চাকরি হারালেই এইচ-১বি কর্মীদের যুক্তরাষ্ট্র ছাড়তে হতে পারে, নতুন প্রস্তাবে বাংলাদেশিদের উদ্বেগ

যুক্তরাষ্ট্রে চাকরি হারানো এইচ-১বি কর্মীদের ৬০ দিনের সুযোগ বাতিলের প্রস্তাব, বাংলাদেশি পেশাজীবীদের ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে তৈরি হয়েছে বড় উদ্বেগ।

চাকরি হারালেই এইচ-১বি কর্মীদের যুক্তরাষ্ট্র ছাড়তে হতে পারে, নতুন প্রস্তাবে বাংলাদেশিদের উদ্বেগ

চাকরি হারালেই এইচ-১বি কর্মীদের যুক্তরাষ্ট্র ছাড়তে হতে পারে, নতুন প্রস্তাবে বাংলাদেশিদের উদ্বেগ


যুক্তরাষ্ট্রে কর্মরত বিদেশি পেশাজীবীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের প্রস্তাব দিয়েছে ট্রাম্প প্রশাসন। নতুন প্রস্তাবটি চূড়ান্ত হলে চাকরি হারানোর পর এইচ-১বি এবং কয়েকটি অন্যান্য কর্মভিসাধারীর জন্য বর্তমানে থাকা সর্বোচ্চ ৬০ দিনের ঐচ্ছিক অবকাশ আর থাকবে না। ফলে কোনো কর্মীর চাকরি শেষ হয়ে গেলে নতুন চাকরি খোঁজা, নতুন নিয়োগকর্তার মাধ্যমে আবেদন করা কিংবা যুক্তরাষ্ট্র থেকে বের হওয়ার প্রস্তুতির জন্য আগের মতো সময় নাও পাওয়া যেতে পারে। বিষয়টি বাংলাদেশি পেশাজীবীদের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ, বিশেষ করে যারা প্রযুক্তি, প্রকৌশল, চিকিৎসা, গবেষণা ও অন্যান্য দক্ষ পেশায় এইচ-১বি ভিসায় যুক্তরাষ্ট্রে কাজ করছেন। 


যুক্তরাষ্ট্রের স্বরাষ্ট্র নিরাপত্তা বিভাগ এই পরিবর্তনের প্রস্তাব করেছে। সরকারি নথিতে বলা হয়েছে, বর্তমানে নির্দিষ্ট কর্মভিসাধারীদের চাকরি বা অনুমোদিত কর্মকার্য শেষ হওয়ার পর সর্বোচ্চ ৬০ দিনের একটি অবকাশ দেওয়া যেতে পারে। এই সময়ের মধ্যে কর্মী নতুন নিয়োগকর্তা খুঁজতে, নতুন আবেদন করতে কিংবা নিজের অভিবাসন পরিস্থিতি পরিবর্তনের ব্যবস্থা নিতে পারেন। নতুন প্রস্তাবের উদ্দেশ্য হলো এই ৬০ দিনের অবকাশের বিধান সরিয়ে দেওয়া। 


এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—এটি এখনো চূড়ান্ত আইন নয়। এটি একটি প্রস্তাবিত নিয়ম। অর্থাৎ আজই চাকরি হারালে প্রত্যেক এইচ-১বি কর্মীকে সঙ্গে সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ছাড়তে হবে—এমন কোনো নতুন চূড়ান্ত নিয়ম কার্যকর হয়েছে বলে ধরে নেওয়া ঠিক হবে না। প্রস্তাবটির ওপর জনমত গ্রহণের প্রক্রিয়া রয়েছে এবং চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের আগে নিয়মটি পরিবর্তিত, প্রত্যাহৃত বা অন্যভাবে অনুমোদিত হতে পারে। রয়টার্সও জানিয়েছে, প্রস্তাবটি এখনো চূড়ান্ত হয়নি।


বর্তমান ব্যবস্থায় এইচ-১বি কর্মীরা চাকরি হারালে সর্বোচ্চ ৬০ দিনের অবকাশ তাদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা হিসেবে কাজ করে। এই সময়ের মধ্যে তারা নতুন নিয়োগকর্তা খুঁজতে পারেন। কোনো নতুন প্রতিষ্ঠান তাদের নিয়োগ করতে চাইলে প্রয়োজনীয় অভিবাসন প্রক্রিয়া শুরু করার সুযোগও তৈরি হয়। একই সঙ্গে কর্মী চাইলে যুক্তরাষ্ট্র ছাড়ার প্রস্তুতি নিতে পারেন অথবা অন্য বৈধ অভিবাসন ব্যবস্থায় যাওয়ার চেষ্টা করতে পারেন।


কিন্তু প্রস্তাবটি কার্যকর হলে এই সময়সীমা ব্যাপকভাবে সংকুচিত হতে পারে। চাকরি শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কর্মীর বৈধ অবস্থান ও চাকরির সম্পর্ক আরও সরাসরি যুক্ত হয়ে যাবে। ফলে কোনো প্রতিষ্ঠান হঠাৎ কর্মী ছাঁটাই করলে সংশ্লিষ্ট বিদেশি কর্মীকে খুব দ্রুত অভিবাসন আইনজীবী, নতুন নিয়োগকর্তা এবং নিয়োগকর্তার অভিবাসন বিভাগের সঙ্গে যোগাযোগ করতে হতে পারে। 


প্রস্তাবটি শুধু এইচ-১বি ভিসায় সীমাবদ্ধ নয়। সরকারি নথি অনুযায়ী, ই-১, ই-২, ই-৩, এইচ-১বি, এইচ-১বি১, এল-১, ও-১ এবং টি-এন—এ ধরনের কয়েকটি কর্মভিত্তিক অ-অভিবাসী শ্রেণিও প্রস্তাবিত পরিবর্তনের আওতায় আসতে পারে। অর্থাৎ বিষয়টি শুধু প্রযুক্তি খাতে কর্মরত এইচ-১বি কর্মীদের জন্য নয়; বিভিন্ন পেশায় কর্মরত অন্যান্য বিদেশি পেশাজীবীর জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।


