অ্যারিজোনায় শেরিফ কার্যালয়ের ওপর আদালতের নজরদারি বহাল
বছরের পর বছর চলা বর্ণবৈষম্যের মামলায় সংস্কার যথেষ্ট হয়নি বলে মনে করে অ্যারিজোনার শেরিফ কার্যালয়ের ওপর আদালতের নজরদারি বহাল রেখেছেন বিচারক।
অ্যারিজোনায় শেরিফ কার্যালয়ের ওপর আদালতের নজরদারি বহাল
যুক্তরাষ্ট্রের অ্যারিজোনা অঙ্গরাজ্যের মারিকোপা কাউন্টি শেরিফ কার্যালয়ের ওপর দীর্ঘদিন ধরে চলা ফেডারেল আদালতের নজরদারি আপাতত শেষ হচ্ছে না। সাবেক শেরিফ জো আরপাইওর সময় লাতিনো ও হিস্পানিক জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে বর্ণভিত্তিক আইন প্রয়োগের অভিযোগে যে মামলার সূত্রপাত হয়েছিল, সেই মামলায় বর্তমান প্রশাসন আদালতের তত্ত্বাবধান থেকে বেরিয়ে আসার আবেদন করেছিল। কিন্তু ফেডারেল জেলা বিচারক জি. মারে স্নো সেই আবেদন নাকচ করে দিয়েছেন।
মামলাটির শিকড় প্রায় দুই দশক আগের। ২০০৭ সালে মারিকোপা কাউন্টি শেরিফ কার্যালয়ের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়। অভিযোগ ছিল, অভিবাসনবিরোধী অভিযানের অংশ হিসেবে পুলিশ কর্মকর্তারা ট্রাফিক আইন প্রয়োগের সময় হিস্পানিক চালকদের অসামঞ্জস্যপূর্ণভাবে বা তুলনামূলকভাবে বেশি টার্গেট করতেন। পরবর্তী সময়ে আদালত এই কার্যক্রমের বিভিন্ন দিক নিয়ে কঠোর অবস্থান নেয় এবং শেরিফ কার্যালয়ের ওপর সংস্কার ও নজরদারির ব্যবস্থা চালু হয়।
সাবেক শেরিফ জো আরপাইও দীর্ঘদিন ধরে অভিবাসনবিরোধী কঠোর অবস্থানের জন্য জাতীয়ভাবে পরিচিত ছিলেন। তার সময় মারিকোপা কাউন্টিতে অভিবাসীদের বিরুদ্ধে ব্যাপক অভিযান পরিচালিত হয়। আদালতের পর্যবেক্ষণে ট্রাফিক থামানো, গ্রেপ্তার এবং আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে হিস্পানিক জনগোষ্ঠীর ওপর বৈষম্যমূলক প্রভাবের বিষয়টি উঠে আসে।
বর্তমান শেরিফ জেরি শেরিডানের প্রশাসন অবশ্য দাবি করে আসছে, সেই সময়ের পরিস্থিতি এখন আর নেই। তাদের বক্তব্য, বিভাগে বড় ধরনের সংস্কার হয়েছে এবং কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ ও তদারকি ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনা হয়েছে। কাউন্টি কর্মকর্তারা আদালতের কাছে যুক্তি দেন, পুরোনো নীতিগুলো বাতিল হয়েছে এবং বর্তমান শেরিফ কার্যালয় সাংবিধানিক নিয়ম মেনে কাজ করছে।
তবে বিচারক স্নো মনে করেছেন, আদালতের আদেশের মূল লক্ষ্য পুরোপুরি অর্জিত হয়েছে এমন প্রমাণ কাউন্টি দিতে পারেনি। তার মতে, ভবিষ্যতে একই ধরনের আচরণ যাতে আবার ফিরে না আসে, সে জন্য একটি স্থায়ী ও কার্যকর ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বলেও যথেষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
মামলার সঙ্গে যুক্ত তথ্য অনুযায়ী, ট্রাফিক থামানোর ক্ষেত্রে হিস্পানিক ও শ্বেতাঙ্গ চালকদের মধ্যে আচরণগত পার্থক্য নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই পর্যালোচনা হয়েছে। আদালত-নিযুক্ত পর্যবেক্ষকদের রিপোর্টে কিছু ক্ষেত্রে হিস্পানিক চালকদের থামানোর পর অতিরিক্ত সময় ধরে রাখার প্রবণতার কথাও উঠে এসেছে।
