নেতানিয়াহুকে ‘সন্ত্রাসী’ বলেছিল পাকিস্তান, ভাইরাল দাবিটি আসলে ২০২৪ সালের ঘটনা
পাকিস্তান সরকার ২০২৪ সালে নেতানিয়াহুকে ‘সন্ত্রাসী’ ও যুদ্ধাপরাধী বলেছিল, তবে এটি নতুন কোনো আনুষ্ঠানিক সন্ত্রাসী তালিকাভুক্তির সিদ্ধান্ত নয়।
নেতানিয়াহুকে ‘সন্ত্রাসী’ বলেছিল পাকিস্তান, ভাইরাল দাবিটি আসলে ২০২৪ সালের ঘটনা
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুকে পাকিস্তান সরকার ‘সন্ত্রাসী’ হিসেবে অভিহিত করেছিল—এই দাবিটি নতুন করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ায় বিষয়টি নিয়ে বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে। যাচাই করে দেখা যাচ্ছে, দাবিটির মূল ঘটনা সত্য হলেও এটি ২০২৬ সালের নতুন কোনো সিদ্ধান্ত নয়; ২০২৪ সালের জুলাইয়ের ঘটনা। ওই সময় পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের রাজনৈতিকবিষয়ক উপদেষ্টা রানা সানাউল্লাহ প্রকাশ্য সংবাদ সম্মেলনে নেতানিয়াহুকে ‘সন্ত্রাসী’ এবং ‘যুদ্ধাপরাধী’ হিসেবে উল্লেখ করেন।
ঘটনাটি ঘটে পাকিস্তানের ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দল তেহরিক-ই-লাব্বাইক পাকিস্তানের—টিএলপি—ইসরায়েলবিরোধী আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে। ২০২৪ সালের জুলাইয়ে গাজায় ইসরায়েলি সামরিক অভিযানের প্রতিবাদে টিএলপি পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদের গুরুত্বপূর্ণ ফয়জাবাদ ইন্টারচেঞ্জ এলাকায় অবস্থান কর্মসূচি শুরু করে। দলটির পক্ষ থেকে সরকারের কাছে কয়েকটি দাবি উত্থাপন করা হয়। এর মধ্যে ছিল ফিলিস্তিনিদের জন্য মানবিক সহায়তা বাড়ানো, ইসরায়েলি পণ্য বর্জন এবং বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুকে ‘সন্ত্রাসী’ ঘোষণা করার দাবি।
পরবর্তীতে পাকিস্তান সরকারের সঙ্গে টিএলপির আলোচনা শুরু হয়। ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই রানা সানাউল্লাহ এবং তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী আতাউল্লাহ তারার সরকারের পক্ষ থেকে আলোচনায় অংশ নেন। পরদিন ডন-এর প্রতিবেদনে বলা হয়, সরকারের সঙ্গে সমঝোতার পর টিএলপি ফয়জাবাদের অবস্থান কর্মসূচি প্রত্যাহার করে। সমঝোতার অংশ হিসেবে ফিলিস্তিনিদের জন্য পাকিস্তানের মানবিক সহায়তা বাড়ানোর কথা জানানো হয়।
এই সমঝোতার পর রানা সানাউল্লাহ এক সংবাদ সম্মেলনে ইসরায়েলকে ‘সন্ত্রাসী রাষ্ট্র’ হিসেবে আখ্যায়িত করেন এবং নেতানিয়াহুকে যুদ্ধাপরাধী হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ও মুসলিম বিশ্বের প্রতি নেতানিয়াহুকে জবাবদিহির আওতায় এনে বিচারের মুখোমুখি করার আহ্বান জানান। যুক্তরাষ্ট্রের ভয়েস অব আমেরিকাও ১৯ জুলাই ২০২৪-এর প্রতিবেদনে বিষয়টি নিশ্চিত করে জানায়, পাকিস্তান সরকারের পক্ষ থেকে রানা সানাউল্লাহ নেতানিয়াহুকে ‘সন্ত্রাসী’ এবং যুদ্ধাপরাধের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তি হিসেবে অভিহিত করেছিলেন।
পাকিস্তানের এই অবস্থানের পেছনে সে সময় গাজা যুদ্ধকে ঘিরে দেশটির তীব্র রাজনৈতিক ও জনমতগত প্রতিক্রিয়া গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। পাকিস্তান দীর্ঘদিন ধরে ইসরায়েলকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেয়নি এবং দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্কও নেই। ২০২৪ সালের ওই সময়েও পাকিস্তান সরকার গাজায় বেসামরিক মানুষের হতাহতের ঘটনায় ইসরায়েলের তীব্র সমালোচনা করছিল এবং ফিলিস্তিনিদের জন্য মানবিক সহায়তা পাঠানোর কথা জানাচ্ছিল।