বাংলাদেশিদের জন্য এই খবরের গুরুত্ব বিশেষভাবে বেশি। যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশি পেশাজীবীদের একটি অংশ প্রযুক্তি, সফটওয়্যার, প্রকৌশল, চিকিৎসা, শিক্ষা, গবেষণা ও ব্যবসায়িক পেশায় কাজ করেন। তাদের অনেকের ক্ষেত্রেই কর্মসংস্থান এবং অভিবাসন মর্যাদা পরস্পরের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত। ফলে চাকরি হারানো শুধু আয়ের সমস্যা নয়; এর সঙ্গে যুক্ত হতে পারে ভিসার মর্যাদা, পরিবারের অবস্থান এবং ভবিষ্যৎ স্থায়ী বসবাসের পরিকল্পনা।


বিশেষ করে যেসব বাংলাদেশি এইচ-১বি কর্মীর স্বামী বা স্ত্রী এবং সন্তান যুক্তরাষ্ট্রে তাদের ওপর নির্ভরশীল অবস্থায় থাকেন, তাদের জন্য বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ। পরিবারের প্রধান কর্মী চাকরি হারালে পরিবারের ভবিষ্যৎ নিয়েও দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রয়োজন হতে পারে। তবে প্রস্তাবটি চূড়ান্ত হওয়ার আগে নির্ভরশীল পরিবারের ওপর এর সুনির্দিষ্ট আইনি প্রভাব কী হবে, তা নিয়ে অভিবাসন বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন।


আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, চাকরি হারানোর ঘটনা সবসময় কর্মীর নিজের সিদ্ধান্তের কারণে ঘটে না। কোনো প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান অর্থনৈতিক কারণে কর্মী ছাঁটাই করতে পারে, কোনো কোম্পানি ব্যবসা বন্ধ করতে পারে, আবার কোনো কর্মীর পদই বিলুপ্ত হয়ে যেতে পারে। বর্তমান ৬০ দিনের অবকাশ এমন পরিস্থিতিতে কর্মীকে কিছুটা সময় দেয়। নতুন প্রস্তাবের সমালোচকেরা বলছেন, এই সময় সরিয়ে দিলে দীর্ঘদিন যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস ও কাজ করা দক্ষ বিদেশি কর্মীরাও হঠাৎ করে বড় ধরনের অনিশ্চয়তার মুখে পড়তে পারেন। 


রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রস্তাবটির সমর্থকদের যুক্তি হলো—বিদেশি কর্মীদের অভিবাসন মর্যাদা তাদের অনুমোদিত কর্মসংস্থানের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত থাকা উচিত। অন্যদিকে সমালোচকেরা বলছেন, বাস্তবে একটি নতুন চাকরি খুঁজে নিয়োগকর্তার অভিবাসন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে সময় লাগে। ফলে ৬০ দিনের সুযোগ বাতিল হলে কর্মী ও নিয়োগদাতা উভয়ের ওপর চাপ বাড়তে পারে। 


বাংলাদেশি এইচ-১বি কর্মীদের জন্য এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো আতঙ্কিত না হয়ে প্রস্তাবটি চূড়ান্ত হওয়ার প্রক্রিয়া পর্যবেক্ষণ করা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া পোস্ট দেখে চাকরি ছেড়ে দেওয়া, দেশ ছাড়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া কিংবা নিজের ভিসা বাতিল হয়েছে বলে ধরে নেওয়া উচিত নয়। কারণ প্রস্তাবিত নিয়ম এবং কার্যকর নিয়ম এক বিষয় নয়।


যারা বর্তমানে এইচ-১বি ভিসায় যুক্তরাষ্ট্রে আছেন, তাদের নিজেদের চাকরির মেয়াদ, পাসপোর্ট, ভিসা, অনুমোদিত আবেদনের অবস্থা এবং নিয়োগকর্তার অভিবাসন নথি সম্পর্কে হালনাগাদ তথ্য রাখা গুরুত্বপূর্ণ। চাকরি হারানোর আশঙ্কা থাকলে আগে থেকেই প্রতিষ্ঠানের মানবসম্পদ বিভাগ এবং অভিবাসন আইনজীবীর সঙ্গে কথা বলা বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ হতে পারে।


এছাড়া যারা নতুন করে এইচ-১বি ভিসায় যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার পরিকল্পনা করছেন, তাদের জন্যও এই পরিবর্তনটি নজরে রাখা প্রয়োজন। কারণ ভবিষ্যতে কর্মসংস্থানের স্থায়িত্ব, নিয়োগকর্তা পরিবর্তন এবং চাকরি হারানোর ক্ষেত্রে অভিবাসন ঝুঁকি কীভাবে পরিচালনা করতে হবে, তা নতুন নিয়মের ওপর নির্ভর করতে পারে।


সবশেষে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—৬০ দিনের অবকাশ বাতিলের প্রস্তাব এখনো চূড়ান্ত হয়নি। তাই এটিকে “চাকরি হারালেই সঙ্গে সঙ্গে দেশ ছাড়তে হবে”—এমন কার্যকর নতুন আইন হিসেবে প্রচার করা সঠিক হবে না। বর্তমানে এটি স্বরাষ্ট্র নিরাপত্তা বিভাগের প্রস্তাবিত নিয়ম, যার ওপর পরবর্তী প্রক্রিয়া ও জনমত গ্রহণের পর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসবে।

সিএসবি নিউজ-এর আরও খবর