রাজপথে পরীক্ষিত নেতারা সংগঠনের বাইরে, ঢাকায় বিএনপি কতটা শক্তিশালী?

গুলশানের ঝটিকা মিছিলের পর নতুন করে প্রশ্ন দীর্ঘ আন্দোলনে পরীক্ষিত মাঠের নেতাদের নিষ্ক্রিয় রেখে কি রাজধানীতে সংগঠন শক্তিশালী করা সম্ভব?

রাজপথে পরীক্ষিত নেতারা সংগঠনের বাইরে, ঢাকায় বিএনপি কতটা শক্তিশালী?

রাজপথে পরীক্ষিত নেতারা সংগঠনের বাইরে, ঢাকায় বিএনপি কতটা শক্তিশালী?


দীর্ঘ ১৭ বছরের রাজনৈতিক লড়াই, মামলা-হামলা, গ্রেপ্তার, কারাবাস ও রাজপথের আন্দোলনের মধ্য দিয়ে বিএনপির রাজধানীকেন্দ্রিক সাংগঠনিক ভিত্তি তৈরিতে ভূমিকা রাখা নেতাদের একটি বড় অংশ বর্তমানে গুরুত্বপূর্ণ সাংগঠনিক দায়িত্বের বাইরে রয়েছেন। দীর্ঘদিন কর্মী-সমর্থকদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ রাখা এবং আন্দোলনের সময় মাঠে কর্মসূচি বাস্তবায়নে অভিজ্ঞ এসব নেতাকে বর্তমান কাঠামোয় কতটা কাজে লাগানো হচ্ছে, তা নিয়ে দলটির ভেতরে ও রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা তৈরি হয়েছে।

রাজধানীর গুলশানের মতো গুরুত্বপূর্ণ ও নিরাপত্তাসংবেদনশীল এলাকায় সম্প্রতি নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের ঝটিকা মিছিল, স্লোগান এবং ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনার পর সেই আলোচনা আরও জোরালো হয়েছে। প্রশ্ন উঠেছে—রাজধানীতে বিএনপির মতো ক্ষমতাসীন একটি দলের সাংগঠনিক কাঠামো যদি শক্তিশালী হয়ে থাকে, তাহলে নিষিদ্ধ একটি সংগঠনের কর্মীরা কীভাবে এমন এলাকায় আকস্মিকভাবে জমায়েত ও মিছিল করার সুযোগ পেল?

তবে কোনো একটি ঘটনা দিয়ে বিএনপির সামগ্রিক সাংগঠনিক দুর্বলতার সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না। বরং ঘটনাটি রাজধানীর প্রতিটি থানা, ওয়ার্ড ও মহল্লায় ক্ষমতাসীন দলের মাঠপর্যায়ের সংগঠন কতটা সক্রিয়, কার্যকর ও প্রস্তুত—সে প্রশ্ন সামনে এনেছে।

রাজপথে যারা ছিলেন, ক্ষমতার পর তাঁরা কোথায়?

বিএনপির গত প্রায় দুই দশকের আন্দোলনের ইতিহাসে ঢাকার রাজপথে কয়েকজন নেতার নাম বারবার সামনে এসেছে। ঢাকা দক্ষিণে মির্জা আব্বাস, হাবিব-উন-নবী খান সোহেল, ব্যারিস্টার নাসির উদ্দিন আহমেদ অসীম, গোলাম মাওলা শাহীন, মির্জা আসলাম আলী ও কমিশনার আরিফ; আর উত্তর ঢাকায় আমানউল্লাহ আমান, সাইফুল আলম নীরব ও মামুন হাসানের মতো নেতারা দীর্ঘদিন নিজ নিজ এলাকায় দলীয় কর্মী-সমর্থকদের সঙ্গে সরাসরি কাজ করেছেন।