ডন-এর প্রতিবেদনে বলা হয়, পাকিস্তান সরকার ফিলিস্তিনিদের জন্য এক হাজার টনের বেশি খাদ্য ও ওষুধ পাঠানোর পরিকল্পনার কথা ঘোষণা করেছিল। একই সঙ্গে আহত ফিলিস্তিনিদের চিকিৎসার সুযোগ দেওয়ার এবং প্রয়োজনে চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মী পাঠানোর কথাও বলা হয়েছিল। ফিলিস্তিনি শিক্ষার্থীদের পাকিস্তানে পড়াশোনার সুযোগ দেওয়ার বিষয়টিও সেই সমঝোতার অংশ হিসেবে উঠে আসে।
তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় পরিষ্কার করা প্রয়োজন। ‘কাউকে সন্ত্রাসী বলা’ এবং কোনো দেশের আইনি কাঠামোর অধীনে তাকে আনুষ্ঠানিকভাবে সন্ত্রাসী তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা একই বিষয় নয়। ২০২৪ সালের ঘটনায় পাকিস্তানের একজন জ্যেষ্ঠ সরকারি কর্মকর্তা নেতানিয়াহুকে প্রকাশ্যে ‘সন্ত্রাসী’ ও ‘যুদ্ধাপরাধী’ হিসেবে অভিহিত করেছিলেন। কিন্তু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারিত পোস্টগুলো অনেক সময় এটিকে এমনভাবে উপস্থাপন করছে, যেন ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে পাকিস্তান নতুন করে কোনো আইনি বা প্রশাসনিক আদেশ জারি করে নেতানিয়াহুকে সন্ত্রাসী তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করেছে। বর্তমান অনুসন্ধানে এমন নতুন সিদ্ধান্তের নির্ভরযোগ্য প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
বরং পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ২০২৪ সালের ২৫ জুলাইয়ের ব্রিফিংয়ের অনুসন্ধানযোগ্য তথ্যেও নেতানিয়াহুকে ‘সন্ত্রাসী’ বলার প্রসঙ্গ উঠে এসেছে। অর্থাৎ বিষয়টি তখনকার পাকিস্তানি সরকারের রাজনৈতিক অবস্থানের অংশ হিসেবেই নথিভুক্ত হয়েছিল।
এদিকে নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক পর্যায়েও গুরুতর অভিযোগ ও আইনি পদক্ষেপের বিষয়টি আলাদা বাস্তবতা। আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত বা আইসিসি ২০২৪ সালের নভেম্বর মাসে বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে। আদালতের নথিতে তাঁর বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগের কথা উল্লেখ রয়েছে। তবে কোনো আন্তর্জাতিক আদালতের গ্রেপ্তারি পরোয়ানা এবং কোনো রাষ্ট্রের নিজস্ব ‘সন্ত্রাসী’ তালিকায় কাউকে অন্তর্ভুক্ত করা—এ দুটিও পৃথক আইনি বিষয়।
২০২৪ সালের জুলাইয়ের পাকিস্তানি ঘোষণার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল ইসরায়েল-সংশ্লিষ্ট পণ্য ও প্রতিষ্ঠানের বিষয়ে সরকারের অবস্থান। রানা সানাউল্লাহ সে সময় বলেছিলেন, যেসব কোম্পানি সরাসরি বা পরোক্ষভাবে ইসরায়েলি বাহিনীর কথিত কর্মকাণ্ডে সহায়তা করছে, সেসব প্রতিষ্ঠানের পণ্য ও সেবা বর্জনের বিষয়টি সরকার বিবেচনা করবে। এর জন্য সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলোর সঙ্গে ইসরায়েলের সম্ভাব্য সম্পর্ক খতিয়ে দেখতে একটি কমিটি গঠনের কথাও বলা হয়েছিল।
তবে এই ঘটনাকে পাকিস্তানের সঙ্গে ইসরায়েলের সম্পর্কের কোনো নতুন কূটনৈতিক পরিবর্তন হিসেবে দেখার সুযোগও সীমিত। পাকিস্তান ঐতিহাসিকভাবেই ইসরায়েলকে স্বীকৃতি দেয়নি। গাজা ইস্যুতে ইসলামাবাদ নিয়মিতভাবে ফিলিস্তিনিদের পক্ষে অবস্থান নিয়ে আসছে। ২০২৪ সালের ঘটনাটি সেই দীর্ঘদিনের পররাষ্ট্রনীতির ধারাবাহিকতায় আরও কঠোর রাজনৈতিক বক্তব্য হিসেবে সামনে আসে।