নিউইয়র্কে অভিবাসী শ্রমিকদের জন্য নতুন সুরক্ষা, মজুরি চুরি ঠেকাতে বাড়ছে সরকারি নজরদারি

বাংলাদেশিসহ অভিবাসী শ্রমিকদের মজুরি চুরি, হয়রানি ও কর্মক্ষেত্রে বৈষম্য ঠেকাতে নিউইয়র্ক নগর প্রশাসন নতুন কঠোর ব্যবস্থা নিয়েছে আজ।

নিউইয়র্কে অভিবাসী শ্রমিকদের জন্য নতুন সুরক্ষা, মজুরি চুরি ঠেকাতে বাড়ছে সরকারি নজরদারি

নিউইয়র্কে অভিবাসী শ্রমিকদের জন্য নতুন সুরক্ষা, মজুরি চুরি ঠেকাতে বাড়ছে সরকারি নজরদারি


নিউইয়র্ক শহরে কর্মরত বাংলাদেশিসহ অভিবাসী শ্রমিকদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ নতুন উদ্যোগ নিয়েছে নগর প্রশাসন। মেয়র জোহরান মামদানি ৩ সেপ্টেম্বর একটি নির্বাহী আদেশ জারি করেছেন, যার মাধ্যমে শ্রমিক অধিকার লঙ্ঘনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে আরও সক্রিয়ভাবে তদন্ত ও ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। 


নতুন ব্যবস্থার আওতায় কোনো শ্রমিক আলাদাভাবে অভিযোগ না করলেও নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে নগর কর্তৃপক্ষ কর্মক্ষেত্রে তদন্ত শুরু করতে পারবে। বিশেষ করে যেসব প্রতিষ্ঠানের অতীতে শ্রম আইন লঙ্ঘনের ইতিহাস রয়েছে অথবা যেখানে কম মজুরিতে বিপুলসংখ্যক শ্রমিক কাজ করেন, সেসব প্রতিষ্ঠানের ওপর নজরদারি বাড়ানো হবে। 


বাংলাদেশি প্রবাসীদের জন্য বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। নিউইয়র্কে বাংলাদেশি কমিউনিটির বড় একটি অংশ রেস্তোরাঁ, দোকান, পরিবহন, পরিচ্ছন্নতাকর্ম, নির্মাণ, স্বাস্থ্যসেবা, গুদাম, ছোট ব্যবসা এবং অন্যান্য সেবা খাতে কাজ করেন। এসব খাতে কর্মীদের মজুরি, কর্মঘণ্টা, ছুটি, নিরাপত্তা ও কর্মক্ষেত্রে আচরণ নিয়ে সমস্যা তৈরি হলে নতুন ব্যবস্থার মাধ্যমে নগর কর্তৃপক্ষ আরও সক্রিয়ভাবে নজর দিতে পারবে।


নির্বাহী আদেশে বলা হয়েছে, শ্রমিক সুরক্ষা আইন প্রয়োগকারী নগর সংস্থাগুলোকে এমন ব্যবস্থা নিতে হবে যাতে শ্রমিকরা নিজেদের অধিকার সম্পর্কে জানতে বা কোনো অনিয়মের অভিযোগ জানাতে গিয়ে অভিবাসন অবস্থার কারণে বৈষম্য, হয়রানি, প্রতিশোধ কিংবা অন্য কোনো ধরনের টার্গেটের শিকার না হন। অভিযোগকারীর পরিচয়ও আইন যতটা অনুমতি দেয়, ততটা গোপন রাখার চেষ্টা করা হবে।


এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার করা জরুরি—এই উদ্যোগ কাউকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে অভিবাসন মর্যাদা বা বৈধ কাগজপত্র প্রদান করছে না। বরং এটি কর্মক্ষেত্রে শ্রমিকের অধিকার রক্ষার জন্য নিউইয়র্ক শহরের প্রশাসনিক ব্যবস্থা। তাই অভিবাসন বিষয়ে আলাদা আইনি সমস্যা থাকলে অভিবাসন আইনজীবী বা অনুমোদিত আইনি সহায়তা প্রতিষ্ঠানের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন।