কেউ ছিলেন মহানগরের শীর্ষ নেতা, কেউ যুবদলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বে, কেউ ছাত্রদল থেকে উঠে এসে রাজনীতির বিভিন্ন ধাপ পেরিয়েছেন। আবার কেউ স্থানীয় পর্যায়ে দীর্ঘদিন কর্মী-সমর্থকদের সংগঠিত করেছেন।

এই নেতৃত্বের বড় বৈশিষ্ট্য ছিল, তাঁদের রাজনৈতিক পরিচয় শুধু নির্বাচনী রাজনীতির মাধ্যমে তৈরি হয়নি। বরং আন্দোলন, মিছিল, কর্মসূচি, মামলা, গ্রেপ্তার এবং প্রতিকূল পরিস্থিতিতে মাঠে থাকার মধ্য দিয়েই তাঁদের অনেকের সাংগঠনিক অবস্থান তৈরি হয়েছে।ক্ষমতায় আসার পর সেই মাঠের নেতৃত্বকে বিএনপি কতটা কাজে লাগাতে পারছে—এখন সেটিই বড় প্রশ্ন।

মির্জা আব্বাস: ঢাকার দক্ষিণে দীর্ঘদিনের পরিচিত মুখ

ঢাকার দক্ষিণের রাজনীতিতে মির্জা আব্বাসের নাম বিএনপির সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। সাবেক মন্ত্রী, ঢাকা সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র এবং বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য হিসেবে জাতীয় পর্যায়েও তাঁর রাজনৈতিক পরিচিতি রয়েছে।

বিএনপির দীর্ঘ আন্দোলন কর্মসূচিতে নয়া পল্টন, মতিঝিল, রামপুরা, খিলগাঁওসহ দক্ষিণ ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় তাঁর নেতৃত্ব ও উপস্থিতি দৃশ্যমান ছিল। ২০২২ সালের ১০ ডিসেম্বরের ঢাকা বিভাগীয় সমাবেশকে কেন্দ্র করে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে পুলিশের অভিযানের সময় তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। ২০২৩ সালের ২৮ অক্টোবরের রাজনৈতিক সংঘাতের পরও তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল।রাজপথের আন্দোলনের দীর্ঘ অভিজ্ঞতার কারণে দক্ষিণ ঢাকার সাংগঠনিক শক্তির সঙ্গে তাঁর নাম বহুদিন ধরে যুক্ত।

মির্জা আব্বাস অতীতে বলেছেন, ক্ষমতায় গেলে রাজনৈতিক দল অনেক সময় সংগঠনকে অবহেলা করে। ঢাকার বিএনপির সংগঠন দীর্ঘদিন নিষ্ক্রিয় ছিল এবং আন্দোলন ও ক্ষমতার রাজনীতির মধ্যে সংগঠনের ভূমিকা নিয়েও তিনি বিভিন্ন সময়ে কথা বলেছেন।এখন প্রশ্ন হলো, ক্ষমতায় আসার পর ঢাকার মাঠের সংগঠনকে তাঁর মতো অভিজ্ঞ নেতাদের হাতে কতটা দেওয়া হচ্ছে।

হাবিব-উন-নবী খান সোহেল: রাজপথের পরীক্ষিত সংগঠক

ঢাকার দক্ষিণের রাজনীতিতে হাবিব-উন-নবী খান সোহেলও দীর্ঘদিনের পরিচিত মুখ। ছাত্রদল ও স্বেচ্ছাসেবক দলের রাজনীতি পেরিয়ে তিনি বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্বে উঠে আসেন। ঢাকা মহানগর বিএনপির গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বেও তিনি ছিলেন।

বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্মসূচিতে তাঁর সরাসরি উপস্থিতি এবং কর্মী-সমর্থকদের সংগঠিত করার সক্ষমতা তাঁকে দীর্ঘদিনের মাঠের নেতা হিসেবে পরিচিত করেছে।বিএনপির আন্দোলনের বিভিন্ন পর্যায়ে তাঁর বিরুদ্ধে একাধিক মামলা হয়েছে। গ্রেপ্তার ও কারাবাসের ঘটনাও তাঁর রাজনৈতিক জীবনের অংশ। ২০২৪ সালের আন্দোলনের আগের সময়েও তিনি দলীয় কর্মসূচিতে সক্রিয় ছিলেন।

