সেন্ট লুইসের আর্ট হিলে ৭,৬২০ পতাকায় ৯/১১-এর ২৫ বছর স্মরণ

৯/১১-এর ২৫ বছর পূর্তিতে সেন্ট লুইসের আর্ট হিলে হাজারো পতাকায় নিহত ও আত্মত্যাগকারীদের স্মরণ করছে যুক্তরাষ্ট্রবাসী গভীর শ্রদ্ধায়।

সেন্ট লুইসের আর্ট হিলে ৭,৬২০ পতাকায় ৯/১১-এর ২৫ বছর স্মরণ

সেন্ট লুইসের আর্ট হিলে ৭,৬২০ পতাকায় ৯/১১-এর ২৫ বছর স্মরণ


যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট লুইস শহরের ঐতিহাসিক আর্ট হিল এখন পরিণত হয়েছে এক বিশাল স্মৃতিসৌধে। ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলার ২৫ বছর পূর্তি উপলক্ষে পাহাড়জুড়ে সারি সারি মার্কিন পতাকা স্থাপন করা হয়েছে। দূর থেকে দেখলে পুরো সবুজ পাহাড়টিকে যেন লাল, সাদা ও নীলের বিশাল সমুদ্রে পরিণত হয়েছে বলে মনে হচ্ছে। এই আয়োজনের নাম ‘ফ্ল্যাগস অব ভ্যালর’ বা বীরদের পতাকা। চলতি বছর ৫ সেপ্টেম্বর থেকে ১৩ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সেন্ট লুইসের ফরেস্ট পার্কের আর্ট হিলে এই বিশেষ স্মরণ আয়োজন চলছে। 

তবে প্রচারিত খবরে ব্যবহৃত ‘৭ হাজার ৫০০-এর বেশি’ সংখ্যাটি মোটামুটি সঠিক হলেও সাম্প্রতিক তথ্য যাচাই করে আরও নির্দিষ্ট সংখ্যা পাওয়া যাচ্ছে। আয়োজকদের নিজস্ব তথ্য অনুযায়ী এবারের স্মরণ আয়োজনে প্রায় ৭ হাজার ৬২০ থেকে ৭ হাজার ৬৫০টি পতাকা রয়েছে। স্থানীয় সংবাদমাধ্যমও ৭ হাজার ৬২০টি পতাকার কথা উল্লেখ করেছে। অন্যদিকে আয়োজকদের বিভিন্ন প্রচারসামগ্রীতে প্রায় ৭ হাজার ৬৫০টি পতাকার কথাও বলা হয়েছে। তাই নির্দিষ্ট সংখ্যা নিয়ে সামান্য পার্থক্য থাকলেও এটি নিশ্চিত যে আর্ট হিলে সাত হাজার পাঁচশর বেশি পতাকা স্থাপন করা হয়েছে। 

৫ সেপ্টেম্বর ভোরে শত শত স্বেচ্ছাসেবক আর্ট হিলে পতাকা স্থাপনের কাজে অংশ নেন। স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এক হাজার দুইশর বেশি স্বেচ্ছাসেবক পুরো স্মৃতিসৌধ তৈরিতে সহায়তা করেছেন। কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই পাহাড়জুড়ে পতাকা স্থাপনের কাজ প্রায় শেষ হয়ে যায়। প্রত্যেকটি পতাকা অত্যন্ত যত্নের সঙ্গে নির্দিষ্ট দূরত্বে স্থাপন করা হয়। অনেক পতাকার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির পরিচয়, ছবি ও স্মারক পরিচয়ফলক যুক্ত করা হয়েছে, যাতে দর্শনার্থীরা শুধু একটি পতাকা না দেখে তার পেছনে থাকা একজন মানুষের জীবন ও আত্মত্যাগের গল্প জানতে পারেন। 

