মিশিগানের ৬৪ বছরের পুরোনো কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্র নিয়ে আদালতের রায়

জরুরি ক্ষমতা ব্যবহার করে অবসরপ্রাপ্তির পথে থাকা কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্র চালু রাখার ট্রাম্প প্রশাসনের সিদ্ধান্তকে আইনসঙ্গত নয় বলেছে ফেডারেল আপিল আদালত।

মিশিগানের ৬৪ বছরের পুরোনো কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্র নিয়ে আদালতের রায়

মিশিগানের ৬৪ বছরের পুরোনো কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্র নিয়ে আদালতের রায়


যুক্তরাষ্ট্রের মিশিগান অঙ্গরাজ্যের ৬৪ বছরের পুরোনো জে এইচ ক্যাম্পবেল কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্র চালু রাখার জন্য ট্রাম্প প্রশাসনের নেওয়া সিদ্ধান্ত বাতিল করেছে একটি ফেডারেল আপিল আদালত। আদালত বলেছে, বিদ্যুৎকেন্দ্রটি নির্ধারিত সময়ের পর চালু রাখতে জ্বালানি মন্ত্রণালয় যে জরুরি ক্ষমতা ব্যবহার করেছিল, তার জন্য আইনে প্রয়োজনীয় বাস্তব জরুরি পরিস্থিতি ছিল না।

মিশিগানের পশ্চিমাঞ্চলে অবস্থিত ক্যাম্পবেল বিদ্যুৎকেন্দ্রটি দীর্ঘদিন ধরে স্থানীয় বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থার একটি অংশ ছিল। কেন্দ্রটি প্রায় ৬৪ বছর ধরে কয়লা ব্যবহার করে বিদ্যুৎ উৎপাদন করে আসছিল। তবে বয়স ও পরিবেশগত কারণে প্রতিষ্ঠানটির মালিক নির্ধারিত পরিকল্পনা অনুযায়ী কেন্দ্রটি বন্ধ করার প্রস্তুতি নিচ্ছিল।

ট্রাম্প প্রশাসন ক্ষমতায় আসার পর বিদ্যুৎ সরবরাহের স্থিতিশীলতা এবং জাতীয় জ্বালানি নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। প্রশাসনের যুক্তি ছিল, যুক্তরাষ্ট্রে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডেটা সেন্টার ও শিল্প উৎপাদনের কারণে বিদ্যুতের চাহিদা দ্রুত বাড়ছে। ফলে পুরোনো বিদ্যুৎকেন্দ্র দ্রুত বন্ধ হয়ে গেলে কোনো কোনো অঞ্চলে বিদ্যুৎ ঘাটতি বা ব্ল্যাকআউটের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

এই যুক্তির ভিত্তিতে জ্বালানি মন্ত্রণালয় জরুরি ক্ষমতা ব্যবহার করে ক্যাম্পবেল কেন্দ্রটি নির্ধারিত অবসরের পরও চালু রাখার নির্দেশ দেয়। কিন্তু পরিবেশবাদী সংগঠন এবং মিশিগান, ইলিনয় ও মিনেসোটা অঙ্গরাজ্য এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আদালতে যায়।

মামলাটির মূল প্রশ্ন ছিল—ফেডারেল সরকার কি জরুরি ক্ষমতা ব্যবহার করে একটি বিদ্যুৎকেন্দ্রের পরিকল্পিত অবসর বাতিল করতে পারে?

কলম্বিয়া সার্কিটের যুক্তরাষ্ট্রের আপিল আদালত বলেছে, বিদ্যুৎ আইন অনুযায়ী জরুরি ক্ষমতা অত্যন্ত সীমিত পরিস্থিতিতে ব্যবহার করার কথা। আদালতের মতে, এটি এমন একটি ব্যবস্থা যা একেবারে শেষ উপায় হিসেবে প্রয়োগ করার জন্য তৈরি করা হয়েছে।

তিন বিচারকের বেঞ্চ সর্বসম্মতভাবে মিশিগান ও পরিবেশবাদী সংগঠনগুলোর পক্ষে সিদ্ধান্ত দেয়। বিচারক কর্নেলিয়া পিলার্ড লিখেছেন, জরুরি ক্ষমতা প্রয়োগের জন্য তাৎক্ষণিক এবং বিশেষ ধরনের পরিস্থিতি প্রয়োজন। সাধারণভাবে কোনো বিদ্যুৎকেন্দ্রের অবসর পরিকল্পনা বাতিল করার জন্য এই ক্ষমতা ব্যবহার করা যায় না।

আদালত আরও বলেছে, ক্যাম্পবেল বিদ্যুৎকেন্দ্রের অবসর পরিকল্পনা দীর্ঘদিন ধরে করা হয়েছিল। শেষ মুহূর্তে সেই পরিকল্পনা বদলে দেওয়া স্থানীয় প্রশাসন ও বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনার জন্যও অপ্রত্যাশিত চাপ তৈরি করেছে।

মিশিগানের অ্যাটর্নি জেনারেল ডানা নেসেল আদালতের সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছেন। তিনি ট্রাম্প প্রশাসনের সিদ্ধান্তকে বেআইনি রাজনৈতিক পদক্ষেপ বলে সমালোচনা করেন। তবে প্রশাসন তার সিদ্ধান্তের পক্ষে যুক্তি দিয়েছে।

জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের বক্তব্য অনুযায়ী, জরুরি আদেশগুলো গত শীতের প্রচণ্ড আবহাওয়ার সময় বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থা সচল রাখতে সহায়তা করেছে। মন্ত্রণালয়ের দাবি, এসব পদক্ষেপ ব্ল্যাকআউট ঠেকাতে এবং সম্ভাব্য প্রাণহানি কমাতে ভূমিকা রেখেছে।

এই বিরোধের মূল জায়গায় রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ বিদ্যুৎ চাহিদা। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তির বিস্তারের কারণে ডেটা সেন্টারের সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে। এসব ডেটা সেন্টার বিপুল পরিমাণ বিদ্যুৎ ব্যবহার করে। একই সঙ্গে বৈদ্যুতিক গাড়ি, শিল্প উৎপাদন এবং নতুন প্রযুক্তি অবকাঠামোর কারণে বিদ্যুতের চাহিদা বাড়ছে।

ট্রাম্প প্রশাসন এই পরিস্থিতিকে জাতীয় জ্বালানি নিরাপত্তার সঙ্গে যুক্ত করেছে। ২০২৫ সালে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রে জাতীয় জ্বালানি জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছিলেন। প্রশাসনের মতে, ভবিষ্যতের বিদ্যুৎ চাহিদা পূরণের জন্য বিদ্যুৎ উৎপাদনের সব সম্ভাব্য উৎস প্রস্তুত রাখা প্রয়োজন।

কিন্তু পরিবেশবাদীরা বলছেন, পুরোনো কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্র চালু রাখলে বায়ু ও পানিদূষণ বাড়ে। কয়লা বিদ্যুৎ উৎপাদন কার্বন নিঃসরণও বাড়ায়। ফলে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলার মার্কিন নীতির সঙ্গে এ ধরনের সিদ্ধান্ত সাংঘর্ষিক।

আরেকটি সমস্যা হলো অর্থনৈতিক ব্যয়। আদালতের নথি ও মামলার তথ্য অনুযায়ী, ক্যাম্পবেল বিদ্যুৎকেন্দ্র চালু রাখার ব্যয় প্রায় ২৫ কোটি ৯০ লাখ ডলারে পৌঁছেছে। এই অর্থের একটি অংশ বিদ্যুৎ ব্যবহারকারীদের ওপর অতিরিক্ত বিল হিসেবে চাপতে পারে বলে সমালোচকেরা সতর্ক করেছেন।

তবে বিদ্যুৎ সরবরাহের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশাসনের উদ্বেগও পুরোপুরি অমূলক নয়। প্রচণ্ড শীত বা গরমের সময় বিদ্যুতের চাহিদা হঠাৎ বেড়ে গেলে পুরোনো কেন্দ্রগুলো অতিরিক্ত উৎপাদন ক্ষমতা দিতে পারে। এই কারণেই সরকার কিছু পুরোনো কেন্দ্র সাময়িকভাবে চালু রাখার পক্ষে যুক্তি দিচ্ছে।

মিশিগানের মামলার রায়ের পরও বিতর্ক শেষ হচ্ছে না। আদালতের সিদ্ধান্তের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই জ্বালানি মন্ত্রী ক্রিস রাইট ওয়াশিংটনের একটি কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্র চালু রাখার জন্য নতুন জরুরি আদেশ জারি করেছেন। প্রশাসন ইন্ডিয়ানা, কলোরাডো ও ফ্লোরিডাসহ আরও কয়েকটি অঙ্গরাজ্যের বিদ্যুৎকেন্দ্র নিয়ে একই ধরনের ব্যবস্থা নিয়েছে।

ফলে মিশিগানের রায় ভবিষ্যতের অন্যান্য মামলার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ নজির হতে পারে। আদালত যদি একই যুক্তি প্রয়োগ করে, তাহলে ট্রাম্প প্রশাসনের পুরোনো কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্র চালু রাখার নীতির বিরুদ্ধে আরও আইনি চ্যালেঞ্জ তৈরি হতে পারে।

অন্যদিকে প্রশাসন যদি প্রমাণ করতে পারে যে নির্দিষ্ট কোনো অঞ্চলে সত্যিই তাৎক্ষণিক বিদ্যুৎ সংকটের আশঙ্কা রয়েছে, তাহলে জরুরি ক্ষমতা ব্যবহারের পক্ষে আইনি ভিত্তি শক্তিশালী হতে পারে।

বর্তমান পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্র এক ধরনের জ্বালানি নীতির দ্বন্দ্বের মধ্যে রয়েছে। একদিকে নির্ভরযোগ্য ও পর্যাপ্ত বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা প্রয়োজন, অন্যদিকে পুরোনো কয়লা কেন্দ্র বন্ধ করে পরিচ্ছন্ন জ্বালানিতে যাওয়ার চাপও রয়েছে।

মিশিগানের আদালতের সিদ্ধান্ত সেই দ্বন্দ্বকে আরও স্পষ্ট করে তুলেছে। এখন দেখার বিষয়, ট্রাম্প প্রশাসন এই রায়ের বিরুদ্ধে আরও আইনি পদক্ষেপ নেয় কি না এবং অন্যান্য কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্র চালু রাখার সিদ্ধান্তগুলো ভবিষ্যতে আদালতে কীভাবে টিকে থাকে।

সিএসবি নিউজ-এর আরও খবর