ঢাকার রাজপথের রাজনীতিতে দীর্ঘ অভিজ্ঞতা থাকা সত্ত্বেও বর্তমান ক্ষমতার কাঠামোয় তাঁর মতো পুরোনো মাঠের সংগঠকদের কতটা ব্যবহার করা হচ্ছে, সেটিই এখন আলোচনার বিষয়।

অসীম: ধানমন্ডি-কলাবাগানে দীর্ঘদিনের সংগঠক

ব্যারিস্টার নাসির উদ্দিন আহমেদ অসীমের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের বড় অংশ ধানমন্ডি-কলাবাগান এলাকাকে ঘিরে। রাজধানীর এই গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলে বিএনপির রাজনৈতিক কর্মসূচি, প্রচার, লিফলেট বিতরণ, মিছিল ও দলীয় কার্যক্রমে তাঁকে দীর্ঘদিন সক্রিয় দেখা গেছে।

আওয়ামী লীগের দীর্ঘ শাসনামলে ধানমন্ডি-কলাবাগানের মতো এলাকায় বিএনপির সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা সহজ ছিল না। সেই বাস্তবতায় দীর্ঘদিন ধরে কর্মী-সমর্থকদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা স্থানীয় নেতাদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

বিএনপির বিভিন্ন আন্দোলন কর্মসূচিতে ধানমন্ডি এলাকায় তাঁর নেতৃত্বের উপস্থিতিও ছিল উল্লেখযোগ্য। ফলে বর্তমান সময়ে এমন পুরোনো মাঠের সংগঠকদের সাংগঠনিকভাবে কতটা কাজে লাগানো হচ্ছে, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।

আমানউল্লাহ আমান: উত্তর ঢাকার পুরোনো সংগঠক

উত্তর ঢাকার রাজনীতিতে আমানউল্লাহ আমানের অবস্থান দীর্ঘদিনের। বিএনপির কেন্দ্রীয় রাজনীতির পাশাপাশি ঢাকা মহানগর উত্তরেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ সাংগঠনিক ভূমিকা পালন করেছেন।

আন্দোলনের সময় ঢাকার বড় কর্মসূচিতে তাঁর নেতৃত্ব দেখা গেছে। গোলাপবাগের সমাবেশেও তিনি ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির আহ্বায়ক হিসেবে সভাপতিত্ব করেছিলেন।

দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা, মাঠপর্যায়ে যোগাযোগ এবং উত্তর ঢাকার কর্মী-সমর্থকদের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক বিএনপির জন্য গুরুত্বপূর্ণ সাংগঠনিক সম্পদ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।বর্তমানে তাঁর রাজনৈতিক দায়িত্ব থাকলেও রাজধানীর মাঠের সংগঠনকে তাঁর মতো পুরোনো নেতাদের অভিজ্ঞতা অনুযায়ী কতটা সাজানো হচ্ছে, তা নিয়ে আলোচনা রয়েছে।

মামুন হাসান: মিরপুরের মাঠের রাজনীতির পরিচিত মুখ

মিরপুরের রাজনীতিতে মামুন হাসানের নাম বিএনপির মাঠপর্যায়ের রাজনীতির সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে যুক্ত। কেন্দ্রীয় বিএনপির নির্বাহী কমিটির সদস্য হিসেবেও তিনি দায়িত্ব পালন করেছেন।

মিরপুর, পল্লবীসহ উত্তর ঢাকার জনবহুল এলাকায় দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক কর্মসূচিতে তাঁর সক্রিয়তা ছিল। আন্দোলনের সময় মামলা, গ্রেপ্তার ও কারাবাসের মুখোমুখি হওয়া নেতাদের মধ্যেও তিনি ছিলেন।২০২৫ সালে একাধিক মামলায় তাঁর জামিন নামঞ্জুর করে আদালত তাঁকে কারাগারে পাঠানোর ঘটনাও ঘটে।