এই আয়োজনের বিশেষত্ব হলো, এটি শুধু ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর নিহত ব্যক্তিদের স্মরণে সীমাবদ্ধ নয়। হামলার পর যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযানে নিহত সেনাসদস্যদেরও এখানে স্মরণ করা হচ্ছে। একই সঙ্গে ৯/১১ হামলার দিন দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে নিহত অগ্নিনির্বাপক, পুলিশ সদস্য ও অন্যান্য উদ্ধারকর্মীদের জন্যও আলাদা সম্মান প্রদর্শনের ব্যবস্থা রয়েছে। আয়োজকদের তথ্য অনুযায়ী, গ্র্যান্ড বেসিনের চারপাশে ৯/১১ হামলায় নিহত ৪১২ জন উদ্ধারকর্মীর স্মরণে পতাকা স্থাপন করা হয়েছে। 

২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের হামলায় মোট ২ হাজার ৯৭৭ জন নিহত হন। নিউইয়র্কের বিশ্ব বাণিজ্য কেন্দ্র, পেন্টাগন এবং পেনসিলভানিয়ায় বিধ্বস্ত হওয়া বিমানটির ঘটনায় প্রাণ হারানো মানুষদের স্মরণে এই আয়োজন করা হচ্ছে। আর্ট হিলে স্থাপন করা পতাকার পাশাপাশি নিহতদের ছবি ও তথ্য নিয়ে বড় স্মরণফলকও রাখা হয়েছে। এর ফলে দর্শনার্থীরা হামলার ভয়াবহতা সম্পর্কে জানার পাশাপাশি নিহত মানুষদের ব্যক্তিগত পরিচয় ও জীবনের গল্পের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন। 

এবারের আয়োজনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো এর সময়কাল। আয়োজকদের ঘোষণা অনুযায়ী, ৫ সেপ্টেম্বর থেকে ১৩ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সাধারণ মানুষের জন্য স্মৃতিসৌধটি উন্মুক্ত রাখা হয়েছে। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত দর্শনার্থীরা সেখানে গিয়ে পতাকাগুলো দেখতে এবং নিহতদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে পারছেন। ফরেস্ট পার্ক কর্তৃপক্ষও ৫ সেপ্টেম্বর থেকে এই স্মরণ আয়োজনের সময়সূচি নিশ্চিত করেছে। 

১১ সেপ্টেম্বরের মূল স্মরণ কর্মসূচিতেও ছিল বিশেষ আয়োজন। সন্ধ্যায় আর্ট হিলে নিহতদের স্মরণে সমবেত হওয়ার কর্মসূচি রাখা হয়। সেখানে স্বজনহারা পরিবার, সাবেক সেনাসদস্য, উদ্ধারকর্মী এবং সাধারণ মানুষ অংশ নেন। সন্ধ্যার পর মোমবাতি প্রজ্বালন এবং নিহতদের নাম পাঠের আয়োজন করা হয়। রাত ৯টা ১১ মিনিট থেকে শুরু হয় নাম পাঠের বিশেষ কর্মসূচি, যা রাতভর চলার কথা ছিল। 

এই স্মরণ আয়োজনের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে অনেক মানুষের ব্যক্তিগত আবেগও। স্থানীয় এক স্বেচ্ছাসেবক সংবাদমাধ্যমকে জানান, প্রতিটি পতাকার দিকে তাকালে শুধু একটি সংখ্যা মনে হয় না; বরং একজন মানুষ, তার পরিবার এবং তার জীবনের গল্প চোখের সামনে ভেসে ওঠে। অনেক স্বেচ্ছাসেবক পতাকা স্থাপনের সময় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির নাম পড়েছেন। এতে পুরো কাজটি তাদের কাছে আনুষ্ঠানিক দায়িত্বের চেয়ে অনেক বেশি আবেগপূর্ণ হয়ে উঠেছে। 