এর পাশাপাশি ৭ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্ক নগর প্রশাসন শ্রমিক ক্ষমতা কার্যালয় চালু করেছে। নগর কর্তৃপক্ষের দাবি, যুক্তরাষ্ট্রে এটি এ ধরনের প্রথম কার্যালয়। এর উদ্দেশ্য হলো শ্রমিকদের নিজেদের অধিকার সম্পর্কে জানানো, শ্রমিক সংগঠনের সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ তৈরি করা এবং কর্মক্ষেত্রের সমস্যাগুলো নিয়ে নগর প্রশাসনের কাছে মতামত পৌঁছানোর ব্যবস্থা করা। 


নতুন কার্যালয় অভিবাসী শ্রমিক, গিগকর্মী, বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠন ও কর্মক্ষেত্রে সংগঠিত হওয়ার সুযোগ কম থাকা কর্মীদের সঙ্গে কাজ করবে। কর্মক্ষেত্রে অভিবাসনভিত্তিক শোষণ, কর্মীকে ভুলভাবে স্বাধীন ঠিকাদার হিসেবে দেখানো এবং নতুন প্রযুক্তির কারণে শ্রমিকদের ওপর সম্ভাব্য প্রভাবও এর কাজের অংশ হবে। 


বাংলাদেশি শ্রমিকদের জন্য এর বাস্তব অর্থ হলো—কেউ যদি নিয়মিত কাজ করার পরও প্রাপ্য বেতন না পান, অতিরিক্ত কাজের যথাযথ পারিশ্রমিক না পান, কর্মক্ষেত্রে বৈষম্যের শিকার হন অথবা শ্রমিক অধিকার নিয়ে কোনো সমস্যায় পড়েন, তাহলে বিষয়টি সম্পর্কে তথ্য নেওয়ার সুযোগ আরও বাড়ছে।

নগর প্রশাসন ইতোমধ্যে বিভিন্ন অভিবাসী জনগোষ্ঠীকে শ্রমিক অধিকার সম্পর্কে সচেতন করার উদ্যোগ নিয়েছে। চলতি বছরের মে মাসেও নিউইয়র্কের একাধিক নগর সংস্থা অভিবাসী নিউইয়র্কবাসীদের শ্রমিক ও ভোক্তা অধিকার সম্পর্কে তথ্য দিতে যৌথভাবে কাজ করার কথা জানিয়েছিল। 


এদিকে নিউইয়র্কের ব্রুকলিনেও অভিবাসীদের জন্য অধিকার জানার প্রশিক্ষণ ও তথ্যসেবা চালু রয়েছে। ব্রুকলিন বরো প্রেসিডেন্টের কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বিভিন্ন এলাকায় অভিবাসীদের জন্য ‘নিজের অধিকার জানুন’ ধরনের প্রশিক্ষণ আয়োজন করা হচ্ছে। 


বাংলাদেশি কমিউনিটির জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা হলো—কর্মক্ষেত্রে অন্যায় হলে চুপ করে থাকার প্রয়োজন নেই। তবে অভিযোগ করার আগে নিজের পরিস্থিতি বুঝে নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে যার অভিবাসন অবস্থা জটিল, তিনি কোনো নিয়োগকর্তার সঙ্গে বিরোধে যাওয়ার আগে বিনামূল্যের আইনি সহায়তা বা অভিবাসন আইনজীবীর পরামর্শ নিতে পারেন।


নতুন ব্যবস্থাটি নিউইয়র্কের শ্রমবাজারে বড় পরিবর্তনের অংশ। নগর প্রশাসন শুধু অভিযোগ পাওয়ার পর ব্যবস্থা নেওয়ার বদলে সম্ভাব্য লঙ্ঘনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে আগে থেকেই শনাক্ত করে তদন্ত করার দিকে যাচ্ছে। এতে দীর্ঘদিন ধরে শ্রমিকদের অধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ থাকা প্রতিষ্ঠানের ওপর চাপ বাড়তে পারে। 


তবে নতুন ব্যবস্থার বাস্তব ফলাফল কতটা হবে, তা নির্ভর করবে নগর সংস্থাগুলো কতটা কার্যকরভাবে তদন্ত পরিচালনা করে এবং ক্ষতিগ্রস্ত শ্রমিকদের কাছে তথ্য ও সহায়তা কতটা সহজে পৌঁছে দিতে পারে তার ওপর।

সিএসবি নিউজ-এর আরও খবর