মিরপুরের মতো বিশাল ও ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় স্থানীয় কর্মী-সমর্থকদের সঙ্গে দীর্ঘদিনের সম্পর্ক একটি রাজনৈতিক দলের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সাংগঠনিক সম্পদ। কেন্দ্রীয় নির্দেশনার পাশাপাশি স্থানীয়ভাবে পরিচিত নেতৃত্বের ওপরও এমন সংগঠন অনেকাংশে নির্ভর করে।

সাইফুল আলম নীরব: উত্তর ঢাকার বিস্তীর্ণ এলাকার সংগঠক

সাইফুল আলম নীরব বিএনপির যুবদলের সাবেক সভাপতি। ২০১৭ সালে তিনি জাতীয়তাবাদী যুবদলের সভাপতি নির্বাচিত হন। এর আগে তিনি সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক ছিলেন।উত্তর ঢাকার রাজনীতিতে তাঁর দীর্ঘ সাংগঠনিক অভিজ্ঞতা রয়েছে। তেজগাঁও, মোহাম্মদপুর, গুলশানসহ বিস্তীর্ণ এলাকায় বিএনপির কর্মী-সমর্থকদের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ ছিল।

দীর্ঘ আন্দোলনকালে মামলা, গ্রেপ্তার ও রাজনৈতিক হয়রানির শিকার হওয়া বিএনপি নেতাদের তালিকাতেও তাঁর নাম এসেছে।তবে ২০২৬ সালের নির্বাচনকে ঘিরে ঢাকা-১২ আসনে মনোনয়ন নিয়ে তাঁর সঙ্গে দলের বিরোধ তৈরি হয়। দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ায় তাঁকে বিএনপি থেকে বহিষ্কার করা হয়।

দলীয় পদ না থাকলেও দীর্ঘদিনের সাংগঠনিক অভিজ্ঞতা এক দিনে শেষ হয়ে যায় না। এখানেই প্রশ্ন—দলের সঙ্গে মতপার্থক্য তৈরি হওয়া পুরোনো মাঠের নেতৃত্বকে পুরোপুরি দূরে সরিয়ে রেখে রাজধানীর সংগঠন কতটা শক্তিশালী করা সম্ভব?

গোলাম মাওলা শাহীন: যুবদলের রাজপথ থেকে উঠে আসা নেতা

ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবদলের রাজনীতিতে গোলাম মাওলা শাহীন দীর্ঘদিনের পরিচিত মুখ। যুবদলের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতৃত্ব পেরিয়ে তিনি মহানগর দক্ষিণ যুবদলের সাধারণ সম্পাদক ও গুরুত্বপূর্ণ সাংগঠনিক দায়িত্ব পালন করেছেন।২০১৭ সালের যুবদলের কমিটিতেও তাঁর নাম ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে ছিল। আন্দোলনের সময় গ্রেপ্তার ও মামলার মুখোমুখি হওয়া নেতাদের মধ্যেও তিনি ছিলেন।

২০২২ সালে নয়া পল্টনে বিএনপির কার্যালয়ের সামনে ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনায় করা মামলায় তাঁর নাম আসে। একই সময়ে বিএনপির পক্ষ থেকে তাঁর বারবার গ্রেপ্তারকে রাজনৈতিক আন্দোলন দমনের অংশ হিসেবে অভিযোগ করা হয়েছিল।দীর্ঘ সময় রাজপথের কর্মসূচি পরিচালনা করা যুবদলের মাঠের সংগঠকদের একজন হিসেবে তাঁর রাজনৈতিক পরিচিতি তৈরি হয়।

মির্জা আসলাম আলী: ছাত্রদল থেকে যুবদল, দীর্ঘ রাজনৈতিক পথচলা

ঢাকার দক্ষিণের রাজনীতিতে মির্জা আসলাম আলীর রাজনৈতিক উত্থান ছাত্রদল থেকে। ছাত্ররাজনীতির পর যুবদলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বেও তিনি দায়িত্ব পালন করেছেন।