আয়োজকদের হিসাব অনুযায়ী, এত বিশাল স্মরণ আয়োজন তৈরি করতে বিপুল পরিমাণ সামগ্রী ও শ্রম প্রয়োজন হয়েছে। পতাকার সারিগুলো মিলিয়ে প্রায় ১১ মাইল দীর্ঘ পথ তৈরি হয়েছে। প্রায় ১০ একর জায়গাজুড়ে স্মরণ প্রদর্শনীটি বিস্তৃত। পতাকা স্থাপনে হাজার হাজার খুঁটি এবং বিপুল পরিমাণ অন্যান্য উপকরণ ব্যবহার করা হয়েছে। আয়োজকদের মতে, পুরো প্রস্তুতির পরিকল্পনা শুরু হয় প্রায় এক বছর আগে এবং কয়েক শ স্বেচ্ছাসেবকের সমন্বয়ে কাজটি সম্পন্ন করা হয়। 

আর্ট হিলে এমন স্মরণ আয়োজন এবারই প্রথম নয়। ২০১১ সালে ৯/১১ হামলার দশম বার্ষিকীতে এখানে ২ হাজার ৯৭৭টি পতাকা স্থাপন করা হয়েছিল। প্রতিটি পতাকা হামলায় নিহত একজন মানুষের স্মৃতির প্রতিনিধিত্ব করেছিল। ২০১৬ সালে পঞ্চদশ বার্ষিকীতে যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে নিহত সেনাসদস্যদের স্মরণে আরও বড় আকারে আয়োজন করা হয়। ২০২১ সালে ২০তম বার্ষিকীতেও সাত হাজারের বেশি পতাকা আর্ট হিলকে ঢেকে দেয়। প্রতি পাঁচ বছর পরপর এই বিশেষ স্মরণ আয়োজন করার একটি ধারাবাহিকতা তৈরি হয়েছে। 

২০২৬ সালের আয়োজন তাই শুধু ৯/১১-এর ২৫ বছর পূর্তির স্মরণ নয়; এটি গত ২৫ বছরে প্রাণ হারানো মানুষদের সম্মিলিতভাবে স্মরণ করার একটি বড় উদ্যোগ। আয়োজকদের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রতিটি পতাকার মাধ্যমে একটি মানুষের জীবন, তার আত্মত্যাগ এবং তার পরিবারের কষ্টকে স্মরণ করা হচ্ছে। একই সঙ্গে নতুন প্রজন্মকে ২০০১ সালের সেই দিনের ইতিহাস সম্পর্কে জানানোও এই আয়োজনের অন্যতম উদ্দেশ্য। 

স্থানীয় বাসিন্দাদের পাশাপাশি বিভিন্ন বয়সের মানুষও স্মৃতিসৌধটি দেখতে আসছেন। ১০৪ বছর বয়সী একজন সাবেক সেনাসদস্য সেখানে গিয়ে এত বিপুলসংখ্যক পতাকা দেখে বিস্ময় প্রকাশ করেছেন বলে স্থানীয় সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে। তাঁর কাছে এই আয়োজন ছিল নিহতদের প্রতি সম্মান জানানোর এক অসাধারণ দৃশ্য। 

৯/১১-এর ২৫ বছর পর যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে যখন আবারও নিহতদের নাম স্মরণ করা হচ্ছে, তখন সেন্ট লুইসের আর্ট হিলের এই আয়োজন সেই শোক ও শ্রদ্ধাকে দৃশ্যমান করে তুলেছে। হাজারো পতাকা একই সঙ্গে স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে একটি ভয়াবহ দিনের কথা এবং সেই দিনের পর যারা মানুষের জীবন রক্ষা, দেশ রক্ষা ও দায়িত্ব পালনের পথে প্রাণ হারিয়েছেন তাদের আত্মত্যাগের কথা। আয়োজকদের লক্ষ্যও মূলত একই—সময় যতই পেরিয়ে যাক, নিহত মানুষদের নাম, মুখ এবং গল্প যেন বিস্মৃত না হয়। 


সিএসবি নিউজ-এর আরও খবর