষের ঢল নামতে শুরু করে আবিদার বাড়িতে। দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ একনজর নতুন জামাই ও নতুন দম্পতিকে দেখতে প্রথমডাঙ্গা গ্রামে ভিড় জমাচ্ছেন। চীনা যুবক আয়ানের সহজ-সরল আচরণ ও ভাঙা ভাঙা বাংলায় শুভেচ্ছা বিনিময়ের চেষ্টা স্থানীয় বাসিন্দাদের মন জয় করে নিয়েছে। আবিদার পরিবারের সদস্যরাও ভিনদেশী জামাইকে পেয়ে অত্যন্ত আনন্দিত এবং তারা তাদের মেয়ের সুখী দাম্পত্য জীবনের জন্য সকলের কাছে দোয়া চেয়েছেন।


ফ্যাক্ট চেক ও তথ্যের সত্যতা যাচাই করে দেখা গেছে যে প্রকাশিত খবরটি সম্পূর্ণ সত্য এবং বাস্তব ঘটনার ওপর ভিত্তি করে তৈরি। ৯ সেপ্টেম্বর রংপুরে ধর্ম পরিবর্তনের সমস্ত আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে আয়ান ইসলাম নাম গ্রহণ এবং ১০ সেপ্টেম্বর রাতে পীরগঞ্জে পারিবারিকভাবে আবিদা সুলতানার সাথে তার শুভ বিবাহ সম্পন্ন হওয়ার তথ্যটি স্থানীয় প্রত্যক্ষদর্শী ও পরিবারের পক্ষ থেকে নিশ্চিত করা হয়েছে। আধুনিক যুগে প্রযুক্তি কীভাবে দুটি ভিন্ন সংস্কৃতি ও ভৌগোলিক দূরত্বের মানুষকে একই সূত্রে গেঁথে দিতে পারে, এই ঘটনা তারই এক অপূর্ব উদাহরণ। বর্তমানে আন্তর্জাতিক বিবাহের আইনি ও প্রশাসনিক কাগজপত্র তৈরির প্রক্রিয়া চলছে এবং প্রয়োজনীয় কাজ শেষ হলে এই নবদম্পতি তাদের ভবিষ্যৎ জীবনের রূপরেখা চূড়ান্ত করবেন।


সিএসবি নিউজ-এর আরও খবর