রমনা, মগবাজার, হাতিরঝিল ও পল্টনকেন্দ্রিক এলাকায় বিএনপির সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে দীর্ঘদিন তাঁর সক্রিয়তা ছিল। এসব এলাকা রাজধানীর রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একদিকে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়, অন্যদিকে প্রেসক্লাব, পল্টন, কাকরাইল, মগবাজার ও রমনা—সব মিলিয়ে এটি রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক পরিসর।

বিএনপির আন্দোলনের কঠিন সময়গুলোতে এসব এলাকায় কর্মী-সমর্থকদের সংগঠিত করা ছিল বড় চ্যালেঞ্জ। স্থানীয়ভাবে পরিচিত সংগঠকদের সেই দায়িত্ব পালন করতে হয়েছে।বিশেষ করে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের রাজনৈতিক উত্তাল সময়েও বিএনপির পক্ষ থেকে মাঠের কর্মসূচিতে তাঁর সক্রিয় ভূমিকা ছিল বলে দলীয় নেতাকর্মীদের মধ্যে তাঁর পরিচিতি রয়েছে।

তবে বর্তমান সাংগঠনিক কাঠামো গঠনের পর তিনি গুরুত্বপূর্ণ কোনো কমিটিতে নেই। ফলে দীর্ঘদিন মাঠে থাকা এমন নেতাকে সাংগঠনিক কাঠামোর বাইরে রাখার সিদ্ধান্তের রাজনৈতিক প্রভাব নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।

কমিশনার আরিফ: মামলা-কারাবাসের দীর্ঘ রাজনৈতিক অধ্যায়

ঢাকা দক্ষিণের রাজনীতিতে কমিশনার আরিফ নামেও পরিচিত এই নেতার রাজনৈতিক পরিচয় স্থানীয় সংগঠন ও রাজপথের কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়ে তৈরি হয়েছে।

দীর্ঘ আওয়ামী লীগ শাসনামলে রাজনৈতিক মামলার কারণে তাঁর দীর্ঘ সময় কারাগারে কাটানোর বিষয়টি রাজনৈতিক জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলাসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক মামলায় তাঁকে দীর্ঘদিন কারাভোগ করতে হয়েছে।দীর্ঘ সময় কারাগারে থাকা এবং মামলা মোকাবিলা করেও তিনি দলীয় রাজনীতি থেকে সরে যাননি। ৫ আগস্ট ২০২৪-এর পর তিনি মুক্ত হন।

রাজনৈতিক বাস্তবতা পরিবর্তনের পর তাঁর মতো দীর্ঘদিনের মাঠের নেতাদের নতুন রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক দায়িত্বে দেখা যাবে—এমন প্রত্যাশা ছিল দলের অনেক কর্মী-সমর্থকের। কিন্তু বর্তমান সাংগঠনিক কাঠামোয় তাঁর মতো দক্ষিণ ঢাকার পরিচিত মাঠের নেতাদের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে না থাকা নিয়েও প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।

সমস্যাটি শুধু ঢাকায় নয়

বিএনপির সামনে থাকা সাংগঠনিক প্রশ্ন শুধু রাজধানীর কয়েকজন নেতাকে ঘিরে নয়। কেন্দ্র থেকে তৃণমূল পর্যন্ত দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রামের মধ্য দিয়ে উঠে আসা বহু নেতা বর্তমানে গুরুত্বপূর্ণ সাংগঠনিক পদ-পদবির বাইরে রয়েছেন।

যাঁদের রাজনৈতিক পরিচয় তৈরি হয়েছে রাজপথে, যাঁদের তৃণমূলের নেতাকর্মীরা দীর্ঘদিন ধরে চেনেন এবং যাঁরা আন্দোলনের সময় নির্যাতিত-নিপীড়িত কর্মীদের পাশে ছিলেন, তাঁদের একটি বড় অংশের সঙ্গে বর্তমান আনুষ্ঠানিক সাংগঠনিক কাঠামোর দূরত্ব তৈরি হয়েছে বলে আলোচনা রয়েছে।

