যুক্তরাষ্ট্রে প্রথমবার বিশেষ সন্ত্রাসবাদ আদালত ব্যবহার করে আফগান নারীকে ফেরত পাঠানো
১৯৯৬ সালে তৈরি হলেও এতদিন কার্যত নিষ্ক্রিয় থাকা বিশেষ আদালত প্রথমবার ব্যবহার করে আফগান নারীকে দেশে ফেরত পাঠানো হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রে প্রথমবার বিশেষ সন্ত্রাসবাদ আদালত ব্যবহার করে আফগান নারীকে ফেরত পাঠানো
যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন ও জাতীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ একটি নজির তৈরি হয়েছে। দীর্ঘদিন নিষ্ক্রিয় থাকা বিশেষ একটি আদালত ব্যবহার করে আফগানিস্তানের ৪৭ বছর বয়সী এক নারীকে যুক্তরাষ্ট্র থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। মার্কিন বিচার বিভাগের ভাষ্য অনুযায়ী, এটি বিদেশি সন্ত্রাসী অপসারণ আদালত বা বিদেশি সন্ত্রাসী অপসারণ আদালতের প্রথম সম্পন্ন মামলা।
নারীটির নাম নাজিরা হাজি জাদা। তিনি টেক্সাসের ফোর্ট ওয়ার্থ এলাকায় বসবাস করছিলেন এবং যুক্তরাষ্ট্রে বৈধ স্থায়ী বাসিন্দা ছিলেন। মার্কিন কর্তৃপক্ষের অভিযোগ ছিল, তিনি ইসলামিক স্টেট-অনুপ্রাণিত একটি হামলার পরিকল্পনার সঙ্গে যুক্ত পরিবারের সদস্যদের সহায়তা করেছিলেন।
তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, হাজি জাদার বিরুদ্ধে প্রচলিত ফৌজদারি আদালতে সন্ত্রাসবাদ বা হামলার অভিযোগে অপরাধমূলক মামলা চালানো হয়নি। তার বিরুদ্ধে অভিবাসন আইনের বিশেষ ব্যবস্থায় ব্যবস্থা নেওয়া হয়। বিচার বিভাগ বলেছে, সংশ্লিষ্ট বিশেষ আদালতের সামনে তিনি নিজের অবস্থান নিয়ে আপত্তি না করে বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত মেনে নেন এবং আপিলের অধিকারও ত্যাগ করেন।
এই আদালত ১৯৯৬ সালে মার্কিন কংগ্রেসের মাধ্যমে তৈরি করা হয়েছিল। এর উদ্দেশ্য ছিল, যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থানরত এমন বিদেশিদের দ্রুত অপসারণ করা, যাদের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবাদে সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে। কিন্তু আইনটি তৈরি হওয়ার পর বহু বছর আদালতটি ব্যবহার করা হয়নি।
ট্রাম্প প্রশাসন অভিবাসন ও জাতীয় নিরাপত্তা নীতিতে কঠোর অবস্থান নেওয়ার পর আদালতটির ব্যবহার আবার সামনে আসে। প্রশাসনের কর্মকর্তারা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তার জন্য যেসব ব্যক্তিকে ঝুঁকি হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে, তাদের বিরুদ্ধে বিদ্যমান আইনি কাঠামোর সব ধরনের ব্যবস্থা ব্যবহার করা হবে।
বিচার বিভাগের দাবি অনুযায়ী, নাজিরা হাজি জাদার পরিবারের কয়েকজন সদস্য ২০২৪ সালের নির্বাচনের দিনে একটি হামলার পরিকল্পনার সঙ্গে জড়িত ছিলেন। তার ছেলে আবদুল্লাহ হাজি জাদা এবং জামাতা নাসির আহমদ তাওহিদি পরবর্তী সময়ে সংশ্লিষ্ট মামলায় দোষ স্বীকার করেন।