কাউন্টি কর্মকর্তাদের জন্য এই সিদ্ধান্তের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো আর্থিক ব্যয়। দীর্ঘদিনের আদালত-নির্দেশিত সংস্কার, আইনি প্রক্রিয়া ও নজরদারিতে বিপুল অর্থ ব্যয় হয়েছে। স্থানীয় কর্মকর্তারা মনে করেন, এত বছর পরও আদালতের তত্ত্বাবধান চালু থাকা প্রশাসনিক ও আর্থিকভাবে চাপ সৃষ্টি করছে।
তবে মানবাধিকার ও নাগরিক অধিকারকর্মীদের বক্তব্য ভিন্ন। তাদের মতে, আদালতের নজরদারি তুলে নেওয়ার আগে আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে বৈষম্যের ঝুঁকি পুরোপুরি দূর হয়েছে কি না, সেটি নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন। তারা মনে করেন, শুধু প্রশাসনের অভ্যন্তরীণ রিপোর্টের ওপর নির্ভর না করে স্বাধীনভাবে তথ্য যাচাই করা জরুরি।
এই মামলার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসন আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকা। ফেডারেল সরকার অভিবাসন আইন প্রয়োগে জোর দেওয়ার সময় স্থানীয় পুলিশ ও শেরিফ কার্যালয়ের সঙ্গে সহযোগিতা বাড়ানোর চেষ্টা করছে। ফলে পুরোনো বর্ণভিত্তিক আইন প্রয়োগের অভিযোগ নতুন করে রাজনৈতিক ও আইনি গুরুত্ব পাচ্ছে।
মারিকোপা কাউন্টি কর্তৃপক্ষ আদালতের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিল করার সম্ভাবনার কথা জানিয়েছে। অন্যদিকে বিচারক পক্ষগুলোকে নজরদারির কিছু অংশ কমানো যায় কি না, সে বিষয়ে পরবর্তী পর্যায়ে আলোচনা করার সুযোগ রেখেছেন। অর্থাৎ আদালতের নজরদারি পুরোপুরি শেষ না হলেও ভবিষ্যতে এর পরিধি কিছুটা কমতে পারে।
মামলাটি শুধু অ্যারিজোনার স্থানীয় প্রশাসনের বিষয় নয়; এটি যুক্তরাষ্ট্রের আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর জবাবদিহি নিয়েও বড় প্রশ্ন সামনে এনেছে। পুলিশ বা শেরিফ কার্যালয় আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে কোনো জনগোষ্ঠীকে জাতিগত পরিচয়ের ভিত্তিতে আলাদাভাবে টার্গেট করছে কি না, সেটি কীভাবে নির্ধারণ করা হবে—এই প্রশ্নটি বহু বছর ধরে মার্কিন আদালত ও নাগরিক অধিকার সংগঠনগুলোর আলোচনায় রয়েছে।
বিচারকের সর্বশেষ সিদ্ধান্তে তাই একটি বিষয় স্পষ্ট হয়েছে—কোনো সংস্থা সংস্কারের দাবি করলেই আদালতের দীর্ঘদিনের নজরদারি স্বয়ংক্রিয়ভাবে শেষ হবে না। আদালত দেখতে চাইছে, সংস্কার কাগজে-কলমে নয়, বাস্তবে কতটা কার্যকর হয়েছে এবং ভবিষ্যতে পুরোনো পদ্ধতিতে ফিরে যাওয়ার ঝুঁকি কতটা কমেছে।
মারিকোপা কাউন্টির ক্ষেত্রে সেই প্রশ্নের উত্তর এখনো পুরোপুরি সন্তোষজনক নয় বলেই আদালত নজরদারি বহাল রেখেছে। মামলার পরবর্তী ধাপে নজরদারির কোন অংশ থাকবে এবং কোন অংশ কমানো যেতে পারে, তা নিয়ে নতুন সিদ্ধান্ত আসতে পারে।