কেউ কেন্দ্রীয় রাজনীতিতে সক্রিয়, কেউ দলীয় পদে নেই, কেউ নতুন কমিটিতে স্থান পাননি, আবার কেউ মনোনয়ন বা অন্যান্য রাজনৈতিক সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে দলের সঙ্গে দূরত্বে গেছেন।

সংগঠনের শক্তি কি শুধু পদ-পদবিতে?

একটি রাজনৈতিক দলের প্রকৃত সাংগঠনিক শক্তি শুধু কেন্দ্রীয় কমিটি বা পদ-পদবি দিয়ে নির্ধারিত হয় না। মাঠের কর্মীদের সঙ্গে কার সরাসরি যোগাযোগ রয়েছে, সংকটের সময়ে কে কর্মীদের সংগঠিত করতে পারেন, কোন নেতার আহ্বানে তৃণমূলের কর্মীরা দ্রুত মাঠে নামেন এবং দীর্ঘদিনের আন্দোলনের মাধ্যমে কে এলাকায় সাংগঠনিক ভিত্তি তৈরি করেছেন এসবও একটি দলের বাস্তব শক্তির গুরুত্বপূর্ণ সূচক।

এই কারণে দীর্ঘদিনের মাঠের নেতৃত্বকে সাংগঠনিক কাঠামোর বাইরে রাখলে ধীরে ধীরে পুরোনো সাংগঠনিক নেটওয়ার্কের সঙ্গে দলের আনুষ্ঠানিক কাঠামোর দূরত্ব তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

এর ফলে কেন্দ্রের সঙ্গে তৃণমূলের যোগাযোগ দুর্বল হতে পারে, কর্মীদের সক্রিয়তা কমতে পারে এবং মাঠপর্যায়ে দ্রুত রাজনৈতিক কর্মসূচি বাস্তবায়নের সক্ষমতাও প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে।

তবে পুরোনো নেতৃত্বকে বাইরে রাখা মানেই সংগঠন দুর্বল—এমন সরল সিদ্ধান্তও টানা যায় না। নতুন নেতৃত্বের সাংগঠনিক সক্ষমতা, স্থানীয় গ্রহণযোগ্যতা এবং কর্মীদের সঙ্গে তাদের যোগাযোগও একইভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

গুলশানের ঘটনা কেন নতুন প্রশ্ন তুলেছে?

রাজধানীর গুলশানের মতো গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় সম্প্রতি নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের কর্মীদের আকস্মিক জমায়েত, মিছিল ও স্লোগানের ঘটনা রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনা তৈরি করেছে। পুলিশ তাদের ছত্রভঙ্গ করেছে এবং ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনাও ঘটেছে।

ঘটনাটি এককভাবে বিএনপির সাংগঠনিক দুর্বলতার প্রমাণ নয়। কারণ রাজধানীর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব শুধু রাজনৈতিক দলের নয়, রাষ্ট্রীয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীরও।

তবুও ক্ষমতাসীন দলের জন্য এটি একটি রাজনৈতিক সতর্কসংকেত হিসেবে দেখা যেতে পারে। কারণ রাজধানীর প্রতিটি এলাকায় দলীয় সংগঠন কতটা সক্রিয়, স্থানীয় নেতৃত্ব কতটা কার্যকর এবং কোনো আকস্মিক পরিস্থিতিতে দলীয় কর্মীরা কত দ্রুত সংগঠিত হতে পারেন—এসব প্রশ্ন এমন ঘটনার পর সামনে আসে।

ক্ষমতায় এসে বিএনপির সামনে নতুন পরীক্ষা

বিরোধী দল হিসেবে বিএনপি দীর্ঘদিন যে রাজপথের শক্তি তৈরি করেছে, ক্ষমতায় এসে সেই শক্তিকে সাংগঠনিক কাঠামোর সঙ্গে সমন্বয় করাই এখন বড় পরীক্ষা।