মার্কিন কর্তৃপক্ষের অভিযোগ ছিল, হামলার পরিকল্পনায় আগ্নেয়াস্ত্র সংগ্রহসহ অন্যান্য প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছিল। তবে নাজিরা হাজি জাদার আইনজীবীরা বিশেষ আদালতের কার্যক্রম নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তাদের বক্তব্য, মামলায় ব্যবহৃত কিছু তথ্য গোপনীয় বা শ্রেণিবদ্ধ হওয়ায় আসামিপক্ষ সব প্রমাণ স্বাভাবিক ফৌজদারি মামলার মতো যাচাই করার সুযোগ পায়নি।
এই বিষয়টি যুক্তরাষ্ট্রের সাংবিধানিক অধিকার নিয়ে নতুন বিতর্ক সৃষ্টি করেছে। সাধারণ ফৌজদারি মামলায় অভিযুক্ত ব্যক্তিরা প্রমাণ দেখার, আইনজীবীর মাধ্যমে নিজেদের পক্ষে যুক্তি দেওয়ার এবং আদালতের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিল করার বিস্তৃত অধিকার পান। কিন্তু বিশেষ অভিবাসন আদালতের ক্ষেত্রে সরকারের হাতে তুলনামূলকভাবে ভিন্ন ধরনের ক্ষমতা থাকে।
অ্যাটর্নি জেনারেল টড ব্ল্যাঞ্চ ঘটনাটিকে জাতীয় নিরাপত্তার সাফল্য হিসেবে তুলে ধরেছেন। তার বক্তব্য, সন্ত্রাসবাদকে সমর্থনকারী বা সন্ত্রাসী কার্যক্রমে সহযোগিতা করা ব্যক্তিদের যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থানের সুযোগ দেওয়া হবে না।
অন্যদিকে নাগরিক স্বাধীনতা ও অভিবাসন অধিকার নিয়ে কাজ করা আইনজীবীরা সতর্ক করেছেন, গোপন প্রমাণের ওপর নির্ভর করে কোনো বৈধ স্থায়ী বাসিন্দাকে বহিষ্কার করা হলে তা ভবিষ্যতে সাংবিধানিক চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে।
এই মামলার গুরুত্ব এখানেই যে, এটি ভবিষ্যতে একই ধরনের আরও মামলার দরজা খুলে দিতে পারে। প্রশাসন যদি মনে করে আদালতটি কার্যকর, তাহলে সন্ত্রাসবাদ-সংশ্লিষ্ট অভিযোগ থাকা বিদেশিদের ক্ষেত্রে এই প্রক্রিয়া আরও বেশি ব্যবহৃত হতে পারে।
অভিবাসন বিশেষজ্ঞদের কাছে প্রশ্ন হচ্ছে, এই আদালত কি শুধু প্রকৃত জাতীয় নিরাপত্তা ঝুঁকির ক্ষেত্রে ব্যবহার করা হবে, নাকি প্রশাসনের বিস্তৃত অভিবাসন নীতির অংশ হিসেবেও এর ব্যবহার বাড়বে।
বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসন অভিযান, আটক ও বহিষ্কার নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক তীব্র। ট্রাম্প প্রশাসন অবৈধ অভিবাসন বন্ধের পাশাপাশি জাতীয় নিরাপত্তার ঝুঁকি মোকাবিলাকে অভিবাসন নীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে তুলে ধরছে। এই ঘটনার মাধ্যমে সেই নীতির একটি নতুন আইনি দিক সামনে এসেছে।
নাজিরা হাজি জাদা এখন যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে। তবে তার মামলার সাংবিধানিক ও আইনি প্রশ্ন এখানেই শেষ হচ্ছে না। আইন বিশেষজ্ঞদের ধারণা, ভবিষ্যতে এই বিশেষ আদালতের বৈধতা, প্রমাণ ব্যবহারের পদ্ধতি এবং অভিযুক্ত ব্যক্তিদের অধিকার নিয়ে আদালতে আরও চ্যালেঞ্জ আসতে পারে।
ফলে একজন আফগান নারীকে ফেরত পাঠানোর ঘটনাটি শুধু একটি অভিবাসন মামলার সমাপ্তি নয়; বরং যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা, অভিবাসন আইন এবং সাংবিধানিক অধিকার—এই তিনটির সংঘাতের একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হয়ে উঠেছে।