বিরোধী দলের আন্দোলন পরিচালনা এবং ক্ষমতাসীন দলের রাজনৈতিক সংগঠন পরিচালনা এক নয়। ক্ষমতায় থাকার সময় প্রশাসনিক দায়িত্বের পাশাপাশি দলীয় সংগঠন সক্রিয় রাখা, স্থানীয় নেতৃত্বের সঙ্গে সমন্বয় করা, কর্মী-সমর্থকদের রাজনৈতিকভাবে সম্পৃক্ত রাখা এবং রাজধানীর প্রতিটি এলাকায় সংগঠনের উপস্থিতি নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ।

এ ক্ষেত্রে নতুন নেতৃত্বের পাশাপাশি দীর্ঘদিনের মাঠের নেতাদের অভিজ্ঞতা কাজে লাগানো হলে সংগঠনের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা সহজ হতে পারে।

রাজপথে যারা দীর্ঘ সময় কর্মীদের সঙ্গে ছিলেন, মামলা-গ্রেপ্তার ও কারাবাসের মধ্যেও সাংগঠনিক যোগাযোগ ধরে রেখেছেন, তাঁদের অভিজ্ঞতা ক্ষমতার সময়েও দলটির জন্য কার্যকর সম্পদ হতে পারে।

শেষ পর্যন্ত প্রশ্ন একটাই

রাজধানীতে বিএনপির সংগঠন কতটা শক্তিশালী—এই প্রশ্নের উত্তর শুধু কেন্দ্রীয় কমিটিতে কারা আছেন বা কোন নেতা কোন পদে রয়েছেন, তা দিয়ে পাওয়া সম্ভব নয়।

মূল প্রশ্ন হলো, ঢাকার প্রতিটি থানা, ওয়ার্ড ও মহল্লায় দলের সাংগঠনিক নেটওয়ার্ক কতটা সক্রিয়; কর্মীদের সঙ্গে স্থানীয় নেতৃত্বের যোগাযোগ কতটা দৃঢ়; সংকটের সময়ে দ্রুত কর্মসূচি বাস্তবায়নের সক্ষমতা কতটা রয়েছে এবং দীর্ঘদিনের পরীক্ষিত মাঠের নেতৃত্বকে বর্তমান কাঠামোর সঙ্গে কতটা সমন্বয় করা যাচ্ছে।

মির্জা আব্বাস, হাবিব-উন-নবী খান সোহেল, নাসির উদ্দিন আহমেদ অসীম, আমানউল্লাহ আমান, মামুন হাসান, সাইফুল আলম নীরব, গোলাম মাওলা শাহীন, মির্জা আসলাম আলী ও কমিশনার আরিফের মতো নেতাদের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা এই বৃহত্তর প্রশ্নেরই অংশ।

পদে থাকা নেতৃত্ব এবং মাঠে গ্রহণযোগ্য নেতৃত্ব সব সময় একই বিষয় নয়। তাই বিএনপির সামনে এখন বড় সাংগঠনিক চ্যালেঞ্জ হলো পুরোনো পরীক্ষিত নেতৃত্ব, নতুন প্রজন্মের সংগঠক এবং তৃণমূলের কর্মীদের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় তৈরি করা।

আগামী দিনে দলটি ঢাকার পুরোনো মাঠের নেতৃত্বকে কতটা পুনরায় সাংগঠনিক কাজে যুক্ত করে এবং রাজধানীর প্রতিটি থানা, ওয়ার্ড ও মহল্লায় দলীয় সংগঠনকে কতটা সক্রিয় করতে পারে তার ওপরই অনেকটা নির্ভর করবে ক্ষমতাসীন বিএনপির প্রকৃত সাংগঠনিক শক্তি কতটা দৃশ্যমান ও কার্যকর হয়।

সিএসবি নিউজ-এর আরও খবর